রংপুরের বালিকা বধূদের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প

হারুন উর রশিদ সোহেল, রংপুর: রংপুর বিভাগের বিভিন্ন গ্রামে বাল্য বিয়ের কারণে ঘর ভাঙছে বিয়ের বয়স হবার আগেই। এমনি ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার মাজেদা, সুচিত্রা, বুলবুলি, মুনমুন আদরী, ফেরদৌসিসহ অসংখ্য কিশোরী। নতুন করে বাঁচতে শেখার জন্য এখন তারা ‘আলোর ভুবনের’ বাসিন্দা।

তাদের পথ দেখাচ্ছে আরডিআরএস পরিচালিত রংপুর নগরীর আলোর ভুবন নামে একটি সেল্টার হোম। গত ১০ বছরে এ পর্যন্ত ৩২৬জন কিশোরী এখান থেকে আলোর পথে ফিরে গেছেন। তারা এখন জীবন যুদ্ধে জয়ী হয়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে গেছেন। তাদের বাড়ি কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও ময়মনসিংহের জামালপুর জেলার বিভিন্ন গ্রামে।

এমন একজন বালিকা বধূ মাজেদা বেগম (১৪) জানায়, তার বাড়ি লালমনিরহাট সদরের কলমীপাড়া গ্রামে। ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তার বিয়ে হয়, লালমনিরহাট শহরের ডালপট্রি গ্রামের ভাংড়ি ব্যবসায়ী মোস্তফা মিয়া মিলনের (১৮) সাথে। বিয়ের সময় নগদ ৭০ হাজার টাকাসহ আসবাবপত্র দেয়া হয়। বিয়ে ঠিকভাবে হলেও বিয়ের পরের দিনই শুরু হয় ঝামেলা। স্বামী মিলন বিয়ের পরের দিনই তাকে বাড়িতে রেখে ঢাকায় চলে যায়। তার একমাস পরেই পুনরায় তার কাছে আসে। তখন প্রতিনিয়তই কোন না কোন বিষয় নিয়ে চলতো ঝগড়া। কারণ ছোট থেকেই তার স্বামী নেশাসক্ত ছিল। শুধু স্বামী নন পুরো পরিবারই নেশা দ্রব্য বিক্রি ও সেবনের সাথে জিড়ত ছিল। এক সময় গাঁজার ব্যবসা করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরাও পড়ে। পরে কিশোর হওয়ায় তাকে যশোর কিশোর কারাগারে পাঠানো হয়। বেশ কিছুদিন সেখানেই ছিল। পরে ছাড়া পেয়ে আবারও ওই পথে নেমে পড়ে। এতে বাঁধা দিতে গেলেই শুরু হয় মারধোর-নির্যাতন। একপর্যায়ে স্বামীর নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে বাবার বাড়িতে চলে যায় ওই কিশোরী। বিয়ের ৯ মাসের মাথায় পরিবারের সম্মতিতে কাজির মাধ্যমে স্বামীকে তালাক দেয়। পরে চলতি বছরের জুলাই মাসে রংপুরে আলোর ভূবনে আসে নতুন করে বাঁচতে শিখছে। এখানে সে সেলাই, নকশি কাঁথা, মোমবাতি তৈরিসহ হাতের কাজের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এর পর এখন থেকে ফিরে গিয়ে সে নিজে এ সব কাজ করে আর্থিক উপার্জনের পথে নামবে। ভবিষ্যতে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে আবারো পড়াশুনা করার ইচ্ছা রয়েছে তার।

 গ্রামে বাল্য বিয়ের কারণে ঘর ভাঙছে বিয়ের বয়স

সুচিত্রা রানী রায় (১৯), তার বাড়ি কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার চন্দ্রখানা গ্রামে। পিতা যোগেন চন্দ্র রায় পেশায় কৃষক। যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে সে পড়াশোনা করত সেই সময় দুই পরিবারের সম্মতিতে ২০১৬ সালে তাদের বিয়ে হয়। স্বামী ছিলেন নেশাসক্ত। নেশা করে তাকে মারধোর করতো। নেশা সেবনে বাধা দিলেই নেমে আসতো তার ওপর নির্যাতন। দিনদিন নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। বিষয়টি পরিবারকে জানালে ঘটে আরো বিপত্তি। যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়া হয় পরিবারের সাথে। বাধ্য হয়ে কুড়িগ্রাম আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে সে। বর্তমানে মামলা চলমান রয়েছে। এখন সুচিত্রা আলোর ভূবনে এসে সেলাই, হাতের কাজ, পুতি, মোমবাতি বানানোসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছে। বর্তমানে ভালো আছে। সে বলে, প্রশিক্ষণ গ্রহণের ফলে যে কাজ শিখেছি আমাকে নিজের স্বপ্ন বুননে সহায়তা করবে।

