ঘুষের হাট বসেছে যশোর বিআরটিএ অফিসে

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর: সড়ক আইন কার্যকরের ঘোষণায় যশোর বিআরটিএ অফিসে দালাল চক্রের তৎপরতা বেড়েছে। ড্রাইভিং ও গাড়ির লাইসেন্স করার ভীড় বাড়ার সুযোগ নিয়ে এই চক্রটি অফিসে যেন ঘুষের হাট বসিয়েছে। তারা নানা কৌশলে প্রতি ফাইলে  দুই থেকে তিন হাজার টাকা বেশি হাতিয়ে নিচ্ছে।

যশোর জেলা তথ্য বাতায়নে বিআরটিএ অফিসের কর্মরত অফিসার ও কর্মচারীর নামের তালিকায় রয়েছেন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি:) কাজী মো. মোরছালীন, মোটরযান পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর, সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা মো. আব্দুস সোবহান গাজী, উচ্চমান সহকারী কম্পিউটার অপারেটর মো. নজরুল ইসলাম, সহকারী মোটরযান পরিদর্শক মো. আব্দুল মতিন, অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক ফাহাদ আহমেদ, রেকর্ড কিপার মো. হারুন অর রশিদ ও অফিস সহায়ক মুন্সি আব্দুল আলীম। এই ৮ জনের নাম থাকলেও কাজ করেন কমপক্ষে ১৫জন। বাকিদের নিয়োগ আছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

আরো পড়ুন>>> যশোর জেনারেল হাসপাতালে ৩০ দালালের দৌরাত্ম্য

আব্দুল আলীম নামে এক ভুক্তভোগী জানান, অফিসের সহায়ক মুন্সি আব্দুল আলীমের কাজ করে দেন দুই দালাল। বিনা নিয়োগ  কাজ করার ব্যাপারে তারা দুইজনেই জানান, মুন্সি সাহেব একা কাজ করে পারেন না, তাই তাকে সহযোগিতা করেন।

বিআরটিএ অফিসে সিসি ক্যামেরা আছে। অফিসে কারা আসছে এবং যাচ্ছে তারও রেকর্ড রয়েছে। ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন যারা ওই অফিসে যাতায়াত করেন এবং কাগজপত্রে হাত দেন তারা কারা সেটা বের করা খুব একটা কঠিন না। বিআরটিএ সহকারী পরিচালক পরিকল্পিত ভাবে এসব দালালদের অলিখিত ভাবে নিয়োগ দিয়ে রেখেছেন।

সরকার সড়ক আইন কার্যকরের ঘোষণা দিলে যশোর ও নড়াইলের গাড়ির চালকরা লাইসেন্স পাওয়ার জন্য প্রতিদিন হাজির হচ্ছে বিআরটিএ অফিসে। সেখানে কাগজপত্র জমা দিতে গেলে অফিসের কেউ বিন্দুমাত্র সহযোগিতা করছেন না।

লোহাগড়ার কামাল হোসেন বলেন, মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স করার জন্য ফরম পূরণ করে কোথাও ভুল আছে কি না তা জানার জন্য অফিসে হেল্প ডেস্কে  গিয়েছিলাম। কিন্তু দায়িত্বরত ব্যক্তি  সহযোগিতা না করে খারাপ ব্যবহার করে বলেছেন, বাইরে অনেক লোক আছে তাদেরকে দেখান। এর পরপরই এক দালাল এসে আমার কাছ থেকে কাগজপত্র নিয়ে নিচের তলায় যেতে বললেন। সেখানে যাওয়ার পর তিনি আরো দুটি কাগজ নিয়ে আসতে বললেন। এরপর ১০ হাজার ৩০০ টাকা দাবি করে বললেন, কোথাও যেতে হবে না। সবই আমি করে দেবো। পরীক্ষায় উপস্থিত হলে চলবে। পাস করার প্রয়োজন নেই। তার কথামত সব টাকা দেয়ার একদিন পর লার্নারের কাগজ দিয়েছে। এ জন্য খরচ লাগার কথা ২ হাজার ৭০০ টাকা। কিন্তু নিয়েছে ১০ হাজার ৩০০ টাকা নিয়েছে।

আরো পড়ুন>>> ৩৩৩ এ ফোন :  যশোরে ২৬০টি বাল্য বিবাহ প্রতিরোধ

বিআরটিএ অফিসে প্রায় কাজ করেন মকবুল হোসেন। তিনি নিজেও মাঝে মধ্যে দুই একটি ফাইল জমা দেন। সহকারী পরিচালকের সাথে মোটামুটি সম্পর্ক ভালো দাবি করে তিনি মাঝে মধ্যে ফাইল জমা দেন। ফাইল প্রতি ৩ হাজার টাকা করে থাকে তার।

