ডিসির পর ইউএনওর কুকীর্তি ফাঁস

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা : জামালপুরের ডিসির অনৈতিক কাণ্ডের রেশ না কাটতেই এবার ফাঁস হয়েছে সুনামগঞ্জের ইউএনওর কুকীর্তি। নিজের প্রেমিকার নামে গোপন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে সেখানে লেনদেন করেছেন লাখ লাখ টাকা। এছাড়া প্রেমিকাকে নিয়ে দিনের পর দিন রাত কাটিয়েছেন ফ্ল্যাট ও আবাসিক হোটেলে। অবিশ্বাস্য হলেও চাঞ্চল্যকর এমন ঘটনার জন্ম দিয়েছেন প্রশাসন ক্যাডারের ৩০তম ব্যাচের এক কর্মকর্তা।

অভিযুক্ত এই ইউএনওর নাম আসিফ ইমতিয়াজ। ঘটনার সময় চট্টগ্রাম ডিসি অফিসের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তার পদে (এলএও) কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে কর্মরত।

প্রেমিকার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত তদন্ত কমিটি কেঁচো খুঁড়তে গিয়ে রীতিমতো সাপের সন্ধান পেয়েছে। জানা যায়, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গত বছরের জুন থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা পদে কর্মরত থাকাবস্থায় স্থানীয় একটি ব্যাংকের কদমতলী শাখায় এ অ্যাকাউন্টটি খোলা হয়। ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে সেখানে কয়েক মাস ধরে মোটা অংকের টাকা লেনদেনও করেন আসিফ ইমতিয়াজ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ে না করায় বিষয়টি নিয়ে প্রেমিকার সঙ্গে বিরোধ বাধলে ব্যাংকে গোপন লেনদেনের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় জনৈক শিক্ষার্থীর সঙ্গে পরিচয় ঘটে আসিফ ইমতিয়াজের। তখন তিনি চট্টগ্রামে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এলএ শাখায় ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা (এলএও) হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রাথমিক পরিচয়ের সূত্র ধরে তিনি তার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একপর্যায়ে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে ফ্ল্যাট ও আবাসিক হোটেলে বসবাস শুরু করেন। ততদিনে গোপনে বিয়েবহির্ভূত অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি ঘনীভূত হয়ে ওঠে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিয়ে করতে না চাইলে বিপত্তি ঘটে। ভুক্তভোগী নারী প্রতিকার চেয়ে ৫ মে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন। এরপর মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে সুনামগঞ্জ জেলার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হারুন অর রশিদকে প্রধান করে ১ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠিত হয়।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ইউএনও আসিফ ইমতিয়াজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে কমিটি জানতে পারে, আয়বহির্ভূত লাখ লাখ টাকা ব্যাংকে রাখার জন্য তিনি একজন নারীর নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের চট্টগ্রামের কদমতলী শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলেন। ঘনিষ্ঠতা থাকার সময় ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে দেয়ার কথা বলে ভোটার আইডিসহ প্রয়োজনীয় যেসব ব্যক্তিগত কাগজপত্র নিয়েছিলেন সেগুলো সংযুক্ত করে জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে হিসাবটি খোলা হয়। এতে ব্যাংকটির শাখা ম্যানেজার খোরশেদ আলমের হাত ছিল। ওই সময় জমি অধিগ্রহণের বিপুল পরিমাণ অর্থ গচ্ছিত রাখতে ব্যাংকটিতে পৃথক অ্যাকাউন্ট খোলা হয় বলে সূত্র জানায়। ওই সুবাদে ব্যাংক ম্যানেজারের সঙ্গে তার বিশেষ সখ্যও গড়ে উঠে।

জানতে চাইলে ভুক্তভোগী নারী বলেন, আসিফের সঙ্গে তার সম্পর্ক হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। এরপর কর্মসংস্থান ব্যাংক থেকে ঋণ পাইয়ে দেয়ার কথা বলে আমার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নেন তিনি। অথচ আমার সম্মতি ও স্বাক্ষর ছাড়া ব্যাংকের সঙ্গে যোগসাজশ করে ব্যক্তিগত সেই কাগজপত্র দিয়ে আমার নামে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলে অবৈধ লেনদেন শুরু করেন।’ যখন ভয়াবহ এ জালিয়াতির ঘটনা জানতে পেরে আমি হতভম্ব হয়ে পড়ি। কারণ আসিফ ইমতিয়াজ তখন একজন সিনিয়র ম্যাজিস্ট্রেট। কিন্তু এ ঘটনার পরই তার আসল রূপ প্রকাশ পায়। ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে আড়াল করার চেষ্টা করেন। কিন্তু এর মধ্যে আমার যা সর্বনাশ হওয়ার তা হয়ে গেছে।

তিনি আরো বলেন, গত নভেম্বরে ঢাকার বনশ্রীর ভাড়া ফ্ল্যাটে থাকাকালে হঠাৎ তার মানিব্যাগে আমার নামে স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের এটিএম কার্ড দেখতে পাই। ওই সময় ওই কার্ডের নম্বরটি আমি গোপনে রেখে দেই। পরে আমি সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি, এটিএম কার্ড দিয়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। এরপর এ বিষয়ে আমি তাকে যখন জিজ্ঞেস করি তখন সে (আসিফ ইমতিয়াজ) আমার কাছে বিষয়টি অস্বীকার করেন। পরে আমার নিজের নিরাপত্তার জন্য ৩ এপ্রিল তেজগাঁও থানায় সাধারণ ডায়েরি করি।

তদন্তকারী কর্মকর্তা সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) ২ জুলাই স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখা ব্যবস্থাপককে দাপ্তরিক চিঠি দেন। এতে ভুক্তভোগী নারীর নাম উল্লেখ করে বলা হয়, ‘তাকে বিয়ের প্রলোভন, অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন, হত্যার হুমকি, ব্যাংকে অবৈধ অর্থ লেনদেন ও সন্তানের অস্বীকৃতি বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছেন। ১ জুলাই এ বিষয়ে শুনানিকালে তিনি জানান, তার কাগজপত্র দিয়ে তাহিরপুরের ইউএনও আসিফ ইমতিয়াজ গোপনে আপনার ব্যাংকে উল্লেখিত হিসাব খুলেছেন। যা তিনি জানেন না।

আরো পড়ুন>>প্রেমিকের বাড়িতে গিয়ে প্রেমিকার আত্মহত্যা

এটিএম কার্ড ব্যবহার করে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে ইতিমধ্যে বিশ লাখ টাকা লেনদেন করা হয়েছে। এ বিষয়ে অভিযুক্ত আসিফ ইমতিয়াজের কাছে জানতে চাইলে তিনি তা অস্বীকার করেন।

স্বাআলো/শা