দিনাজপুরের বিরল উপজেলার মাধববাটি গ্রামের দরিদ্র কৃষক আজিজুল হকের মেয়ে শারমিন আক্তার। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় ১৪ বছর বয়সে বিয়ে হয় একই উপজেলার বিষুপুর গ্রামের হোটেল ব্যবসায়ী রেজাউল ইসলামের সাথে। পারিবারিক অভাবের কারণে তার এই বিয়ে হয়। বিয়ের সময় নগদ দেড় লাখ টাকাসহ স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র ও একটি গরু দেয়া হয়। বিয়ের পর কিছুদিন ভালোই চললেও পরবর্তীতে শুরু হয় ঝগড়া-বিবাদ। বিয়ের পূর্বেই স্বামী নেশায় আসক্ত থাকার কারণে এই ঝগড়া-বিবাদ বাঁধে। শুরু হয় নানা ধরণে নির্যাতন। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে গেলে বাবার বাড়িতে চলে আসে শারমিন। বর্তমানে সেল্টার হোমে প্রশিক্ষণ নিয়ে হাউজ কিপিং পদে কর্মরত রয়েছে। সেখানে সাড়ে ৪হাজার টাকা বেতন পান। তার ইচ্ছা রয়েছে গ্রামে গিয়ে অন্যদের প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে নিজেকে স্বাবলম্বী করে তোলা।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ি উপজেলার বুলবুলি আক্তার। ৭ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় তার বিয়ে হয় তার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বয়সে বড় আলমগীর হোসেনের সাথে। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী নাগেশ্বরী উপজেলার নাখারগঞ্জ গ্রামে। পেশায় ছিলেন মুদি ব্যবসায়ী। বিয়েতে সে রাজি না থাকলেও পরিবারের চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয়। এক বছর যেতে না যেতেই যৌতুকের জন্য শুরু হয় নির্যাতন। গত কোরবানীর ঈদে বাবার বাড়িতে আসেন। তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যায়। পওে তালাক হয়। বর্তমানে সেলাই, হাতের কাজ, মোমবাতি, ঢোঙ্গা, শোপিজসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। পুনরায় পড়ালেখা শুরু করেছেন। ৯ম শ্রেণিতে ভর্তি হয়েছেন ছিলাখানা ভোকেশনাল উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে। পরিকল্পনা রয়েছে আগামীতে পড়ালেখার পাশপাশি হাতের কাজ করে নিজে স্বাবলম্বী হবার। অন্যকেও দিতে চান প্রশিক্ষণ।

শুধু মাজেদা, বুলবুলি, শারমিন, সুচিত্রা নয়। তাদের মতো আরপিনা বেগম, তাছলিমা খাতুন, মৌসুমী আক্তার, বিলকিস খাতুন, আম্বিয়া খাতুন, তাছলিমা খাতুন, মোসলেমা খাতুন, মালা খাতুন, ফেরদৌসী বেগম, মুনমুন আক্তার, খালেদা আক্তার, আদুরী আক্তার, শেফালী বেগম, স্বপ্না খাতুন ও জোসনা খাতুন একই রকম ভাগ্যবিড়ম্বনার শিকার।

বাল্য বিয়ের শিকার ২১ কিশোরী সবাই কাজে ব্যস্ত। কেউ সেলাই, মোমবাতি বানানো, হাতের কাজসহ বিভিন্ন কাজ শিখছে। সবার স্বপ্ন নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং আত্মনির্ভরশীল হবে। তারা জানায়, তাদের মতো আর কেউ যেন বাল্য বিয়ের শিকার না হয়।

স্বাআলো/আরবিএ