মকবুল হোসেন জানান, বিআরটিএ  অফিসে কমপক্ষে ৩০জন দালাল আছে। যশোরের বাগআঁচড়া, বাঘারপাড়া, নড়াইলের কালিয়া এবং লোহাগড়ায় রয়েছে দালালদের অফিস। উল্লেখ করা হয়েছে, মোটরসাইকেলের ডিলার অফিসে নিয়োগকৃত কর্মরতরা এসব অফিস করেছেন। যারা বিআরটিএ অফিসের দালাল হিসেবে চিহ্নিত।

বাগআঁচড়ায় সুমন জানান, তাদের বাগআঁচড়ায় আঞ্চলিক বিআরটিএ অফিস আছে। সেখানে ফরম ও টাকা দিলে পরীক্ষার দিন শুধুমাত্র হাজিরা দিলে পাস করা যায় বলে তিনি দাবি করেন।

নতুন আইন পাস হওয়ার পর গত বুধবার বিআরটিএ অফিসে হিরা নামে একজন ৫০টি ফাইল জমা দিয়েছেন। তিনি সাড়ে ৮ হাজার থেকে ১১ হাজার টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য।

আরো পড়ুন>>> যশোরে বন্ধুর নানা বাড়ি পুতে রাখা কলেজ ছাত্রের লাশ উদ্ধার

গাড়ির লাইসেন্স করতে সরকারি খরচ ১০০ সিসি’র মধ্যে ১৯ হাজার ৬৬৩ টাকা ও ১০০ থেকে ১৬০ সিসি পর্যন্ত ২১ হাজার ২৭৩ টাকা। ড্রাইভিং লাইসেন্স অপেশাদার ২হাজার ৫৪২ টাকা (১০ বছর মেয়াদী)। নামপত্তন ১০০ সিসি এনালক ৫ হাজার ৩১১ টাকা। ডিজিটাল ৩ হাজার ৮১ টাকা। ১০০ সিসির ওপরে এনালক ৫হাজার ৪৮ টাকা এবং ডিজিটাল ৩হাজার ৫৮৮ টাকা।

গোলাম আলী হায়দার নামে এক ভুক্তভোগী জানান, ড্রাইভিংয়ের জন্য প্রায় ১১ হাজার টাকা এবং গাড়ির জন্য সরকারির ফি চেয়ে ৩ হাজার টাকা বেশি নিচ্ছে দালালরা।  আর না দিলে মাসের পর মাস ঘুরতে হবে। সরাসরি ফাইল জমা দিতে গেলে ফাইল প্রতি মুন্সি আব্দুল আলীমকে দিতে হয় ২০০ টাকা। ক্ষেত্র বিশেষ ১০০ টাকা দিলেও হয়। আর টাকা না দিলে লার্নারের পরীক্ষার তারিখ পড়বে কমপক্ষে ৫ মাস পর। এছাড়া ফাইল প্রতি টাকা না দিলে ফিংগারিং, পরীক্ষার তারিখ পড়ে ৫ মাস থেকে ৬ মাস পর। আর টাকা দিলে এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে লার্নারসহ পরীক্ষা এবং ফিংগারিং করে মূল লাইসেন্স পাওয়া যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে অনেকের।

বিআরটিএ অফিসে যাতায়াতকারী আবিদুর রহমান জানান, পাবলিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে বিআরটিএ  অফিসের কর্মকর্তাদের টাকা দিতে হয়। ফাইল জমা দেয়া, পরীক্ষার তারিখ বসানো, ফিংগারিং, পরীক্ষা এবং সর্বশেষ সরকারি পরিচালকের অনুমোদনের জন্য টাকা দিতে হয়। টাকা না দিলে এসব ক্ষেত্র থেকে ফাইল নড়ে না। পড়ে থাকে মাসের পর মাস।

যশোর বিআরটিএ সহকারী পরিচালক কাজী মোরছালীন জানান, জেলা তথ্য বাতায়নে আপডেট তথ্য নেই । স্থানীয় ভাবে নিয়োগ দেয়াসহ ১১জন কাজ করেন। বিআরটিএ অফিসে কোন দালাল নেই । যদি কারো অভিযোগ থাকে তাহলে তথ্যপ্রমাণ নিয়ে আসতে হবে । অফিসে বিআরটিএ’র লোকজন ছাড়া অন্য কারো কাজ করার সুযোগ নেই।

বিআরটিএ অফিসে যদি দালালদের অপতৎপরতা থাকে তাহলে তাদেরকে নির্মুল করার জন্য যশোর জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে যশোরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রফিকুল হাসান জানিয়েছেন।

স্বাআলো/এসএ