সুন্দরবনে পর্যটকের ভীড়

শরীফা খাতুন শিউলী, খুলনা :  সুন্দরবন দেখতে প্রতিবছর লাখো পর্যটক ভীড় করেন সুন্দরবনে। প্রতি শীত মৌসুমে পর্যটক আগমন অনেকাংশে বেড়ে যায়। কিন্তু এ বছর শীত মৌসুমে জাতীয় নির্বাচন থাকার কারণে সুন্দরবনে পর্যটক এসেছেন কম। তবে শীত বিদায়ের পর গরমের মধ্যেও পর্যটকরা ঘুরতে আসছেন সুন্দরবনে।

বনবিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে পর্যটকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এসব পর্যটকের মধ্যে দেশের বিভিন্ন বয়স ও শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি রয়েছে বিদেশিরাও।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুন্দরবনে রয়েছে ৭ টি আকর্ষণীয় স্থান। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো-করমজল, কটকা, কচিখালী, দুবলার চর এবং হিরণ পয়েন্ট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের কারণে প্রায় দুইমাসের খরা কাটিয়ে প্রাণ ফিরে পেয়েছে সুন্দরবন। তিদিন হাজার হাজার পর্যটক ভ্রমণে আসছেন।

ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন খুলনার সভাপতি এম নাজমুল আজম ডেভিড বলেন, শীত বিদায়ের পর গরমের মধ্যেও পর্যটকদের আনাগোনায় মুখোরিত হচ্ছে সুন্দরবন। এতে আমাদের ব্যবসাও কিছুটা চাঙ্গা হয়েছে।

সুন্দরবনের করমজল বন্যপ্রাণি প্রজনন কেন্দ্রেটি দূরত্বের দিক দিয়ে লোকালয়ের সবচেয়ে কাছের ও দর্শনীয় হওয়াতে এখানে সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসেন। করমজল পর্যটন কেন্দ্রের ফুট টেইলার, সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার, লবণ পানির কুমির, মায়া ও চিত্রল হরিণ, বানর ও বিলুপ্তপ্রায় কচ্ছপসহ বিভিন্ন পশু-পাখি এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখে আনন্দ উপভোগ করে থাকেন পর্যটকরা।

সুন্দরবন

এছাড়া পর্যটকদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছে সুন্দরবনের কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্ট, দুবলারচর, হাড়বাড়িয়াসহ বিভিন্ন আকর্ষণীয় পর্যটন স্পটগুলো।

প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে স্বল্প সংখ্যক বন বিভাগের কর্মচারীকে।

মঙ্গলবার করমজলে ঘুরতে যাওয়া খুলনার আসাদুল্লাহ আল ফারুকী নামের এক শিক্ষক বলেন, বিভিন্ন জায়গা থেকে বন্ধু বান্ধবরা খুলনায় এসেছে সুন্দরবনে যাওয়ার জন্য। তাদের সংক্ষেপে সুন্দরবন দেখানোর জন্য করমজল স্পটে নিয়ে এসেছি।

করমজল প্রজনন কেন্দ্রের ওসি হাওলাদার আজাদ কবীর বলেন, পর্যটন মৌসুমের শেষ সময়ে পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হচ্ছে ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। জাতীয় নির্বাচন থাকায় সুন্দরবনে পর্যটকদের ভীড় ছিল না শীত মৌসুমে, কিন্তু এখন আবার ভ্রমণপিপাসুদের ভিড় বাড়ছে সুন্দরবনে।

তিনি বলেন, করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র পর্যটকদের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। কেননা এ দর্শনীয় স্থানে হরিণ ও কুমিরের প্রজনন, লালন-পালন, ইকোট্যুরিজম কেন্দ্র এবং পায়ে হেঁটে বনের সৌন্দর্য দেখা যায়। প্রতিদিন প্রায় ৫ শতাধিক দেশি ও বিদেশি পর্যটক আসছেন।

আরো পড়ুন >>>বৈশাখে ‘দোতারা’ হাতে জুটিবদ্ধ সিয়াম-ঐশী

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান বলেন, প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক দর্শনার্থীর চাপ সামলাতে হচ্ছে বন বিভাগকে।

