মকবুল হোসেনের স্বপ্নসারথি সেঁওতি গ্রন্থাগার

বাড়ি নয়-যেন লাইব্রেরি; ঘর নয়-যেন বইয়ের বাগান। পুরো বাড়ির সব ঘরে বই আর বই। কতগূলো বই? তার সঠিক হিসাব নেই। হতে পারে সেটা দশ থেকে পনেরো হাজার। তবে মকবুল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী দশ হাজারের নীচে নয়। ঘরে ঘরে ঠাসা, আলমারির পর আলমারিতে থরে থরে সাজানো, গুছানো হাজারো বই। যেন বইয়ের খনি। একজন সাধারণ ব্যক্তির বাড়িতে এতগুলো বই একসাথে দেখে যে কাউকেই ভাল না লেগে পারে না।

এটা কোন সরকারি লাইব্রেরি নয়, এটা পাবলিক লাইব্রেরি কিংবা বেসরকারি লাইব্রেরিও নয়। এটা সম্পুর্ণরুপেই ব্যক্তিগত লাইব্রেরি, ব্যক্তি উদ্যোগের লাইব্রেরি। বইয়ের মধ্যে ডুবে থাকেন, ডুবে থাকতে ভাল বাসেন এমন একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত পাঠাগার এটা, যার নাম রাখা হয়েছে সেঁওতি গ্রন্থাগার।

এই পাঠাগার যার, দিনাজপুর জেলা শহরের পরিচিত মুখ তিনি। একদা রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বাংলাদেশের বহুমুখি আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। বজ্রকন্ঠে দাবি তুলতেন, শ্লোগান দিতেন। এখন আর সেই সবের মধ্যে তিনি নেই। এখন তিনি কবি। কবিতা লিখতে পছন্দ করেন আর ডুবে থাকেন বইয়ের পাতায়।

মকবুল হোসেন। এক নামে চেনেন সবাই। এরশাদ যখন রাষ্ট্রপতি তখন দিনাজপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদকের গুরুত্ব ও প্রভাব কি তা বোঝেন সবাই। এখন কিন্তু ভিন্ন মানুষ। বয়সের ভারে চোখ কোটরাগত। বিশাল দাড়ির আড়ালে মুখ ঢাকা পড়ে গেছে অনেকটাই। দাড়ির আড়ালে কিছুটা রবীন্দ্র ভাব। হিন্দু ধর্মের স্বামীজী ভাবও কিছুটা।

এখন রাজনীতিতে নেই, আছেন লাইব্রেরিতে। ব্যক্তিগত বিশাল লাইব্রেরিতে বিশাল বইয়ের ভান্ডার তার। সেখানে গল্প, ছোট গল্প, উপন্যাস, কবিতা, প্রবন্ধ, বিজ্ঞান, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভ্রমণ, ধর্মীয় বিষয়সহ বিভিন্ন বিষয়ের বিশাল বইয়ের ভান্ডারে সময় কাটে তার। ‘যখন হাফ প্যান্ট পড়ে স্কুল যেতাম, সেই সময় থেকেই দিনাজপুরের বিখ্যাত আর্য পুস্তকাগারে বসতাম। সেখানে পিটি হতো। সেই পিটিতে অংশ নিতাম। পিটি শেষে সেখানে বসে বই পড়তাম। যখন একটু বড় হলাম তখন বই পড়াটা নেশায় পরিনত হলো। সেই থেকে বই পড়ছি তো এখনো বইয়ের মধ্যেই আছি’ বললেন মকবুল।

৭২ বছর বয়সী বই সংগ্রাহক মকবুল হোসেনের পিতা খলিলউদ্দিন আহমেদ, মা মর্জিনা বেগম। দুজনই পরলোকে। আট ভাই-বোনের মধ্যে তোফাজ্জল হোসেন কানু ছিলেন চিত্র শিল্পী, তোজাম্মেল হোসেন চারুকলা ইন্সটিটিউট থেকে সিরামিক্স বিষয়ে লেখাপড়া কমপ্লিট করেন, তোজাম্মেল হোসেন ছিলেন সত্তরের উত্তাল রাজনীতির সময়কালে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক, মোজাম্মেল হোসেন, আব্দুল লতিফ, মকছেদুর রহামান হলেন ব্যবসায়ী, লুৎফর রহমান গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করার সময় অসুস্থ্য হয়ে মারা গিয়েছিলেন। তিন বোনের মধ্যে মাসুদা বেগ মারা গেছেন অল্প বয়সে। খাদিজা বেগম ও জাহানারা বেগম অল্প বয়সেই সংসার যাত্রা শুরু করেছেন। আর মকবুল হোসেন নিজে সক্রিয় থেকেছেন রাজনীতি, বইপড়া, একাডেমিক শিক্ষাসহ নানান কর্মকান্ডে।

