আজ জাতীয় শোক দিবস

‘মানুষ কাঁদো/যদি বাঙালি হও নিঃশব্দে কাছে এসো, আরো কাছে… এখানেই শুয়ে আছেন অনন্ত আলোয় নক্ষত্রলোকে/জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ কবি ‘কাঁদো বাংলার মানুষ কাঁদো’ কবিতায় এভাবেই শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। ইতিহাসের কালীমালিপ্ত একটি অধ্যায় ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। এ দিন শোকে কাতর আকাশ কেঁদেছিল, কেঁদেছিল বাতাস। কিন্তু ঘাতকের উদ্ধত সঙ্গিন কাঁদতে দেয়নি বাঙালিকে। তাই ভয়ার্ত বাংলার প্রতিটি ঘর থেকে এসেছিল চাপা দীর্ঘশ্বাস। কী নিষ্ঠুর, কী ভয়াল, কী ভয়ঙ্কর সেই রাত। যে রাতে স্ত্রী-সন্তানসহ সপরিবারে নিহত হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

আজ যে বাঙালির কাঁদারই দিন। কাঁদো বাঙালি কাঁদো। আজ যে সেই ভয়াল-বীভৎস ১৫ আগস্ট। আজ সেই অন্তিম শোকার্ত বাণীপাঠের দিন। বেদনাবিধুর ও কলঙ্কের কালিমায় কলুষিত বিভীষিকাময় ইতিহাসের এক ভয়ঙ্কর দিন। আজ ১৫ আগস্ট, জাতীয় শোক দিবস। বছর ঘুরে রক্তের কালিতে লেখা সে দিন আবার ফিরে এসেছে। আজ আমরা বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কবির ভাষায়  উচ্চারণ করি ‘ধন্য সেই পুরুষ, যার নামের ওপর রৌদ্র ঝরে/চিরকাল গান হয়ে/নেমে আসে শ্রাবণের বৃষ্টিধারা/যার নামের ওপর কখনো ধুলো জমতে দেয় না হাওয়া/ধন্য সেই পুরুষ যার নামের ওপর ঝরে/মুক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে গণহত্যা চালাল পাক হানাদারদেরই এদেশীয় দোসর কিছু বিশ্বাসঘাতক। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনায় আস্থাহীন দেশীয় কিছু রাজনীতিকের পাশাপাশি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে বঙ্গবন্ধু নৃশংসভাবে শহীদ হন সেই কালরাতে। তবে প্রবাসে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। না-ফেরার দেশ থেকে অবিসংবাদিত এই নেতা ফিরে না এলেও বছর ঘুরে বার বার আসে রক্তঝরা ১৫ আগস্ট। ৪৪ বছর আগে অভিশপ্ত দিনে বিশ্বাসঘাতকরা যাকে বিনাশ করতে চেয়েছিল সেই শেখ মুজিব মরেননি। বাঙালির হৃদয়ে অবিনাশী হয়ে আছেন।

নারকীয় এই সেনা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করে কিছু বিশ্বাসঘাতক মিরজাফর রাজনীতিক এবং বিপথগামী কিছু সামরিক কর্মকর্তা। এদের মধ্যে ছিলেন শেখ মুজিবের প্রাক্তন সহকর্মী খন্দকার মোশতাক আহমেদ, যিনি তার স্থলাভিষিক্ত হন।

দেশদ্রোহী খুনিরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে তার নাম চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিল। বহু কণ্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি বরখাস্তকৃত লে. কর্নেল সৈয়দ ফারুক রহমান, লে. কর্নেল (অব.) সুলতান শাহরিয়ার রশিদ খান, মেজর (অব.) বজলুল হুদা, লে. কর্নেল (অব.) এ কে এম মহিউদ্দিন আহমেদ (ল্যান্সার) এবং লে. কর্নেল (অব.) মুহিউদ্দিন আহমেদকে (আর্টিলারি) ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। কিন্তু বিদেশে পালিয়ে থাকা অন্য খুনিদের এখনো দেশে ফিরিয়ে এনে ফাঁসি কার্যকর করতে পারেনি সরকার। তাই এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের তপ্ত হৃদয়ে এখনো বইছে ক্ষোভের বহ্নি শিখা।

বঙ্গবন্ধু মৃত্যুঞ্জয়ী এমন এক বীরের নাম, যিনি জীবনের শেষক্ষণেও ছিলেন দৃঢ়চেতা। তার মৃত্যুর মধ্যদিয়ে মৃত্যু ঘটে একজন মহান জাতীয়তাবাদী নেতার। যিনি তার জাতিসত্তা বাঙালিত্বের চেতনায় এই বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষকে জাগ্রত করেছিলেন। আজীবন লড়াই করেছেন প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে। বাংলার মানুষের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  জীবনে স্বদেশের মাটি আর মানুষকে এমন গভীর ভালোবাসার বন্ধনে বেঁধেছিলেন, যে বন্ধন কোনোদিন ছিন্ন হওয়ার নয়। তাই আজো মানুষ স্মরণ করে বঙ্গবন্ধুকে। ঠিক তেমনভাবে যেমনভাবে বলেছিলেন কবি ‘এই বাংলার আকাশ-বাতাস, সাগর-গিরি ও নদী/ডাকিছে তোমারে বঙ্গবন্ধু, ফিরিয়া আসিতে যদি/হেরিতে এখনও মানবহৃদয়ে তোমার আসন পাতা/এখনও মানুষ স্মরিছে তোমারে, মাতা-পিতা-বোন-ভ্রাতা।’