যশোর জেনারেল হাসপাতালে রোগী দুর্ভোগের নাম সেন্ট্রাল ক্যাশকাউন্টার

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর :    ‘ঢাল নেই তরোয়াল নেই নিধিরাম সরদার’ প্রবাদ কথাটির মতো অবস্থা হয়েছে যশোর জেনারেল হাসপাতালের সেন্ট্রাল ক্যাশ কাইন্টারের। প্রয়োজনীয় জনবল ও পর্যাপ্ত ক্যাশকাউন্টার না থাকায় জেলা পর্যায়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে দেশের প্রথম স্থাপিত এই ক্যাশকাউন্টার রোগীদেও কল্যাণের পরিবর্তে চরম দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দিনের দিন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে রোগীরা ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা নিতে পারছেন না। তবে হাসপাতালের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রধান এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টচার্য্য বলেছেন, এ সমস্যা সমাধানের জন্য দ্রুত ক্যাশকাউন্টার বৃদ্ধি করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালে সেন্ট্রাল কাউন্টার উদ্বোধন করা হয় গত ৪ জুলাই। আর কার্যক্রম শুরু হয় ৬ জুলাই থেকে।

হাসপাতালের বহি:বিভাগের রোগীরা প্রথমে ৫টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের কাছে যান। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা রোগীদের প্রাথমিকভাবে দেখে প্রয়োজনে পরীক্ষা নিরীক্ষা দিয়ে তার রিপোর্ট নিয়ে ফের যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। পরীক্ষা নিরীক্ষার জন্য হাসপাতালের প্যাথলজি বিভাগে গিয়ে নির্ধারিত ফি দিলে তারা এ পরীক্ষা নিরীক্ষা জন্য রক্ত, প্রস্রাব, আল্ট্রসোনা, ইসিজিসহ বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তার রিপোর্ট নিয়ে চিকিৎসকের কাছে যেত। তখন তার রিপোর্ট গুলো দেখে চিকিৎসকরা চিকিৎসা সেবাসহ ব্যবস্থাপত্র দিতেন।

এখন প্যাথলজি পরীক্ষার জন্য সরাসরি প্যাথলজি বিভাগে না গিয়ে সেন্ট্রাল ক্যাশকাউন্টারে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে স্লিপ নিয়ে প্যাথলজি বিভাগে যেতে হচ্ছে।

হাসপাতালে সেন্ট্রাল ক্যাশকাউন্টারে দুটি কম্পিউটারে দ্জুন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত টাকা নিয়ে রোগীদের টিকিট দিচ্ছেন।

ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়ের বিবিএ শেষ বর্ষের ছাত্রী তামান্না সরকার বলেন, ঝিনাইদহের হরিণাকুন্ডু থেকে তার বৃদ্ধ মাকে নিয়ে যশোর জেনারেল হাসপাতালে এসেছেন সকাল ৯টায়। টিকিট কেটে বহি:বিভাগের ডাক্তারের চেম্বারের সামনে গিয়ে সিরিয়াল দিতে হয়। সেখানে ডাক্তার দেখানোর পর এক্স-রে ও কয়েকটি রক্তের পরীক্ষা দেন। তখন বেলা সাড়ে ১২টা। এসময় ক্যাশকাউন্টারে গেলে বলা হয়েছে আগামীকাল আসুন। বৃদ্ধ মাকে নিয়ে কিভাবে আগামীকাল আসবো তা ভেবে পাচ্ছিনে।

চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার বালিহুদা গ্রামের ফজলুর রহমান স্ত্রী আলেয়া বেগমকে নিয়ে এসেছেন। ফজলুর রহমান বলেন, সিরিয়াল দিয়ে প্রথমে টিকিট কেটে সিরিয়াল অনুযায়ী ৬ নম্বর কক্ষে ডাক্তার দেখানো হয়। সেখান থেকে ১০ নম্বর কক্ষের হার্টের ডাক্তারের কাছে রেফার করেন। হার্টের ডাক্তার জয়ন্ত পোদ্দার ইসিজি করতে বলেন। সেখান থেকে ক্যাশ কাউন্টারে এসে দেখি ১২টা ৫ মিনিট। ক্যাশ কাউন্টার বন্ধ। তাই হাসপাতালে পরীক্ষা করতে না পেরে ক্লিনিক থেকে পরীক্ষা করার পর রিপোর্ট নিয়ে ডাক্তার দেখাতে হয়েছে।