তিনি দিনাজপুর একাডেমি থেকে মেট্রিক, ঠাকুরগাঁও বিডি কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট ও ডিগ্রী পাস করেন। ঠাকুরগাঁও বিডি কলেজ ছাত্র সংসদের ম্যাগাজিন সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন ১৯৬৬ সালে। ছাত্র ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতিতে তার হাতেখড়ি, পরে ছাত্রলীগ, তারপর জাতীয় পার্টি। ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের দিনাজপুর জেলা কমিটির অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।

১৯৭২ সালে দিনাজপুর জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হয়ে পরবর্তী কাউন্সিলে সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ছাত্রলীগের প্রার্থী হিসেবে ১৯৭৪ সালে দিনাজপুর আইন কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যার পর দিনাজপুরের যে সকল নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের অন্যতম ছিলেন মকবুল হোসেন। তবে সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে দিনাজপুর জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক হয়ে নিজের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় রচনা করেছিলেন তিনি। এখন রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে সরে আছেন।

মকবুল হোসেনের শিক্ষা জীবনের একটি বড় অংশ ছিল দিনাজপুরের আর্য পাঠাগার। এখানে সাহিত্য, ধর্মীয় ও রাজনীতির বই বেশি পড়েছেন। মার্কসবাদ, লেনিনবাদ, মুজিববাদ, এঙ্গেলস, গান্ধীসহ বিশে^র অনেক খ্যাতিমান রাজনীতিকের জীবনী স্মবলিত বই ছিল এই পাঠাগারে। এইসব বই পড়ার ঝোঁক ছিল মকবুল হোসেনের। বই পড়ার ঝোঁক থেকেই বই সংগ্রহের দিকে ঝুঁকে পড়েন এবং দিনাজপুর শহরের সর্দারপাড়ার বাড়িতে ব্যক্তিগত পাঠাগার গড়ে তোলেন। তার পাঠাগারে কোরআন শরীফ যেমন আছে, তেমনি আছে বেদ, গীতা, বাইবেল, ইঞ্জিলসহ প্রধান প্রধান সব ধর্মগ্রন্থ। আছে কবিতা, গল্প, উপন্যাসসহ শিশু সাহিত্য, বড়দের সাহিত্যসহ সাহ্রিত্যের নানান দিগন্তের বহুবিধ বিষয় ভিত্তিক বই।

বই পড়ার পাশাপাশি এই পাঠাগারে মঝে মাঝে সাহিত্যের আসর, আড্ডা বসিয়ে থাকেন মকবুল হোসেন। আসরে স্বরচিত গল্প, কবিতা পাঠ করে থাকেন স্থানীয় সাহিত্য কর্মীগণ। ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর সেঁওতি গ্রন্থাগারে অনুষ্ঠিত এক আড্ডায় ভারতের বিশ^ ভারতী বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের গবেষক অধ্যাপক অভ্র বসু ও অধ্যাপক শ্রীলা বসু উপস্থিত ছিলেন। তারা নিজেরাও স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি এবং দুই বাংলার সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেছিলেন। সেদিন অধ্যাপক অভ্র মন্ডল বলেছিলেন, দুই বাংলার মানুষ পলিটিক্যালি বিচ্ছিন্ন হলেও সংস্কৃতিতে বিচ্ছিন্ন নয়। যখন পলিটিক্যালী এক ছিলাম তখন বাঙালিও এক ছিলাম। ১৯ শতকে ঠাকুর পরিবার ‘ভারতী’ আর বঙ্কিম চন্দ্র ‘বঙ্গদর্শন’ বের করতেন। এভাবে আমাদের সংস্কৃতির লড়াই এগিয়ে চলত।

