ইউক্যালিপটাসের সংখ্যাধিক্যে মরুয়ায়নের দিকে রংপুর

মরুয়ায়নের দিকে রংপুর
dav

হারুন উর রশিদ সোহেল, রংপুর :  রংপুর অঞ্চল জুড়ে ইউক্যালিপটাস গাছের চারার অবাধ উৎপাদন, বিপণন ও রোপণ বৃদ্ধির ফলে এ  অঞ্চল মরুভূমির  দিকে যাচ্ছে। দিন দিন এ অঞ্চলে পানির স্তর কমে আসছে। এক সময়ের বেলে দোঁআশ আর কাঁদা মাটিভরা রংপুর অঞ্চল এখন পানি শুষ্কতায় ভুগছে। ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে কৃষি জমি ও চাষাবাদ। পরিবেশ ভারসাম্যহীন ইউক্যালিপটাস গাছের কারণে স্বাস্থ্য ঝুঁকিও বাড়ছে।

পরিবেশ উপযোগী না হওয়ায় ২০০৮ সালে সরকারের বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে দেশে ইউক্যালিপটাসের চারা উৎপাদন নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু কৃষকরা না জেনে ইউক্যালিপটাসের চারা রোপণ করছেন। এভাবেই গড়ে উঠেছে শত শত ইউক্যালিপটাসের বাগান। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছে কৃষি জমি। আর হুমকির মুখে পড়েছে পরিবেশ। নিষিদ্ধ গাছটির চারা উৎপাদনের সরকারি নিয়ম-নীতির কথা জানেন না স্থানীয় নার্সারি মালিকরা। অন্যান্য বনজ বা ফলদ চারার চেয়ে এই চারা উৎপাদনে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি লাভ হয়। এই লোভে তারা বেশি করে চারা উৎপাদন করছেন। ফলে স্কুল-কলেজ-মাদরাসার, বসত-বাড়ি, অফিস-আদালত, রাস্তা-ঘাটে, খেলার মাঠে, হাট-বাজারসহ ফসলের মাঠজুড়ে অন্যান্য ফসলের সঙ্গে ব্যাপকভাবে শোভা পাচ্ছে ইউক্যালিপটাস গাছ। সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ও চিন্তিত হয়ে পড়েছেন বৃক্ষ ও পরিবেশবিদরা।

রংপুর নগরীর তামপাট এলাকার কৃষক আশরাফুল আলম জানান, তার প্রতিবেশির দেখা দেখি তিনিও জমির আলে ৫০-৬০টি ইউক্যালিপটাস লাগিয়েছেন। সাময়িক লাভের আশায় ইউক্যালিপটাস লাগিয়ে এখন তিনি ক্ষতিগ্রস্থ। আগের মতো তার জমিতে ভালো চাষাবাদ হচ্ছে না। দিন দিন পানি শূন্যতায় শুষ্ক হয়ে পড়েছে তার জমি।’

কৃষকরা বলেন, জমির আইলে ইউক্যালিপটাস রোপণ করার পর থেকে ক্ষেতে আর পানি থাকে না। দিন দিন ফসলের উৎপাদন কমে যায়। কম সময়ে এই গাছ অনেক বড় হয়। ইউক্যালিপটাস গাছ আশপাশে প্রয় ৫০ ফুট এলাকার পানি শোষণ করে ও আকাশে তুলে দেয়। জমির আইল, কৃষি জমি ও পতিত জমিতে লাগানো এই গাছ উপকারের পরিবর্তে অপকারই বেশি করে।

আরো পড়ুন>> দুই গ্রুপের সংঘর্ষে রংপুরে কলেজ ছাত্র নিহত

কারমাইকেল কলেজের শিক্ষক পরিবেশবিদ এম এ রউফ খান বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে বৃষ্টিপাত খুব বেশি হয় না। গ্রামের বেশিরভাগ বড় বড় নদ-নদী বাঁধ দিয়ে বন্ধ করে হয়েছে। এতে দেশের কৃষি জমি শুকিয়ে যাচ্ছে। এই রকম শুকনো জমিতে ইউক্যালিপটাস গাছটি রোপণ করার মানে নেই। কারণ ইউক্যালিপটাস গাছ প্রচুর পানি শোষণ করে। আমাদের জলবায়ুর জন্য ইউক্যালিপটাস গাছ মোটেই উপযোগী নয়। উপরন্তু কৃষি জমি এবং আশপাশের মাটি থেকে অতিমাত্রায় পানি শোষণ করে মারাত্মকভাবে পরিবেশের বিপর্যয় ঘটাচ্ছে এই রাক্ষুসে গাছ।

রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, কৃষি জমির জন্য ইউক্যালিপটাস মারাত্মক হুমকি। পানি খেকো এই গাছ প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লিটার পানি শোষণ করে মাটিকে নিরস ও শুষ্ক করে ফেলে। ইউক্যালিপটাস গাছ ৫ বছরে ৯২ মিটার লম্বা হতে পারে। মাটির নিচের গোড়ায় ২০-৩০ ফুট জায়গা নিয়ে চারদিকে থেকে ইউক্যালিপটাস পানি শোষণ করে। ফলে অন্যান্য ফলদ গাছের ফলন ভালো হয় না। পুকুরের পানি দূষণ করে। এ গাছে কোনো পাখি বাসা বাঁধে না। পাতা সহজে পচে মাটিতে মেশে না। ইউক্যালিপটাস গাছের ফলের রেণু নিঃশ্বাসের সঙ্গে দেহে প্রবেশ করলে অ্যাজমা হয়। এমনকি যে বসত-বাড়িতে অধিক পরিমাণে ইউক্যালিপটাস গাছ আছে সেসব বাড়ির শিশু ও বৃদ্ধদের শ্বাসকষ্ট হতে পারে। আমরা কৃষকদের এই গাছের চারা উৎপদন, রোপণ ও সরবরাহে নিরুৎসাহিত করছি।

স্বাআলো/এম