তিনশ’ বছরের ঐতিহ্যবাহী চাঁচড়ার দশমহাবিদ্যা মন্দিরের জরাজীর্ণ অবস্থা

বিশ্বাস আমিন, যশোর : যশোরের চাঁচড়ার ঐতিহ্যবাহী দশমহাবিদ্যা মন্দির।  এক সময়ের জমকালো মন্দিরটি এখন জরাজীর্ণ অবস্থায় নিজের অস্তিত্ব ঘোষণা করছে। প্রতিষ্ঠানটির ঐতিহ্য রক্ষায় নজর নেই কারো।

যশোর খুলনার ইতিহাস-দ্বিতীয় খন্ড গ্রন্থ সূত্রে জানা গেছে, যশোরের ঐতিহাসিক দশমহাবিদ্যা মন্দির শহরের চাঁচড়া বাজার মোড়ে অবস্থিত। প্রায় ২৯০ বছর আগে ১৭২৯ সালে ৫২ শতক জমির ওপর দুর্গানন্দ ব্রহ্মচারী মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। চাঁচড়া গ্রামে রাঢ়ীয় ব্রাহ্মণ ভরদ্বাজগোত্রীয় দুর্গারাম মুখোপাধ্যায়ের নিবাস ছিল। ব্রহ্মচারী হলে তাঁর নাম হয় দুর্গানন্দ। তিনি শিশুকাল হতে ধর্মপরায়ন ছিলেন। প্রবীণ বয়সে ব্রহ্মচারীর বেশে ভারতবর্ষের বহু তীথস্থার্ন ভ্রমণ করেন। কিন্তু কোথাও দেবী ভগবতীর দশবিধ মহামুর্তির একত্র সমাবেশ দেখতে পাননি। তাঁর আকাক্সক্ষা জাগে তাঁর জীবনে এই সব মহাবিদ্যার মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে যাবেন। তাঁর সাধুসংকল্প সিদ্ধ হয়েছিল। স্বপ্নাদেশের বলে এই প্রস্তাব নিয়ে মুর্শিদাবাদের নবাব সুজাউদ্দিন এবং চাঁচড়ার রাজা শুকদেবের অনুগ্রহ লাভ করেন। একে শুকদেব ধর্মনিষ্ঠ সদাশয় হিন্দু নৃপতি, আর তাতে নবাবের ইঙ্গিত, সুতরাং তিনি প্রতিষ্ঠার যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হলেন। ব্রহ্মচারী উপযুক্ত সূত্রধর সংগ্রহ করে নিজ বাড়ির এক প্রকান্ড নিঃম্ব বৃক্ষের কাঠ থেকে বিগ্রহগুলো প্রস্তুত করেন। দশমহাবিদ্যার দশটি মাত্র বিগ্রহ নয়, মুর্তির সংখ্যা অনেক। উত্তরের পোতার প্রধান মন্দিরে পুর্বদিক থেকে আরম্ভ করে যথাক্রমে ১৬টি বিগ্রহ ছিল। গণেশ, সরস্বতী, কমলা, অন্নপূর্ণা, ভুবেনেশ^রী, জগদ্ধাত্রী, ষোড়শী, মহাদেব, কালী, তারা, ভৈরবী, ছিন্নমস্তা, ধুমাবতী, বগলা ও মাতঙ্গী এবং ভৈরব। পশ্চিমের মন্দিরে কৃষ্ণ, রাধিকা, রাম, সীতা, লক্ষণ, হনুমান এবং শীতলা বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। পূর্ব পোতায় ভোগগৃহ এবং দক্ষিণে নহবৎখানা নির্মিত হয়। নহবৎখানার নিচে দিয়ে মন্দিও প্রাঙ্গণে যাবার সদর দ্বার। বিগ্রহ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে সেবার ব্যবস্থাও করা হয়। শুকদেব ও শ্যামসুন্দর উভয়ে স্বীকৃত হন যে, প্রত্যেকের অধিকারভুক্ত জমিদারিতে প্রত্যেক প্রজার নিকট থেকে বার্ষিক এক সের চাল ও ৫ গন্ডা কড়ি হিসাবে আদায় করে দশমহাবিদ্যার সেবার জন্য দেয়া হতো। শ্যামসুন্দর ও তাঁর পুত্রের মৃত্যুর পর চার আনি অংশ মীর্জা সালাহ উদ্দীনের হাতে যায়। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রী মুন্নুজান খানম ওই সম্পত্তির উত্তরাধিকার হলে বাংলা ১১৭৭ সালে তিনিও ওই প্রস্তাবে সম্মত হন। চার আনা অংশের দেয়া বার্ষিক  বৃত্তি ৩৫১ টাকা স্থির হয়। বাংলা ১২৪২ সাল  অর্থাৎ ৬৫ বছর পর্যন্ত তা কার্যকর ছিল। পরে হুগলীর মোতউল্লার প্রস্তাবে বৃত্তি সরকারের রাজস্ব বিভাগ থেকে নামঞ্জুর হয়। রাজা শ্রীকন্ঠ রায়ের রাজত্ব কালে ১৭৮২ তিনি চাল পয়সার বৃত্তির বদলে ৬ হাজার বিঘা জমির দেবোত্তর লিখে দেন। