ফেরেস্তা এসেও আইন প্রয়োগ করতে পারবে না

দেশে আইন আছে প্রয়োগ নেই। এমন একটি কথা প্রায় এক বছর আগে ৫ নভেম্বর বলেছিলেন জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন। তিনি বলেছিলেন, আমাদের দেশে আইন আছে, কিন্তু আইন মানার প্রবণতা নেই। পৃথিবীর মধ্যে আইন অমান্যকারী দেশের শীর্ষে হচ্ছে বাংলাদেশ। এ কথাটি প্রমাণ হয়ে গেল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার কথায়। তিনি গত ৩১ আগস্ট রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স অডিটোরিয়ামে এক আলোচনা সভায় বলেছেন, ফেরেস্তা নেমে আসলেও আইন প্রয়োগ সম্ভব নয়। আইন প্রয়োগে সর্বোচ্চ মাত্রার চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে অত্যন্ত ক্ষোভ ও দুঃখের সাথে তিনি এ কথাটি বলেছেন। তিনি বলেন, ৯৮ শতাংশ মানুষ যদি আইন না মানে তাহলে পুলিশ কেন ফেরেস্তা এসেও আইন প্রয়োগ করতে পারবে না। তিনি ডিএমপি কমিশনার হিসেবে গত পৌণে পাঁচ বছরে বাস মালিক-শ্রমিকদের সাথে বার বার বসেছেন। বেশ কিছু সমস্যা চিহ্ণিত করে সেগুলো থেকে উত্তরণের পথ খুঁজেছেন। কিন্তু পুলিশের বাইরে সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসাসহ অনেকগুলো সংস্থার সমন্বয়ের অভাবে কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি। তিনি বলেন, বেশিরভাগ মানুষ অপরাধ করলে পুলিশের পক্ষে আইন প্রয়োগ অসম্ভব।

দেশের স্বার্থে, মানুষের স্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে আইন প্রণীত হয়। কিন্তু সেই আইনের যদি প্রয়োগ না হয় তা হলে আইন প্রণয়ন করে লাভটা হলো কি? আইন আছে গ্রামীণ সড়কে ভারী যানবাহন চলতে পারবে না, কিন্তু চলছে এবং কেউ প্রতিবাদ করলে উল্টো যারা চালাচ্ছে তারা গলার স্বর উচ্চে তুলে বলছে রাস্তা তো যানবাহন চলার জন্য, গাড়ি চলবে।

এই আইন ভাঙার কারণে যে কি জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হচ্ছে তা প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। কোনো জায়গায়  আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না। এই যেমন আইন আছে জনবহুল স্থানে প্রকাশ্যে ধুমপান করা যাবে না। কিন্তু ধুমপায়ীরা তা মানছে না। যারা আইন মানছে না তারা বলছে, আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছায় বাধা দেয়ার তুমি কে? আইন আছে ফিটনেস বিহীন গাড়ি রাস্তায় চলতে পারবে না। কিন্তু চলছে। চালকরা বলছে, তোমার পছন্দ না হয় গাড়িতে উঠো না। বাধা দেবার তুমি কে? আইন আছে আবাদি জমির টপ সয়েল কাটা যাবে না। কিন্তু বিরামহীনভাবে কাটা হচ্ছে। কেউ কিছু বললে বলা হচ্ছে, আমার জমি থেকে আমি কাটছি, এতে বাধা দেবে কেন? আইন আছে লোকালয় থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ইট ভাটা করতে হবে। কিন্তু বাড়ির আঙিনায় বসানো হচ্ছে এই ভাটা। দাপটধারী ভাটা মালিকদের এ কাজের প্রতিবাদ করলে জীবন হারাতে হতে পারে। আইন আছে সিনিয়র নাগারিকদের মর্যাদা দিতে হবে। কিন্তু এ আইনটি মানার চেতনা সম্পন্ন মানুষের বড্ড অভাব এ  দেশে। আইন আছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গাইড বা নোট বই পড়ানো যাবে না। কিন্তু বিপক্ষে কেউ কিছু বললে পাল্টা বলা হচ্ছে তা হলে তুমি এসে পড়িয়ে দিয়ে যাও। আইন আছে বিনা টিকিটে ট্রেনে ওঠা দন্ডনীয় অপরাধ। কিন্তু বিনা টিকিটের যাত্রী টিটির কাছে আদরের পাত্র তা কি কেউ লক্ষ্য করছে? আইন আছে জনসাধারণের চলাচল বিঘিœত করে রাস্তার ওপর সভা সমাবেশ করা যাবে না। কিন্তু তা হচ্ছে। কার ঘাড়ের ওপর কটা মাথা আছে যে এর প্রতিবাদ করবে? আইন আছে নদী লিজ নেয়া যাবে, কিন্তু স্রোতধারা বন্ধ করা যাবে না। কিন্তু লিজ নেয়া কোন নদীর বুক দিয়ে ¯্রােত চলতে পারে? আইন আছে সড়কে চাঁদাবাজী চলতে পারবে না। কিন্তু প্রশাসনের নাকের ডগায় চেকপোস্ট বসিয়ে দিব্বি সেই কাজটা চলছে, যারা বলার তারা কিছুই বলছে না। জনগণ কিছু বলতে গেলে অরাজকতা সৃষ্টি হবে। সেই অরাজকতা ঠেকাতে কিন্তু তারা বড্ড তৎপর। আইন আছে সাদা পোশাকে পুলিশ ডিউটিতে যেতে পারবে না, কিন্তু যাচ্ছে। আইন আছে বিনা ওয়ারেন্টে কাউকে আটক করা যাবে না, কিন্তু আটক হচ্ছে হাজার হাজার। প্রতিবাদ করলে সেক্ষেত্রেও বিনা ওয়ারেন্টে প্রতিবাদকারীকে আটক করা হচ্ছে।

ছোট ছোট বালুকণা মিলেই কিন্তু বিশাল মরুভূমির সৃষ্টি। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পানিকণা মিলেই সৃষ্টি মহাসাগর। আইন না মানার উল্লেখিত বিষয়গুলো হতে পারে ছোট বিষয়। কিন্তু আমরা বলবো আসলে ছোট বিষয় নয়। কারণ ছোট বিষয় হলে আইন প্রণয়ন হতো না। ছোট হোক বড় হোক জনস্বার্থে বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়া সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের একান্ত জরুরী। আইন অমান্য করে আমরা কোনোক্রমেই নিজেদেরকে সভ্য জাতি দাবি করতে পারিনে। আমরা আশা করবো জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগ হোক। আমরা আইন মান্যকারী সভ্য জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই।