নারীর সঙ্গে ওসির অশ্লীল ভিডিও, অভিযুক্তরা বলছেন এডিট করা

জেলা প্রতিনিধি, কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জে নারীর সঙ্গে এক ব্যক্তির আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও নিয়ে তোলপাড় চলছে। বলা হচ্ছে, ছবি ও ভিডিওতে পুরুষ লোকটি জেলার কটিয়াদী মডেল থানার ওসি আবু শামা ইকবাল হায়াতের। তবে ওসি আবু শামা ইকবাল হায়াতের দাবি এটি আসল ছবি না। কম্পিউটারে এডিট করে তার ছবির মতো করা হয়েছে।

এ ঘটনায় ওই নারী বাদি হয়ে স্থানীয় এক সাংবাদিকসহ ২ জনকে আসামি করে গত সোমবার রাতে কটিয়াদী থানায় জিডিটাল নিরাপত্তা আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। মামলা দায়েরের পর রাতেই মালার প্রধান আসামি হিমেল এবং কটিয়াদী প্রেসক্লাবের সভাপতি ও বাংলা টিভির কটিয়াদী প্রতিনিধি সৈয়দ মুরসালিন দারাশিকোকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তবে রাতেই মুচলেকা নিয়ে সাংবাদিক দারাশিকোকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়া হয়।

মামলায় ওই নারী উল্লেখ করেন, তার ও কটিয়াদী থানার ওসির ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন করা এবং সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য আপত্তিকর ছবিতে তার মুখমন্ডল লাগানো হয়েছে। তবে মামলার এজাহারে ভিডিওর কথা উল্লেখ করা হয়নি।

আরো পড়ুন>>>  ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্রী অন্তঃসত্ত্বা, মাসহ সৎবাবা আটক

এদিকে থানার ওসির সঙ্গে ওই নারীকে জড়িয়ে ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা নিয়ে এলাকার তোলপাড় চলছে। ফেইসবুক আইডিসহ নানাজনের ম্যাসেঞ্জারে ছড়িয়ে পড়েছে অশ্লীল ভিডিওটি। এ ব্যাপারে কটিয়াদী থানার ওসি একটি জিডি করেছেন। বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশ সুপারের নির্দেশে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (তদন্ত) মিজানুর রহমানকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এলাকাবাসী জানিয়েছেন, কটিয়াদী পৌর এলাকার ওই নারীর স্বামী দেশের বাইরে থাকেন। একই এলাকার হিমেল নামে এক যুবকের সঙ্গে তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

হিমেলের পরিবারের দাবি, হিমেলের কাছ থেকে ওই নারী মোটা অংকের টাকা ধার নেন। ওই নারীর সাথে সম্পর্কের অবনতি হলে হিমেল তার পাওয়া টাকা আদায়ের জন্য কটিয়াদী থানা পুলিশের সাহায্য চায়। কটিয়াদী মডেল থানার ওসি আবুশামা ইকবাল হায়াত ওই নারীকে থানায় ডেকে এ নিয়ে তার সাথে কথা বলেন। কিন্তু হিমেল টাকা ফেরত পায়নি। তবে ওসির দাবি, থানায় বসে টাকার বিষয়টি ফায়সালা করে দেয়া হয়েছিল। এ ঘটনার কিছুদিন পর ওই নারীর আপত্তিকর ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে দেয়া হয় বিভিন্ন মাধ্যমে।

সে পরিপ্রেক্ষিতে ২৮ বছর বয়সি ওই নারী গত ৯ সেপ্টেম্বর রাতে কটিয়াদী থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে (নং-১০, ধারা- ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ এর ২৩(২),(৩)/২৫(২),(৩)/৩৫(২)) একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় কটিয়াদী পৌর এলাকার আসাদ মিয়ার ছেলে হিমেল ও  সৈয়দ সামছুদ্দোহার ছেলে কটিয়াদী প্রেসক্লাবের সভাপতি সৈয়দ মুরছালিন দারাশিকোর নাম উল্লেখসহ আরো অজ্ঞাত ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়।

