চা বিক্রেতা থেকে আ.লীগ নেতা শাহারুল এখন শত কোটি টাকার মালিক

কয়েক বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মালিক

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর : এক সময়ের ‘পাকা চোর’ শাহারুল ইসলাম গত কয়েক বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। দলীয় পদ, কতিপয় নেতার আশীর্বাদ আর অস্ত্রের জোর তার আঙুল ফুলে কলা গাছ হওয়ার পথকে সুগম করেছে। সরকারি ও অন্যের জমি দখলের পাশাপাশি সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বেশ আগেই তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগ নেতা দাদা রিপন হত্যা মামলায় চার্জশিট দেয়া হয়েছে। আর সম্প্রতি এক শিক্ষককে মারপিটের অভিযোগে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে পুলিশ।

শাহারুল ইসলাম যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য, সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও আরবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান শাহারুল এখন শত বিঘা জমির মালিক।

এদিকে, শাহারুলের দাপটে বেকায়দায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা এখন জোটবদ্ধ হচ্ছেন। যারা এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে শাহারুলর কর্মকান্ডের ফিরিস্তি তুলে ধরে অভিযোগ দাখিল করেছেন। অভিযোগের অনুলিপি সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান ও সাংগঠনকি সম্পাদক আবু সাঈদ আল মাহামুদ স্বপনের কাছেও দেয়া হয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, উপজেলার আরবপুর, চাঁচড়া, দেয়াড়া ও চুড়ামনকাটি ইউনিয়নে অন্যের জমি জোরপূর্বক দখল করে নামমাত্র টাকায় লিখে নেন শাহারুল। ক্যারফা (জমির মালিকানা নিয়ে দ্বন্ধ) জমি প্রথমে ক্যাডারদের দিয়ে দখল করেন। তারপর কাগজপত্রে মালিক হন। এসব জমি দখলের কাজটি করেন তার একান্ত সহযোগী কলোনীপাড়ার এক সময়ের বিএনপি নেতা বাবুল হোসেন।

আরো পড়ুন>>>চেয়ারম্যান শাহারুলের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস লালনের অভিযোগ

জমির মতো অন্যের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। শহরের ধর্মতলা এলাকায় একটি চায়ের দোকান, আরবপুরে কয়েকটি দোকান দখল করে নিয়েছেন। ধর্মতলার ইজিবাইক স্ট্যান্ড দখল করে প্রতিদিন অবৈধভাবে চাঁদা তুলছে তার সহযোগিরা। এছাড়া আরবপুরসহ আশপাশের কয়েকটি এলাকায় অর্ধশত মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাকারবারীদের কাছ থেকে মাসোহারা পান শাহারুল। সবমিলে প্রতিমাসে প্রায় ৭০ লাখ টাকা আয় তার।

স্থানীয়দের অভিযোগ, চেয়ারম্যান শাহারুলের বর্তমানে একটি ‘দুর্মুজ’ বাহিনী রয়েছে। চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং একাধিক মামলার আসামি লালু, রিপন, শরীফ, আলম, জাকারিয়া, বিল্লাল, রুবেল, সোহেল এনামুল তার দখলদারিত্ব, চাঁদাবাজীর কাজটি করে।

আব্দুল আলীম নামে আওয়ামী লীগের এক নেতা জানান, আরববপুর ইউনিয়নসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা শাহারুল ইসলামের কার্যক্রমে ক্ষুদ্ধ। তার প্রশ্ন, একজন বিতর্কিত ব্যক্তিকে জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা কি ভাবে প্রশ্রয় দিচ্ছেন? এতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। আর এজন্য দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। এতে ভবিষ্যতে দল ক্ষতিগ্রস্থ হবে এমন আশংকা রয়েছে সবার মধ্যে। কিন্তু কোন টুশব্দ করতে পারছেন না কেউ।

স্থানীয়রা জানান, চুরির অভিযোগ এক সময় শাহারুলকে গ্রাম ছাড়া করা হয়। তখন তিনি যশোর জজ কোর্ট মোড়ে চায়ের দোকান দেন। পরে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপের হয়ে কাজ করেছেন। এক পর্যায়ে যোগ দেন আওয়ামী লীগে রাজনীতিতে।

