গ্রেফতারি পরোয়ানা পলাতক আসামির সাথে পুলিশের সেলফি

গ্রেফতারি পরোয়ানা পলাতক আসামির সাথে

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : একাধিক মাদক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাভুক্ত আসামিকে গ্রেফতার না করায় প্রশ্ন উঠেছে বরিশাল কোতয়ালী থানা পুলিশের কর্মতৎপরতা নিয়ে। আদালত থেকে দফায় দফায় গ্রেফতারের জন্য নির্দেশ আসলেও থানা পুলিশের সাথে সখ্যতা থাকায় গ্রেফতার করছেন না পুলিশ। কোতায়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ওই আসামি পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেপ্তারে তার বাসায় বেশ কয়েকবার পুলিশ হানা দিলেও পাওয়া যায়নি।

তবে ওসির এই বক্তব্য অসত্য প্রমাণিত হয়েছে একাধিক মাদক মামলার আসামি ও বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান মনির মোল্লা ও কর্তব্যপালনরত অবস্থায় এক সার্জেন্টের সাথে সেলফি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যাওয়ায়। অবশ্য পহেলা বৈশাখের দিন পোস্ট করা ওই ছবির বিষয় উল্লেখ করে ওসিকে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি।

যদিও বিষয়টি জানেন না বলে জানিয়েছেন বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের নবাগত কমিশনার শাহাবুউদ্দিন খান। তিনি জানিয়েছেন, কোন পুলিশ কর্মকর্তা যদি আদালতের নির্দেশের পরেও আসামিকে গ্রেপ্তার করেননি এমন অভিযোগ পেলে অবশ্যই কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি মনির মোল্লার বিষয়টি সম্পর্কের খোঁজ-খবর নিয়ে দেখবেন বলেও জানান বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের এই শীর্ষ কর্মকর্তা।

বরিশাল মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাহিদুর রহমান মনির মোল্লা বেশ কয়েকটি মাদক মামলায় জড়িয়ে সমালোচনার মুখে রয়েছেন। এই নেতা দীর্ঘদিন ধরেই বরিশাল পুলিশের চোখে পলাতক। আদালত দুটি মাদক মামলায় তার বিরুদ্ধে প্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। কিন্তু বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানা পুলিশ বারবারই জানিয়ে আসছে, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। অবশ্য এর মধ্যে বিদেশ ভ্রমণও করে এসেছেন মনির মোল্লা। এমনকি পুলিশের তালিকায় পলাতক এই আসামির সন্ধান চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন বরিশাল অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

গত রবিবার বিকেলে মনির মোল্লা বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক সার্জেন্ট হাসানের সাথে সেলফি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করেন। আর এতেই নতুন করে বির্তকে সৃষ্টি হয় রাজনৈতিক অঙ্গণে।

বরিশাল জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও আওয়ামী লীগ নেতা কাজী মনিরুল ইসলাম মনে করেন, পরোয়ানা জারির পরেও আসামিকে গ্রেপ্তার না করা আদালতকে অবমানা করার মতো গুরুতর অপরাধ। এই অপরাধে আদালত সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের বিরুদ্ধে যে কোন সময় পদক্ষেপ নিতে পারেন। পাশাপাশি এই অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে যেকোন সময় মামলা নিতে পারেন। এমনকি ওই কর্মকর্তাকে আটক করেও জিজ্ঞাসা করার সক্ষমতা দুদক রাখে বলে মনে করেন এই আইনজীবী।

আরো পড়ুন>> বরিশালে নানা আয়োজনে বর্ষবরণ করা হচ্ছে

ওদিকে সার্জেন্ট হাসান জানিয়েছেন, মনির মোল্লার বাসার সামনে ডিউটি পালন করার সময় সে বাসা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের মুঠোফোনে সেলফি তোলেন। পরবর্তীতে ছবিটি তার নিজস্ব ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করেছেন। হাসানের দাবী, মনির মোল্লা যে মাদক মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি তা তিনি জানতেন না।