তিনি জানান, ২০১৮-১৯ অর্থ বছরের মার্চ পর্যন্ত দেশী পর্যটক ছিল ১ লাখ ৭ হাজার ৮৯৪ জন এবং বিদেশী ১ হাজার ৭৭০ জন রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ কোটি ৮ লাখ ৩৮ হাজার ১৯৫ জন।

২০১৭-১৮ অর্থ বছরে দেশী পর্যটক ছিল ১ লাখ ৪৭ হাজার ৮৫৮ জন এবং বিদেশী ২ হাজার ৬৪০ জন রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ কোটি ৮ লাখ ২৪ হাজার ২৯০ জন।

সুন্দরবন

এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে দেশী পর্যটক ছিল ১ লাখ ২২ হাজার ২৩৪ জন এবং বিদেশী ২ হাজার ১২৯ জন রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৮২ লাখ ৬ হাজার ৬১০ জন।

খুলনা মহানগরীর অভিজাত হোটেল ক্যাসল সালামের অপারেশনস ম্যানেজার আজম মালিক বলেন, বর্তমানে সুন্দরবনের পর্যটকদের আগমন কিছুটা বেশি। আমরা চাই, আরও কিছু দিন যেন এ অবস্থা বিরাজমান থাকে।

তিনি জানান, সুন্দরবন দেখতে আসা বিদেশী পর্যটকদের অধিকাংশ তাদের হোটেলেই প্রথমে উঠেন।

আরো পড়ুন >>>পাবনায় অস্ত্রসহ ৫৪৫ চরমপন্থির আত্মসমর্পণ

পর্যটকদের জন্য সুন্দরবন ভ্রমণের এসে ঘরে বসে সুন্দরবনের পাক-পাখালির ডাক শোনা। পায়ে হেঁটে সুন্দরবনের অপার সেীন্দর্য্য উপভোগ করা। নিরাপত্তার সাথে রাত্রি যাপনকরাসহ বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা নিয়ে ২০১৭ সালে চাঁদপাঁই ফরেস্ট রেঞ্জের আওতায়  কৈলাশগঞ্জ ও দক্ষিণ চিলায় কমিউনিটি ইকো ট্যুরিজমের অংশ হিসাবে দুইটি ইকো কটেজ স্থাপন করা হয়েছে। যা ২০১৮ সালের জানুয়ারি থেকে ভ্রমন পিপাসু পর্যটকদের জন্য চালু করা হয়।

চাঁদপাঁই সহ-ব্যবস্থাপনা সংগঠনের সার্বিক তত্তাবধানে সুন্দরবন শর্মিলা ইকো কটেজ ও বাদাবন ইকো-কটেজ দুটি স্থাপনে সহায়তা প্রদান করে ইউএসআইডি’র ক্রেল প্রকল্প। বর্তমানে এই দুই ইকো-কটেজেও  পর্যটকদের ভিড়ে তিল পরিমাণ ঠাঁই নেই।

সুন্দরবন

বাদাবন ইকো-কটেজের পরিচালক লিটন জমাদ্দার বলেন, দিন যতই যাচ্ছে পর্যটকদের ভিড় ততই বাড়ছে। বিশেষ করে সরকারি ছুটির দিনে ভীড় বেশি থাকে।

তিনি জানান, ঘরে বনে সুন্দরবনের পশু পাখির ডাক ও বনের সৌন্দর্য্ দেখাসহ পুকুর ও ঘেরে নিজে বা অন্যের সহায়তায় মাছ মেরে তাজা মাছ খাওয়ার সুযোগ রয়েছে এ কটেজে। এছাড়া নৌকা বা ট্রলারে করে গহিন বনে ভ্রমনের সুযোগ রয়েছে।

পর্যটন ব্যবসার সাথে জড়িতরা বলছেন, কম-বেশি কালবৈশাখী ঝড় শুরু হওয়ার কারণে কিছু দিনের মধ্যে সুন্দরবনে পর্যটক কমে যাবে।

স্বাআলো/এইসএম