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পর সে দেবোত্তর সম্পত্তি সরকার বাজেয়াপ্ত করেন। দুর্গানন্দের মৃত্যুর পর তার পুত্র যশোরমন্ত এবং পরে যশোমন্তের দুই ছেলে হরিশচন্দ্র ও কৈলাসচন্দ্র ক্রমান্বয়ে সেখানকার সেবায়েত হন। কৈলাসচন্দ্রের সময়ে দেবোত্তর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হলে তিনি সরকারের নিকট ওই বৃত্তিমহল খারিজা তালুক স্বরূপ বন্দোবস্ত করে নেন। কিছুদিন পর খাজনা বাকী পড়ায় তাও নিলাম হয়ে যায়। তখন অর্ধেক অংশ চাঁচড়ার রাজা এবং অর্ধেক অংশ নরেন্দ্রপুরের ব্রাহ্মণ জমিদার মহিমচন্দ্র মজুমদার কিনে নেন। তাঁরা সেবার জন্য মাসিক কিছু বৃত্তি দিতেন। মহিমচন্দ্রের মৃত্যুর পর বৃত্তি বন্ধ হয়ে যায়। কৈলাস ব্রহ্মচারী নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর একমাত্র ভাইয়ের ছেলে শশিভুষনের মৃত্যু হলে কৈলাসচন্দ্র শেষ বয়সে যাবতীয় সম্পত্তি শুকদেব চন্দনীমহল নিবাসী যজ্ঞেশ্বর ভট্টাচার্যকে লিখে দেন। যজ্ঞেশ্বর ভট্টাচার্য মারা গেলে তাঁর ভাইয়েরা ওই মন্দিরের সেবায়েৎ হন। দুর্গোৎসবের সময় দশমহাবিদ্যার বাড়িতে এবং চাঁচড়ার রাজবাড়িতে চন্ডীমন্ডপে প্রতিপদাদি কল্পারম্ভ করে সপ্তশতী চন্ডীও যেমন পঠিত হতো তেমনি কবি কঙ্কণকৃত চন্ডী পুঁথিও তেমনি পাঠ করা হতো। এই জন্য রাজা শ্রীকন্ঠ রায়ের সময়ে কবি কঙ্কণ চন্ডীর যে পুঁথি লেখা হয়েছিল, তা বহুদিন ওই মন্দিরে রক্ষিত ছিল। তার নাম শীতলা-মঙ্গল। অর্থাৎ ১৭৬৩ সালে এই পুস্তক রচিত হয়। এই পুস্তক এখন আর হয়তো পাওয়া যায় না। যজ্ঞেশ্বর ভট্টাচার্যের বংশধরদের মৃত্যুর পর মন্দিরটি সেইভাবে দেখভালের কেউ ছিল না। এলাকার ধর্মপ্রাণ সাধারণ হিন্দুদের সহযোগিতায় পরিচালিত হতে থাকে। বর্তমানে মন্দিরটির অবস্থা জরাজীর্ণ।

মন্দিরের পুরোহিত অপার গোবিন্দ দাস বলেন, যজ্ঞেশ্বর ভট্টাচার্যের বংশধরদের মৃত্যুর মন্দিরটি এলাকার ধর্মপ্রাণ হিন্দুদের সহযোগিতায় পরিচালিত হত। এখানে নিয়মিত পূজা-অর্চনা হয়ে আসছে। দূর্গা, কালি, রথযাত্রা, জন্মষ্টমী, দোল উৎসব, গৌরপূণিমা, বাঁধা অষ্টমীসহ সব ধর্মীয় উৎসব নিয়মিত হয়। প্রতি শুক্রবারে ধর্মীয় আলোচনা ও ভজন কীত্তন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে মন্দিরটি সংস্কার করা হয়নি। পুরাতন ভবনেই কার্যক্রম হয়। গত তিন বছর যাবত আন্তর্জাতিক কৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘ (ইস্কন) নামে একটি প্রতিষ্ঠান মন্দির পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছে। তারপর মন্দিরের কিছুটা উন্নতি হয়েছে। ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানটি রক্ষায় সরকারিভাবে কোন অনুদান দেয়া হয়নি।

স্বাআলো/এসএ