ছেলে থাকে দো-তলায় মা থাকেন কলাতলায়

‘কত কষ্টে কত স্বপ্নে বেধেছি সাধের ঘর/ছেলে-বউরা নামিয়ে দিয়েছে হয়েছি তাদের পর । কলাতলার জীবন্ত গোরে করিতেছি দিন যাপন।’ কবিতার এ কটি চরণ বৃদ্ধ বয়সে অবহেলিত বাবার মনের আকুতি ও কষ্ট-বেদনা ফুটে উঠেছে। একই সাথে এমনই একটি ঘটনার অবতারণা ঘটেছে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার খাজুরিয়া গ্রামে। সেখানকার ৮৫ ঊর্দ্ধ এক মায়ের ঠাঁই হয়নি ছেলের দো-তলা বাড়িতে। এই বৃদ্ধা রশি বেগমের ঠাঁই হয়েছে অন্যের জায়গায়, কলাতলার ঝুপড়ি ঘরে।

শেষ বয়সে নানা জটিল রোগে ভুগছেন এই মা। ঝুপড়ি ঘরে বৃষ্টিতে ভিজে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন তিনি। কিন্তু মাকে ছাড়া সেই ভবনে স্ত্রী-সন্তানদের  নিয়ে সুখেই আছে ছেলে। রশি বেগমের বাবা মারা যাওয়ার পর তার আর কোনো ভাই-বোন না থাকায়  সব সম্পত্তির মালিক হন তিনি। এক যুগ আগে বাবার বাড়ির ওই সব সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা তুলে দেন ছেলের হাতে। সেই টাকা দিয়ে ইউনুস নির্মাণ করে দোতলা ভবন।

অনেক দিন আগে রশি বেগমকে তার ছেলে ও পুত্রবধূ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়। এরপর স্থানীয়রা তাকে কোনো রকমে থাকার মতো একটি ঝুপড়ি ঘর তুলে দেন। সেখানেই থাকেন তিনি। ছেলে ইউনুস মায়ের কোনো খবর রাখে না, দেয় না কোনো খরচ। এমনকি নাতিরাও দাদির খোঁজ-খবর পর্যন্ত নেয় না। এ অবস্থায় প্রতিবেশীরা খাবার দিলে খান, না দিলে উপোস থাকেন। বয়সের ভারে নানা জটিল রোগে অসুস্থ রশি বেগম এখন ভালোমতো কানে শোনেন না। ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না তিনি। কেউ কিছু বললে তাকিয়ে থাকেন এই বৃদ্ধা।

গর্ভধারিণী মা সন্তানের কাছে কত বড় বোঝা হয়েছে যে সেই মার খোঁজ-খবর নেয় না।  এ কথাটা শোনাও বোধ হয় পাপ। অনুভুতিপ্রবণ মানুষের চোখে পানি না এসে পারে না। কোন বিবেকে কোন মানসিকতায় ছেলে মাকে এভাবে ফেলে রাখে। বাড়ির ইতর প্রাণিটার প্রতিও তো মরণাপন্ন অবস্থায় এভাবে অবহেলায় ফেলে রাখা যায় না। অথচ বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার খাজুরিয়া  গ্রামের প্রায় শতবর্ষী মা রশি বেগমের ভাগ্যে এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটেছে।

বন্য পশুর মধ্যে আর বৃদ্ধার ওই সন্তানের মধ্যে পার্থক্য করা যায় কি? বন্য পশুর বাচ্চাগুলো বড় হয়ে গেলে যে যার মতো এদিক সেদিক চলে যায়। মার ভাগ্যে কি হলো তা আর তারা দেখে না। এটা প্রাকৃতিক বিধান। এ বিধান পশুর জন্য প্রযোজ্য। মানুষের জন্য নয়। কারণ মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। যারা মানুষের সমাজে বাস করেও পশুর মতো আচরণ করে তাদের এ সমাজে বাস করার কোনো অধিকার থাকা উচিত নয়। বনই তাদের জন্য উপযুক্ত স্থান।

মায়ের দোয়া ছাড়া ইহকাল পরকাল কোনো কালেই সন্তানের কল্যাণের আশা নেই। মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেস্ত। ধর্মের এই মর্মবাণী কি তাদের কানে কোনো দিন পৌছায়নি?

দিন দিন পারিবারিক বন্ধন যে ভাবে শিথিল হচ্ছে তাতে এক দিন দেখা যাবে প্রবীণদের দেখার বা সেবা-যত্নের কেউ নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারি উদ্যোগে প্রবীণদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা উচিত বলে আমরা মনে করি।

স্বাআলো/এসএ