অভ্র মন্ডল দুই বাংলার সংস্কৃতিগত মিল উল্লেখ করেছিলেন তার বক্তব্যে। তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ছয় বার এসেছি। প্রতিবার যাদেরকে এখানে দেখেছি তাদের সবাইকে আপন বলে মনে হয়েছে। আমি মনে করি আমাদেরকে বাদ দিয়ে আপনারা এবং আপনাদেরকে বাদ দিয়ে আমরা বাঙালি হিসেবে পরিপুর্ণ হতে পারব না। কারন আমাদের বাঙালিকত্ব কোন ধর্মের উপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত নয়, আমাদের বাঙালিকত্ব গড়ে উঠেছে আমাদের সংস্কৃতিগত ঐতিহ্য থেকে।

শ্রীলা বসু বলেন, আমরা আমাদের বাংলাকে খুঁজছি। বিভিন্ন মন্দির, শিল্প, ইতিহাসের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের ঐতিহ্যের বাংলাকে খুঁজছি। আমরা রাজশাহী, দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় যে মন্দির দেখেছি তাতে ঐতিহ্যগত মিল খুঁজে পেয়েছি। মন্দিরের কারুকার্যে ইসলামিক টেকনিক, ইসলামি শিল্প ব্যবহার করা হয়েছে। যারা এটা করেছেন তাদের মধ্যে এটা হিন্দু, ওটা মুসলিম এ ধরণের ভাবনা কাজ করেনি। কিন্তু ইংরেজরা এদেশে আসার পর এই ভাবনা ঢুকিয়ে দিয়েছে। একটা সময় গ্রাম এবং শহরের পার্থক্য বোঝা যেতনা। কিন্তু ইংরেজ এসে কোলকাতাকে রাজধানী করার পর থেকে শহর আর গ্রামের মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিয়ে আমাদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা তৈরী করে দিয়েছে।

সেঁউতি গ্রন্থাগারের সেই সাহিত্য আড্ডায় সভাপতিত্ব করেন মকবুল হোসেন নিজেই। আড্ডা সঞ্চালন করেন দিনাজপুর সরকারি কলেজের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক ড. মাসুদুল হক। আড্ডায় আরো আলোচনা করেন জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক রাজীব মন্ডল। কবিতা পাঠ করেন মকবুল হোসেন, মুহাম্মদ আমজাদ আলী, ইয়াসমিন আরা রানু, শাহবাজ আলী খান, সিরাজম মুনিরা, মাহমুদ আখতার প্রমুখ। আড্ডায় দেশাত্ব বোধক গান ও রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে শোনান ডালিম কুমার, সৈয়দা জারীন তাসনীম ঐশ্বী, শুভেচ্ছা ইসলাম, মনিষা, ফারহানা ইয়াসমিন প্রমুখ। এই আয়োজনটিকে এই গ্রন্থাগারের সেরা অধ্যায় বরে মনে করেন মকবুল হোসেন। তার মৃত্যুর পর গ্রন্থাগারের বইগুলো যেন সংরক্ষিত থাকে সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন বলে জানান তিনি।

সেঁউতি গ্রন্থাগার প্রসঙ্গে ড. মাসুদুল হক বলেন, ‘ব্যক্তিগত সংগ্রহের বই দিয়ে মকবুল হোসেন যে বিশাল পাঠাগার গড়েছেন তা অনন্য নজীর হিসেবে কাজ করবে এবং এই কাজের মধ্য দিয়ে তিনি দীর্ঘ জীবন মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবেন।’

দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু বলেন, ‘মকবুল ভাইকে সবাই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং ইদানীং একজন কবি হিসেবে জানতাম। কিন্তু তিনি একজন বড় বই সংগ্রাহক ছিলেন যা সাধারণবাবে লোকে জানতেন না। মকবুল হোসেনের এই অনন্য কর্ম সমাজকে আলোকিত করবে তাতে সন্দেহ নাই’।

 

আজহারুল আজাদ জুয়েল
সাংবাদিক, কলামিস্ট, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক লেখক

[email protected]