জানা গেছে, ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর নগরীর রুপাতলী এলাকার ওজোপাডিকোর ডাকবাংলোর একটি রুম থেকে ৭০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ডিবি পুলিশের এসআই দেলোয়ার হোসেন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে মনির মোল্লা ও তার সহযোগী পুলিশ কনস্টেবলসহ ৪ জনকে আটক করা হয়। কিন্তু ডিবি পুলিশের পক্ষ থেকে তাকে আটক করা হয়নি দাবি করে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। এমনকি একটি মামলাতেও মনির মোল্লাকে আসামি দেখানো হয়নি। তাছাড়া উদ্ধার ইয়াবার সংখ্যাও কমিয়ে দেখানো হয় এজাহারে। পরবর্তীতে দুটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে পুলিশ সদস্যসহ তিন ব্যক্তিকে আদালতে প্রেরণ করলে বিচারকের কাছে তারা মনির মোল্লার সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরেন। এ নিয়ে বরিশাল পুলিশ প্রশাসন বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। তখন তৎকালীন পুলিশ কমিশনার এসএম রুহুল আমিন বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতে মাঠ পুলিশকে নির্দেশ দেন। পাশাপাশি বিষয়টি সুষ্ঠু তদন্ত করে দেখার দায়িত্ব দেন ডিবি পুলিশের পরিদর্শক জসিম উদ্দিনকে। এই পুলিশ কর্মকর্তা দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর দুটি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করেন এবং দুটি মামলার একটিতে মনির মোল্লাসহ ১১জন এবং অপরটিতেও মনির মোল্লাসহ ১৪ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এ তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার পর উচ্চআদালত থেকে অন্তবর্তীকালীন জামিন নেন আওয়ামী লীগ নেতা মনির মোল্লা। পরবর্তীতে তার জামিনের মেয়াদ শেষ হলে হাজতবাসের আশঙ্কায় আদালতে হাজিরা দেননি। ফলে আদালত বেশ কয়েকটি ধার্য তারিখে তাকে গ্রেপ্তারে পুলিশকে নির্দেশ দেন।

কিন্তু মনির মোল্লা প্রকাশ্যে এলাকায় অবস্থান করলেও কোতয়ালী থানা পুলিশ আদালতকে বরারবই খুঁজে না পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে দেন।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, ২০১৮ সালের ২১ ডিসেম্বর দুটি মামলায় অভিযোগপত্রে মনির মোল্লাকে অভিযুক্ত করার পরে তিনি উচ্চ আদালত থেকে অন্তবর্তীকালীন জামিন নেন। কিন্তু সেই জামিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরে তিনি আর আদালতে হাজির হননি। গত ৫ মার্চ বরিশাল অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তাকে পলাতক আসামি দেখিয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছেন।

মনির মোল্লার মামলা দুটি এখন চুড়ান্ত বিচারাধীন অবস্থায় রয়েছে। যেকোন সময় এ দুটি মামলার রায় ঘোষণা করতে পারেন বিচারক। এতে তাঁর সাজাপ্রাপ্তির আশঙ্কা রয়েছে। পাশপাশি মামলা দুটি মাদক সংক্রান্ত হওয়ায় দলীয়ভাবেও তিনি কোন ধরণের সহায়তা বা সহযোগিতা পাচ্ছেন না। বরং এই মামলার কারণে বরিশাল মহানগর বা জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ অনেক নেতা তার ওপর নাখোশ। ফলে দলীয় ফোরামে তিনি তেমন একটা সুবিধা না পেয়ে অনেকাংশে রাজনীতি বিমুখ হয়ে পড়েছেন।

কিন্তু মনির মোল্লার ওপর বরিশাল মেট্রোপলিটন কোতয়ালি মডেল থানার ওসির সুনজর থাকায় পুলিশ তাকে গ্রেপ্তারে অগ্রসর হচ্ছে না। তা ছাড়া ওসির কাছ থেকে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স নিয়ে এই মাদক ব্যবসায়ি বিদেশ ভ্রমণও করেছে বলে জানা গেছে।

স্বাআলো/এম