‘মিথ্যা দিয়ে সত্যকে মুছে ফেলা যায় না’

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আইন করে বঙ্গবন্ধুর প্রতি মন থেকে সম্মান দেখানো যাবে না। মুজিববর্ষ কে (বিএনপি) মানলো, কে মানলো না- সেজন্য জাতি বসে নেই, বসে থাকেনি। তারা যদি কাউকে সম্মান না দেখাতে চায়, তাহলে সেটা আইন দিয়েই তো তাদের মনের ইচ্ছাটা পূরণ করা যাবে না।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ এর পর থেকে ২১ বছর জাতির পিতার নাম নিশানা ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। ৭ মার্চের ভাষণে জয় বাংলা স্লোগান এবং শেখ মুজিবের নাম সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল বাংলার মাটিতে। সত্যকে কখনো মিথ্যা দিয়ে বা বাধা দিয়ে চেপে রাখা যায় না, মুছে ফেলা যায় না সেটা আজ প্রমাণিত সত্য। প্রমাণিত সত্য বলেই ৭ মার্চের ভাষণ আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য প্রামাণ্য দলিলে স্থান পেয়েছে। বিশ্ব স্বীকার করে নিয়েছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ হচ্ছে আড়াই হাজার বছরের যত নেতৃত্বের ভাষণ তার দেশকে তার দেশের মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে দেশের মাঝে তার মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ।

একাদশ জাতীয় সংসদের ৬ষ্ঠ অধিবেশনে বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে তরিকত ফেডারেশনের চেয়ারম্যান নজিবুল বশর মাইজ ভান্ডরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা একথা বলেন।

সংসদ নেতা বলেন, আইন করে কারো কাছ থেকে সম্মান আদায় করা যায় না। কাজেই কে মানলো, কে মানলো না তার জন্য বাঙালি জাতি বসে থাকেনি, থাকবে না। জাতির পিতা ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন ৭ কোটি বাঙালিকে কেউ দাবায়ে রাখতে পারবা না। এখন ৭ কোটি থেকে ১৬ কোটি হয়েছে কিন্তু তাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারেনি, দাবায়ে রাখতে পারবেও না। বাঙালি এগিয়ে যাচ্ছে এগিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, যেখানে আলো সেখানেই অন্ধকার। একটা সময় ছিল ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু সেই অন্ধকার ভেদ করে এখন বাংলাদেশ আলোর পথে যাত্রা শুরু করেছে। জাতির পিতার যে আদর্শ আমরা ধারণ করেছি, যে আদর্শ যে চেতনা নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন সেই চেতনা বা আদর্শ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমরা অনেক দূর অগ্রসর হয়েছি। আজকে বাংলাদেশের উন্নয়নের রোল মডেলে স্বীকৃতি পেয়েছে।

বিএনপি-জামায়াত জোটের কঠোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, যারা সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যকাণ্ডের জড়িত খুনিদের বিচারের হাত থেকে মুক্ত করে পুরস্কৃত করেছে, যারা স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী, যাদের বিচার শুরু হয়েছিল- তাদের বিচারের পথ বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছিল- তাদের (বিএনপি) কাছ থেকে ভাল কিছু আশা করা যায় না। তাদের সময়ে মুক্তিযুদ্ধে, মুক্তির সংগ্রামে, বিজয়ের ইতিহাসে জাতির পিতার যে অবদান তা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। আজকে সে ইতিহাস উদ্ভাসিত হয়েছে। আজকে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী ইউনেস্কোর মাধ্যমে বিশ্বের সকল দেশ, জাতিসংঘভুক্ত সকল দেশে উদযাপন করছে। এর থেকে বড় সত্য কি আছে?