আরো পড়ুন>>>শিক্ষক মারপিটের ঘটনায় ইউপি চেয়ারম্যান শাহারুলের বিরুদ্ধে চার্জশীট

আরবরপুর ইউপি মেম্বার তরিকুল ইসলাম জানান, নব্বই দশকে শাহারুল ইসলাম বিদ্যুতের তার, ট্রান্সফর্মার ও তেল চুরি করতেন। এসব চুরি করতে করতে এক পর্যায়ে ছিনতাই এবং মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৯৮ সালে বিদ্যুতের তার চুরির অভিযোগে পুলিশ তাকে আটকও করে। পরবর্তীতে যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহিত কুমার নাথের সাথে তার সম্পর্ক হয়। এসময় তার সহযোগি হয়ে কাজ শুরু করেন। এক পর্যায়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি মরহুম আলী রেজা রাজুর দেহরক্ষী হিসেবে অলিখিতভাবে নিয়োগ পান শাহারুল। গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। মাদক, অস্ত্রের মতো অবৈধ ব্যবসার সাথে জড়িয়ে পড়েন। এরই মধ্যে যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য পদ পেয়ে যান। আর সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানা সূত্রে জানা যায়, শাহারুলের বিরুদ্ধে ২০০৪ সালে অস্ত্র মামলা, ২০০৯ সালে ১৩ ইউপি চেয়ারম্যান হত্যাচেষ্টা, ২০১০ সালে এক প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলা, একই বছর ১৫ মার্চ দাদা রিপন হত্যা মামলা, ২০১৮ সালে বালিয়াভেকুটিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষককে হত্যাচেষ্টা অভিযোগে মামলা হয়। এর মধ্যে যশোর সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক আহবায়ক দাদা রিপন হত্যা ও শিক্ষককে হত্যাচেষ্টার মামলায় শাহারুলকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি প্রেসক্লাব যশোরে সংবাদ সম্মেলন করে ইউপি সদস্য তরিকুল ইসলাম দাবি করেন, চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে অনিয়ম শুরু করেন শাহারুল। কোন ইউপি সদস্য তার বিপক্ষে কথা বলতে পারেন না। রাজস্ব বা উন্নয়ন খাত সব টাকাই তিনি নিজের মতো করে খরচ করেন। অধিকাংশ কাজেই হয় অনিয়ম। প্রতিবাদ করায় তরিকুলকে পরিষদেই ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এখন তরিকুলের স্বাক্ষর জাল করে তার সম্মানীর ভাতাও তুলে নিচ্ছেন চেয়ারম্যান। বিধাব ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও রয়েছে অবাক হওয়ার মতো সব ঘটনা।

যশোর সদর উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম-আহবায়ক আরবপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা শহিদুজ্জামান শহিদ স্বাক্ষরিত প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ওই অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, মাত্র কয়েক বছরে ২০০ কোটি টাকার মালিক হয়েছেন শাহারুল ইসলাম। তার নিজের নামে তিনটি পাজারু গাড়ি, দুইটি প্রাইভেটকার, দুইটি মোটরসাইকেল আছে। যশোর ও ঢাকায় মিলে শত বিঘা জমি কিনেছেন। যার মূল্য ৫০ কোটি টাকা। এছাড়া নামে বেনামে কিনেছেন আরো ১৫০ কোটি টাকার সম্পত্তি।

ছাত্রলীগ নেতা দাদা রিপন হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি শাহারুলকে আগামীতে আওয়ামী লীগের কোন সাংগঠনিক পদে দায়িত্ব না দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করা হয়েছে ওই অভিযোগপত্রে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে শাহারুল ইসলাম বলেন, আমার নিজস্ব কোন সম্পত্তি নেই। যা আছে সবই পৈত্রিক সম্পত্তি। দাদা রিপন হত্যা মামলায় রাজনৈতিক কারণে আমাকে হুকুমের আসামি করে চার্জশিট দেয়া হয়েছে।

একাধিক গাড়ি সম্পর্কে তিনি বলেন, আমার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স আছে। যা দিয়ে আমি পুরানো গাড়ি কেনাবেচা করি। এছাড়া বর্তমানে আরো কিছু ব্যবসা আছে আমার। আমার নামে যে সব সম্পত্তি আছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তা ঠিক নয়। ওইসব সম্পত্তি আমাকে বুঝে দিলে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবো।

স্বাআলো/আরবিএ