মহান বিজয় দিবস

আজ মহান বিজয় দিবসের ৪৮তম বার্ষিকী। ৩০ লাখ গণমানুষের আত্মত্যাগ এবং দু’লাখ ৩৬ হাজার মা-বোনের নারীত্বের লাঞ্ছনার বিনিময়ে এই বিজয় অর্জিত হয়। জান মাল আর ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনের দেশ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। আমরা আমাদের মুখের ভাষাও প্রতিষ্ঠা করেছি রক্তের বিনিময়ে। এ দিক থেকে বাঙালি জাতি এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের গর্বে গর্বিত। প্রতি বছর আমরা এ দিনটি পালন করি উৎসবমুখর পরিবেশে।

বিজয় দিবসে আমাদের আনন্দের সাথে এক ধরনের বেদনাও মিশে থাকে। সে বেদনা মুক্তিযুদ্ধে আনেকের প্রিয়জন হারানোর বেদনা। এর সাথে মিশে থাকে এক ধরনের আহত গর্ব। তাই বিজয় দিবসের এই শুভক্ষণে আমাদের প্রত্যেককে এমন শপথ নিতে হবে যে, আমদের কোন কাজে বা আচরণে শহীদদের বিদেহী আত্মা এবং আমাদের লাঞ্ছিত মা-বোনেরা যেন কষ্ট না পায়।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের মূল লক্ষ্য ছিল অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন এবং  অর্থনৈতিক মুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা, গণতন্ত্র, জাতীয় অধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা। আমাদের অবস্থান ধর্মনিরপেক্ষতা, মুক্তবুদ্ধি, মানবতা, জাতীয় সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার পক্ষে। এ অবস্থান গ্রহণের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক নিবিড় ও অবিচ্ছেদ্য। সমাজের বিচ্ছিন্ন মত ও পথের ভিন্নতা বৈচিত্র্যকে যথাযথ মূল্যায়নের উপায় হলো গণতন্ত্রের চর্চা ও অনুশীলন।

রাজনৈতিক মত ও পথের ভিন্নতা সত্ত্বেও মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনার ভিত্তিতে বৈচিত্র্যের মধ্যেও স্বাতন্ত্র বজায় রেখে জাতির সামগ্রিক স্বার্থ , জাতীয় মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। গণতন্ত্র তার অপরিহার্য শর্ত। জাতীয় সংহতি বজায় রাখার স্বার্থে ও লক্ষ্যে গণতন্ত্রকে অবলম্বন করে মতাদর্শগত পার্থক্য সত্ত্বেও সহনশীলতার মাধ্যমে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ অর্জন সম্ভব। কিন্তু স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা ও একের পর এক সামরিক শাসন মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক সংবিধানকে ধ্বংস ও বিকৃত করতে থাকে।  গণতান্ত্রিক সহনশীলতার সংস্কৃতির পরিবর্তে এক পর্যায়ে  শাসকগোষ্ঠী ও রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকেই একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে  গ্রহণ করে নিজেদের মধ্যে বিরোধের জন্ম দেয়। অশুভ শক্তি এ হানাহানির ফাঁকে আমাদের চেতনার বিকাশ অসাড় করে দেয়। চক্রান্ত শুরু করে।

স্বাধীনতার অর্থ ছিল মানুষের আত্মার মুক্তির সাথে সাথে আর্থিক মুক্তি। অর্থাৎ আর্থিক উন্নতির পথ সুগম করা। একই সাথে শিক্ষা সংস্কৃতি ও স্বাস্থ্যের উন্নতিও যদি যথাযথভাবে কার্যকর না করতে পারি তাহলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথাটা শিশুপাঠ্য কাহিনীতেই থাকবে। মহান বিজয় দিবসের উৎসব-আনন্দের সময় আমরা প্রতিবছর অহংকার করে বলেছি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আমরা সমুন্নত রাখবো। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে আমরা তা কতটুকু করছি। আমার যে যেখানে যে অবস্থানে আছি সেখানে নিজের সততা, কর্মনিষ্ঠা ও দেশপ্রেমের মাধ্যমে তা সহজেই করতে পারি। মুখে মুক্তিযুদ্ধেও চেতনার বুলি আউড়িয়ে কোন ফায়দা হবে না। কখনো তা হয়নি।

এবারের মহান বিজয় দিবসে জাতির অতীত ইতিহাস, গৌরবগাঁথা এবং সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা করে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে মূল্যবোধগুলো আমরা অর্জন করেছি, সম্মিলিতভাবে তা আমাদের জাতীয় উত্তরাধিকার। এটি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে। তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে এ বিজয় দিবসে আমরা সংকল্প গ্রহণ করবো যেন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার মধ্য দিয়েই আমরা ব্যাধিগ্রস্ত সামাজিক অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘঁটাতে পারি। দেশকে উন্নতির পথে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় নীতির ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। সেটাই হবে প্রকৃত বিজয়।

স্বাআলো/আরবিএ