১৯৮৮ সালের বন্যা ছাড়িয়েছে গাইবান্ধায়

জেলা প্রতিনিধি, গাইবান্ধা: ১৯৮৮ সালের বন্যা ছাড়িয়েছে গাইবান্ধায়। চলমান বন্যার পানি গাইবান্ধাকে গ্রাস করছে। প্রায় দেড় সপ্তাহের চলমান বন্যায় গাইবান্ধা সদর, সুন্দরগঞ্জ, ফুলছড়ি, সাঘাটা, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী ও সাদুল্লাপুর উপজেলায় প্রবেশ করেছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় সাত লক্ষাধীক মানুষ। ১৯৮৮ সালের বন্যার চেয়ে দেড় ফুট পানি বৃদ্ধি পেয়েছে চলমান বন্যার পানি। ফলে বন্যা পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। বন্যাকবলিত উপজেলায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট।

বাঁধ ভেঙে ও রাস্তা উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। অনেক এলাকায় ডুবে গেছে চরাঞ্চল ও মূল-ভুখন্ডের সম্পুর্ন ঘর। ফলে ঘরবাড়ী ছেড়ে মানুষ আশ্রয় নিয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও রাস্তায়। খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তারা।

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধায় বড় বন্যাগুলোর মধ্যে ১৯৮৮ সালের বন্যায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়িঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার ১৩৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। বৃহস্পতিবার চলমান বন্যায় বিপদসীমার ১৫০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। শুক্রবার ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১৪৪ সেন্টিমিটার ও ঘাঘট নদীর পানি বিপদসীমার ৮৯ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ ছাড়া গোবিন্দগঞ্জের করতোয়া নদীর পানি বিপদসীমার ৩৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কিন্তু পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। শুধু তিস্তা নদীর পানি কমে বিপদসীমার নিচে চলে আসছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ ভেঙে ফুলছড়ি উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের মধ্য কাতলামারী, কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের কেতকিরহাট, কাইয়ারহাট ও ভাষারপাড়া, সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের মধ্য বাগুড়িয়া, ঘাঘট নদীর বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে সদরের খোলাহাটী ইউনিয়নের ফারাজিপাড়া ও পূর্বকুঠিপাড়া, বল্লমঝাড় ইউনিয়নের কাজলঢোপ এলাকায় বাঁধ ভেঙে অনবরত লোকালয়ে প্রবেশ করছে পানি। গাইবান্ধা শহরের পূর্বপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ঘাঘট নদীর শাখা আলাই নদীর ডান পাশে বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধ না থাকায় গাইবান্ধা পৌর এলাকার কুঠিপাড়া, পূর্বপাড়া, মুন্সিপাড়া, বানিয়ারজান, উত্তর বানিয়ারজান, দক্ষিণ বানিয়ারজান এলাকা দিয়ে পানি প্রবেশ করেছে শহরের বিভিন্ন এলাকাগুলোতে।

অপর দিকে জেলার প্রধান কাঁচাবাজরের আড়ৎ বা পাইকারী পুরাতন বাজারে পানি প্রবেশ করেছে। পানি প্রবেশ করেছে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার ও জেলা জজের বাসভবনেও। পানি ঢুকেছে বাংলা বাজারের সদর উপজেলা পরিষদেও।

গাইবান্ধা শহরে পানি চলে এসেছে শনিমন্দির রোডের কাছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কার্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। পানির প্রবেশ করায় বন্ধ রয়েছে অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। বন্যার পানি বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করায় কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দিন হাজিরারভিত্তিতে কাজ করা দিনমজুররা পড়েছেন বিপাকে।

এই বন্যার মধ্যেও পরীক্ষা চলমান থাকায় বিপাকে পড়েছে গাইবান্ধা কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীরা। এক বুক পানির পথ পারি দিয়ে পরীক্ষা দিতে হচ্ছে তাদের। ফলে চরম কষ্টের মধ্যে রয়েছে পরীক্ষার্থীরাও। বুধবার জেলা প্রশাসকের সাথে সাক্ষাত করে পরীক্ষা বন্ধের দাবি জানায় পরীক্ষার্থীরা। তারপরও পরীক্ষা বন্ধ হয়নি। গতকালও পরীক্ষা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা।