তিনি বলেন, কী পেলাম আর কী পেলাম না, সেই হিসাব মেলাই না: বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ফখরুল ইমামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা সবাই এমপি, কেউ উঁচু বা নিচুতে নেই। আর আমি কখনো নিজেকে উঁচুতে রয়েছে তা কখনো ভাবি না। আর কী পেলাম আর কী পেলাম না, সেই হিসাব আমি কখনো মেলাই না। বরং দেশের মানুষকে, দেশকে কতটুকু দিতে পারলাম, যে মানুষগুলোর জন্য আমরা পিতা (বঙ্গবন্ধু) জীবন দিয়ে গেলেন, সেই মানুষের জন্য কতটুকু করতে পারলাম- সেটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় কথা। আর আমার কাছে কখনোই আমিত্ব বলে কোন কিছু নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের যে সকল দেশে দূতাবাস আছে, প্রত্যেক দেশের দূতাবাসের মাধ্যমে জন্মশতবার্ষিকী অথবা মুজিববর্ষ পালন করা হবে। আমাদের দূতাবাসগুলো উদ্যোগ নিচ্ছে। মুজিববর্ষে অনেক দেশের সরকার প্রধান-রাষ্ট্র প্রধান আসবেন। আমরা ভাগে ভাগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দাওয়াত দেব। সংসদের বিশেষ অধিবেশনেও অনেককে দাওয়াত দেব, তারা সেখানে এসে বক্তব্য দিয়ে যাবেন।

এরপর রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর সমাধিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন, বিশেষ প্রার্থনা, জেলা-উপজেলায় বিভিন্ন দফতর, সংস্থা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে জন্মশতবার্ষিকীর উদ্বোধন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। দেশব্যাপী স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সমূহের উদ্যোগে তৃণমূলের জনগণকে সম্পৃক্ত করে মুজিববর্ষ উদযাপন, বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে অন্তর্ভুক্ত করা, ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি, স্কেচ ও আলোকচিত্র নিয়ে বই ‘শেখ মুজিব; লাইফ অ্যান্ড টাইমস’ প্রকাশ করা হবে। এছাড়া বিদেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত ভাষণ ইংরেজি ছাড়াও হিন্দি, উর্দু, ফরাসি, জার্মান, চাইনিজ, আরবি, ফারসি, স্প্যানিশ, ইতালিয়ান, কোরিয়ান ও জাপানি-এই ১২টি ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করা হবে।

তিনি বলেন, আগামী অমর একুশে বইমেলা বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হবে। ঢাকা লিট ফেস্ট কর্তৃক ঢাকা লিটারারি ফেস্টিভ্যাল বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করা হবে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলা একাডেমি কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্মভিত্তিক ১০০টি গ্রন্থ প্রকাশ করা হবে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট, নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতর, জেনেভা জাতিসংঘ দফতরের পাশাপাশি বিভিন্ন আঞ্চলিক সংস্থা ও ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদর দফতরে জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপিত হবে।

ব্রিটিশ মিউজিয়ামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও আদর্শভিত্তিক চিত্রকর্ম, আলোকচিত্র প্রদর্শন, উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার, বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন ও লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড এবং মুসলিম উম্মাহর ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা ও সকল ধর্মের অধিকার সুরক্ষায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান শীর্ষক আন্তর্জাতিক সেমিনার আয়োজন করা হবে।

শেখ হাসিনা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ও খণ্ডচিত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হবে। জাতীয় সংসদ সচিবালয় ২০২০ সালের মার্চ মাসে জাতীয় সংসদের বিশেষ অধিবেশন আয়োজন করবে। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট জন্মশতবার্ষিকীর বিশেষ অনুষ্ঠান আয়োজন করবে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ‘জুলি ও কুরি’ পদক প্রাপ্তি দিবস উদযাপন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্মদিন পালন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ কর্তৃক বঙ্গবন্ধুর নামে একটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার প্রবর্তন, বাংলা ও ইংরেজিতে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর গ্রন্থ প্রকাশ করা হবে। স্বশস্ত্র বাহিনী কর্তৃক বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল আন্তর্জাতিক সেমিনারের আয়োজনের পাশাপাশি সেনাবাহিনী, নৌ-বাহিনী ও বিমানবাহিনী, বিজিবি, আনসার-ভিডিপি, পুলিশ ও র‌্যাবের নিজস্ব কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।

স্বাআলো/আরবিএ