গোপালগঞ্জের অপরিকল্পিত স্লুইসগেট কৃষকের গলার কাটা

গোপালগঞ্জে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট

জেলা প্রতিনিধি, গোপালগঞ্জ: গোপালগঞ্জে অপরিকল্পিত স্লুইসগেট নির্মাণের ফলে বেশ কয়েকটি খালে পানির উৎসমুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে হাজার হাজার একর কৃষি জমির ওপর। ব্যাপক এলাকার কৃষকরা নদী বা খালের পানি ব্যবহার করতে পারছেনা। ফলে বাধ্য হয়ে বেশি খরচে তাদেরকে ভুগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করতে হচ্ছে। এই কারণে ফসল উৎপাদন হ্রাস  এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত  হচ্ছে  কৃষকরা। এলাকাবাসী এর স্থায়ী সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও স্থানীয় এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ৯০ দশকের সময় গোপালগঞ্জ সদর ও মুকসুদপুর উপজেলার গোপালগঞ্জ-টেকেরহাট সড়কের ৩৫ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ এলাকার উলপুর, বৌলতলী, গান্ধিয়াশুর, ভেন্নবাড়ি, বানিয়ারচর, জলিরপাড় ও গঙ্গারামপুরে  ৮ টি খালের মুখ ৪টি রেগুলেটর ও ৪টি লকগেট নির্মাণ করা হয়।  কিন্তু খোলা বা বন্ধ করার জন্য কোন লোক নিয়োগ হয়নি। নির্মাণের পর থেকে রেগুলেটর ও লকগেট গুলো বন্ধ অবস্থায় রয়েছে। ফলে এসব খালের মুখে বালি পড়ে বন্ধ থাকায় এলাকার মানুষের ভোগান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

খালগুলো মধুমতি বিলরুট ক্যানেল থেকে শুরু হয়ে বিলের মধ্যে দিয়ে কোটালীপাড় উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত শৈলদহ নদীতে গিয়ে মিশেছে। গেট নির্মাণের কারণে খালের  মুখে বালু  পড়ে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি একদিকে যেমন বিলে প্রবেশ করতে পারছেনা, তেমনি বিলের পানি সময়মত নামতেও পারছে না। ফলে খাল এলাকার কৃষকরা পড়েছেন বেকাদায়। যখন বিলে পানি দরকার তখন পানি থাকেনা, আবার যখন পানি সরানোর দরকার তখন জলাবদ্ধ হয়ে থাকে কৃষি জমি। এতে অনেক জমি অনাবাদি থেকে যায়।

দূর্গাপুর গ্রামের ওষুধ ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম বলেন, উলপুর খালের মুখে স্লুইচ গেটে নির্মাণের পর থেকেই এলাকার খালগুলি বালিতে ভরে যেতে থাকে। আস্তে আস্তে তা পানি শূন্য হয়ে পড়েছে। খালের মুখ বালিতে ভরে যাওয়ায় কৃষকরা খালের পানি সেচের কাজে লাগাতে পারছেনা। আবার গোসল করতে পারছে না। খালের মধ্যে এলাকার মানুষ তরকারি চাষ করে। কেউ আবার খড়ের পালা দেয়। ছেলে মেয়েরা খেলাধুলাও করে। বাধ্য হয়ে আমরা গভীর নলকুপ থেকে কৃষি জমিতে সেচ কাজ চালিয়ে আসছি। এর সুষ্ঠু সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

সুধু নজরুল ইসলাম নয় স্লুইচ গেট এলাকা পদ্মবিলা গ্রামের বাসিন্দা  আজাহার উদ্দিন দাড়িয়া,  হারুন মোল্লা,করপাড়া গ্রামের প্রবির বিশ্বাস,  সবুর আলী মোল্লা,  কাওসার আলী মোল্লা, সাতপাড় পশ্চিমপাড়া গ্রামের অচিন্ত পান্ডে, বাপি ঠিকাদার , মনো বাকচিসহ বেশ কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, স্লুইচ গেট এলাকায় যে খাল রয়েছে তা এখন আমাদের গলার কাটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

একসময় এই খাল দিয়ে জমির ফসল আনা নেয়া করতাম । নৌকায় করে হাট বাজরের পণ্য আনা নেয়া করা হতো। খালের পানিতে গোসলসহ সব ধরনের কাজ করা হতো। তখন ফসলও ভালো হতো। গেট তৈরি করেছে কিন্তু গেট খোলা বা  বন্ধ করার লোক নেই। ফলে বর্ষাকালে গেট বন্ধ থাকায় এবং শুকনা মৌসুমে গেট বন্ধ থাকায় কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। আমরা চাই এই খালগুলো গভীর করে কেটে পানি সরবরাহ পূর্বেও মতো ফিরে পেতে। এটাই সরকারের প্রতি আমাদের দাবি।

গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক সমীর কুমার গোস্বামী বলেন, পানির সমস্যার কারনে এসব অঞ্চলে কৃষকদের সমস্যা হচ্ছে। স্লুইস গেট এলাকার প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমি রয়েছে। যা গভীর নলকুপের পানি দিয়ে চাষাবাদ করে আসছে কৃষকরা। গভীর নলকুপের পানিতে আয়রণ ও ধাতব পদার্থ উঠে আসে ফলে মাটির উর্বরতা কমে  উৎপাদন হৃাস পায়। আর উম্মুক্ত জলাশয়ের পানিতে চাষাবাদ করলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পায়।  তাই  সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের খালে পানির প্রবাহ সৃষ্টির উপর জোর দেয়া প্রয়োজন ।

গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী  সফি উদ্দিন  খালের মুখ বন্ধ হয়ে কৃষি কাজে কৃষকদের অসুবিধা হচ্ছে এ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, আমি গোপালগঞ্জে এসেছি প্রায় দুই বছর হয়েছে। এর আগে খালগুলো খনন করা হয়েছিল। এলাকা পরিদর্শন করে আমি যেটা দেখেছি তাতে আমার মনে হয়েছে প্রতিবছর খালগুলো খনন করতে হবে। কারন এমবিআর ক্যানালে বর্ষা মৌসুমে প্রচুর পরিমানে বালু আসে। প্রতি বছর যদি খাল গুলোর মুখ থেকে বালু সরানো হয় বা খালগুলো খনন করে সচল রাখা যায় তা হলে খালগুলো সচল করা সম্ভব হবে। আমরা খাল খননের জন্য মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ চেয়েছি। বরাদ্দ আসলে খালগুলো খনন করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

স্বাআলো/আরবিএ