একই অভিযোগ করেন, ঝিকরগাছা উপজেলার কায়েমখোলা গ্রামের জাহিদের স্ত্রী জোসনা খাতুন রেজি: ১২৩৩৭০/৭০, যশোর সদর উপজেলার গোপালপুর গ্রামের মোশারফ হোসেন, রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ১৩৩০৩০/৩০, যশোর সদর উপজেলার দলেননগর গ্রামের নান্নু বিশ^াসের মেয়ে রিয়া, রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ১১৩৩০২৫/ ২৫, সদর উপজেলার দৌলতদিহি গ্রামের মকবুল হোসেন, রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ১৩২৪৮৬/ ৮৬।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বহি:বিভাগে প্রতিদিন কমবেশি করে ২ হাজার থেকে ৩ হাজার রোগী দেখেন চিকিৎসকরা। এর মধ্যে ৪শ’ থেকে ৫শ’ রোগীর প্যাথলজী বিভাগে বিভিন্ন পরীক্ষা নিরীক্ষা করা হতো। সেন্ট্রাল ক্যাশকাউন্টার হওয়ার পর এখন প্রতিদিনি সর্বোচ্চ ১০০ থেকে ১৫০ রোগীর টিকিট দেয়া সম্ভব হচ্ছে বলে ক্যাশ কাউন্টার থেকে জানানো হয়েছে।

যশোর সদর উপজেলার গোপালপুর গ্রামের আলমগীর হোসেন বলেন, হাসপাতালে ক্যাশ কাউন্টার এবং জনবল না বাড়ালে রোগীদের উপায় না পেয়ে ক্লিনিক থেকে প্যাথলজি পরীক্ষা করাতে বাধ্য হবে। সে ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে সরকার মোটা অংকের রাজস্ব হারাবে। তাই অতিদ্রুত এর ব্যবস্থা নিতে হবে বলে তিনি দাবি করেন।

এব্যাপারে যশোর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্ব¡াধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, হাসপাতালে জনবল ও মেশিন সংকটের কারণে দিনের দিন রিপোর্ট দেয়ার জন্য বারোটা পর্যন্ত টাকা জমা নেয়া হচ্ছে। এরপর বেলা দুটার মধ্যে রিপোর্টগুলি রোগীদের দেয়া হয়। বেলা ১২টার পরে যদি টাকা জমা নেয়া হয় তাহলে সমস্যার সৃৃষ্টি হয়। তাই ১২টার পর টিকিট না দিয়ে পরের দিন আসতে বলা হয় রোগীদের। বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রালয়ের সাথে কথা বলা হয়েছে।

যশোর জেনারেল হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য যশোর সিভিল সার্জন দিলিপ কুমার রায় বলেন, যেহেতু সেন্ট্রাল ক্যাশ কাউন্টার সবার জন্য ভাল। তাই ভাল কিছুর জন্য সমস্যা হলেও তা মেনে নিতে হবে। আর জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে দেশের মধ্যে এটি প্রথম সেন্ট্রাল ক্যাশ কাউন্টার। তাই আস্তে আস্তে সব সমস্যা সমাধান হবে।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির কমিটির সদস্য ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) হুসাইন শওকত বলেন, ক্যাশ কাউন্টার সম্প্রতি উদ্বোধন করা হয়েছে। যে যে সমস্যা হচ্ছে স্বাস্থ্য বিভাগের সাথে কথা বলে তা সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্য বলেন, হাসপাতালের সেন্ট্রাল ক্যাশকাউন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, জনবল বাড়ানো হবে। কোন অবস্থায় এটি বন্ধ করা যাবে না। সেন্ট্রাল ক্যাশ কাউন্টার চালু রাখার জন্য সব কিছু করা হবে।

স্বাআলো/এএম

.

Author