মামলার বিবরণে উল্লেখ করা হয়, মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পরিচয়ের সূত্র ধরে হিমেলের সাথে ওই নারীর সম্পর্ক গড়ে উঠে। ২০১৬ থেকে ২০১৭ সন পর্যন্ত হিমেলের সাথে সম্পর্ক ছিল উল্লেখ করে তিনি মামলার বিবরণে বলেন, হিমেল গোপনে তার মোবাইল ফোন থেকে স্বামীর সাথে মেলামেশার কয়েকটি ছবি নিজের মোবাইলে নিয়ে যায়। পরবর্তীতে সম্পর্ক করতে রাজি না হওয়ায় ২০১৭ সনের শেষের দিকে সাংবাদিক দারাশিকোর সহযোগিতায় হিমেল তার নগ্ন ছবি বিভিন্ন মোবাইল করে ভাইরাল করে দেয়।

গত ২৯ আগষ্ট হিমেল তার মোবাইলের ইমু আইডি থেকে ওই নারীর এক দেবরের মোবাইলে এক পুরুষের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় দু’টি ছবি পাঠায়। ওই নারীর দাবি ছবির মুখমন্ডল তার হলেও শরীর অন্য কারো। এতে বলা হয়, গত ৯ সেপ্টেম্বর প্রিয়া সুলতানা নামে একটি ফেইসবুক আইডি থেকে আমাকেসহ ওসি সাহেবের বিভিন্ন অপবাদ ছড়ানো হয়। আসামিরা আমার ছবি বিকৃত করে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে আমাকে হেয় প্রতিপন্নসহ মর্যাদা ক্ষুন্ন করাসহ ওসি সাহেব একজন সরকারি কর্মচারি হওয়ায় তার সুনাম ক্ষুন্ন করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, ওই নারীর সাথে আপত্তিকর অবস্থায় দেখা যাওয়া অন্য ছবিটি কটিয়াদী থানার ওসির। তবে ছবিটি অস্পষ্ট থাকায় এবং শরীরের পুরো অংশ দেখা না যাওয়ায় সেটা নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কটিয়াদী মডেল থানার ওসি আবু শামা ইকবাল হায়াত বলেন, এ ঘটনায় একজন নারী বাদি হয়ে দু’জনের নামে থানায় মামলা করেছেন। পুলিশ মামলার প্রধান আসামি হিমেলকে গ্রেফতার করেছে। তাকে ৭ দিনের রিমান্ড আবেদন করে মঙ্গলবার আদালতে পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, হিমেলের সাথে ওই নারীর দুই বছর সম্পর্ক ছিল। সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাওয়া সে তার ছবি বিকৃত করে ছড়িয়েছে। ওই নারীর সাথের অজ্ঞাত পুরুষের ছবিটি তার নয়, উল্লেখ করে ওসি আরো বলেন, আমাকে এসবের সঙ্গে কেন জানানো হচ্ছে, এর পেছনে কারা কাজ করছে সেটি তদন্তের পরই জানা যাবে।

মামলার দ্বিতীয় আসামি সাংবাদিক সৈয়দ মুরছালিন দারাশিকোকে রাতে বাড়ি থেকে আটক করে এনে কেনইবা আবার থানা থেকে ছেড়ে দেয়া হলো- এমন প্রশ্নের জবাবে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আবু শামা ইকবাল হায়াত বলেন,  আসলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কোনো আসামি অপরাধের সাথে জড়িত কিনা সেটা নিশ্চিত হয়েই তাকে গ্রেফতার করতে হয়। সাংবাদিক দারাশিকোকে গ্রেফতার করা হয়নি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আনা হয়েছিল। জিজ্ঞাসাবাদের পর তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বিপিএম (বার) বলেন, এ বিষয়ে মামলা হয়েছে। তদন্তের পর দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে যেহেতু ওসির বিষয় নিয়ে কিছুটা অস্পষ্টতা আছে তাই বিষয়টি তদন্তের জন্য অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) কে বিষয়টি তদন্ত করে তিনদিনের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলা হয়েছে। রিপোর্ট পাওয়ার পর এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

স্বাআলো/এসএ