সাঘাটার ভরতখালী ইউনিয়নের পোড়াগ্রামে রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়েছে সাঘাটা উপজেলার সাথে। পানির  তলিয়ে গেছে গাইবান্ধা-লক্ষ্মীপুর-সুন্দরগঞ্জ, গাইবান্ধা-বালাসীঘাট, গাইবান্ধা-সাদুল্লাপুর, গাইবান্ধা-ফুলছড়ি সড়ক।

বন্যার পানিতে জেলার সাত উপজেলার বিস্তীর্ন জনপদ প্লাবিত হওয়ায় ডুবে গেছে ফসলের ক্ষেত। ফলে এক সপ্তাহের ব্যবধানে বাজারে দাম বেড়েছে সব ধরনের সবজির দাম। পুরাতন বাজারের পাইকারী দোকানগুলোতে কাঁচা মরিচ বিক্রি হয়েছে ৯০ থেকে ১০০ টাকা কেজি দরে। অথচ গত সপ্তাহে বিক্রি হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজিতে। এ ছাড়া পেঁয়াজের দাম না বাড়লেও এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে আলু বিক্রি হয়েছে ১৭ থেকে ১৮ টাকায়, বেগুন ১২ থেকে ১৬ টাকার বদলে ২০ থেকে ২৪ টাকায়, করল্লা ৩০ থেকে ৩২ টাকার বদলে ৪০ থেকে ৪৮ টাকায়, পটল ১৭ থেকে ১৮ টাকার বদলে ২২ থেকে ২৪ টাকায়, ঝিঙ্গা ৮ থেকে ১০ টাকার বদলে ১৬ থেকে ১৮ টাকায়, কাকরোল ১০০ টাকার বদলে ১৫০ টাকায়, আদা ১৬০ থেকে ১৭০ টাকার বদলে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়, রসুন ৯০ থেকে ১০০ টাকার বদলে ১২০ থেকে ১৪০ টাকা বেড়েছে এক সপ্তাহের ব্যবধানে।

বন্যা কবলিত এলাকায় চাহিদার তুলনায় ত্রাণ খুবই কম পরিমাণে বিতরণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিভিন্ন এলাকার বন্যার্তরা। সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ী গ্রামের বাবলু মিয়া বলেন, ১০ দিন থেকে বন্যার কবলে পড়েছে আমাদের গ্রাম। এখন পর্যন্ত কেউ কোন সাহায্য সহযোগিতা করে নাই এই এলাকার মানুষেররা। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটছে গ্রামের মানুষদের।

ফুলছড়ি উপজেলার কঞ্চিপাড়া ইউনিয়নের কঞ্চিপাড়া গ্রামের আলামিন মিয়া বলেন, ঘরে এক বুক পানি। টিউবওয়েল পানির নিচে ডুবে গেছে। রান্নার ব্যবস্থা না থাকায় দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট।

গাইবান্ধা পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মোখলেছুর রহমান বলেন, চলমান বন্যা পূর্বের বন্যাগুলোর থেকে সবচেয়ে বড় এবারের বন্যা। পূর্বকুঠিপাড়ায় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার কারণে ও  আলাইয়ের (ডান পাশে) পশ্চিমে বাঁধ না থাকায় শহরে পানি প্রবেশ করছে।

জেলা প্রশাসক রোখছানা বেগম (ভারপ্রাপ্ত) বলেন, বন্যাকবলিতদের উদ্ধার করে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কোথাও খাদ্য সংকট হলে সাথে সাথে আমাদেরকে অবহিত করা হলে সেখানে খাদ্য বিতরণ করা হবে। এছাড়াও যে সব এলাকায় খাদ্য সংকট রয়েছে আমাদের নজরে আসলে যেভাবেই হোক আমরা তাদেরকে সহায়তা করবো। ত্রান পর্যাপ্ত আছে, প্রতিদিনই তা বন্যাকবলিতদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে।

স্বাআলো/আরবিএ

.

Author