স্বামীর অনুরোধে ফের বিয়ে, সেই স্বামীর হাতের লাশ হলেন লাকি

বীরগঞ্জ (দিনাজপুর) প্রতিনিধি: দিনাজপুরের বীরগঞ্জে লাকি আক্তার (২৪) হত্যাকাণ্ড নিয়ে চরম ধোয়াশা তৈরি হয়েছে। স্বামীর পরিবার থেকে বিষ খেয়ে আত্নহত্যা আর বাবার পরিবার নির্যাতনের পর বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছে দাবি করলেও ময়না তদন্তকারী চিকিৎসক বলছেন বিষের কোন আলামত পাওয়া যায়নি। যদিও এরই মধ্যে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত নিয়ে বেশি এগোতে পারেনি পুলিশ।

অপরদিকে ঘটনার দিন থেকে স্বামী, শ্বশুর, শ্বাশুড়ী ও ননদ পলাতক রয়েছেন। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না নিহত লাকি আক্তারের তিন বছরের শিশু কন্যা ফারিয়া আক্তারের।

জানা যায়, বীরগঞ্জ উপজেলার মাহানপুর গ্রামের ওমর ফারুকের সঙ্গে একই উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের আব্দুল আজিজের মেয়ে লাকি আক্তারের পারিবারিকভাবে বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের সময় ছেলেকে যৌতুক বাবদ দুই লাখ ২০ হাজার টাকা মেয়ের বাবা প্রদান করেন। কিন্তু ওমর ফারুক তাতে সন্তষ্ট হতে পারেনি। প্রায় সময় যৌতুকের জন্য লাকি আক্তারকে নির্যাতন করতেন। এরই মধ্যে তাদের একটি প্রতিবন্ধি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। এতে করে বেড়ে যায় নির্যাতনের মাত্রা। বাবা মায়ের দেয়া দুই ভোরী স্বর্ণালংকার বিক্রি করে দেন স্বামী অমর ফারুক। সেই টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর যৌতুকের জন্য লাকি আক্তারকে ফের নির্যাতন শুরু করেন স্বামী অমর ফারুক, শশুড় মাজেদুর রহমান, শ্বাশুড়ী ফরিদা বেগম ও ননদ মৌসুমি বেগম।

এক পর্যায নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে লাকি আক্তার তার সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি চলে আসেন। পরে এ নিয়ে ইউনিয়ন পরিষদে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত হয়। তখন শিশু ফারিয়া আক্তারকে তার বাবা ওমর ফারুক নিয়ে যান। তবে ওমর ফারুকের অনুরোধে পুনরায় বিয়ে করে লাকি আক্তার স্বামীর সংসারে ফিরে যান। এরপর বিচ্ছেদের সময় দেয়া টাকা বাবার বাড়ি থেকে নিয়ে আসার জন্য আবারো শুরু হয় নির্যাতন। বাধ্য হয়ে লাকি আক্তারের বাবা মার কাছ থেকে দুই দফায় ৮০ হাজার টাকা এনে ওমর ফারুকের হাতে তুলে দেন। তখন ওমর ফারুক ও তার পরিবারের সদস্যরা আরো পাঁচ লাখ টাকার জন্য নির্যাতন শুরু করেন। প্রায় সময় খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দিয়ে বাঁশের সঙ্গে হাত পা বেঁধে নির্যাতন করা হতো।

আরো পড়ুন>>>দিনাজপুরে বন্দুকযুদ্ধে দুই যুবক নিহত

ঘটনার দিন ১২ জানুয়ারি তাকে হাত পা বেঁধে নির্যাতন করা হয়। এক পর্যায় লাকি আক্তার প্রসাব পায়খানা করার কথা বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে তার বাবাকে ফোনে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে আসতে বলেন। না হলে তার স্বামী, শ্বশুর শাশুড়ী ও ননদ তাকে মেরে ফেলবে বলে জানান। সেখান থেকে তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। পরে প্রচার চালায় লাকি আক্তার বিষ পান করেছেন। তবে কোন হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়নি।

তবে তার স্বামীর পরিবারের দাবি, প্রথমে লাকি আক্তারকে বীরগঞ্জ হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অবস্থার অবনতি হলে তাকে দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তিনি মারা যান। কিন্তু দুই হাসাপাতালের রেকর্ডে লাকি আক্তারকে ভর্তি কিংবা চিকিৎসার রেকর্ড পাওয়া যায়নি। পুলিশ লাশ বাাড় থেকে উদ্ধার করে।

এব্যাপারে জানতে মাহানপুর গ্রামে স্বামী ওমর ফারুকের বাড়িতে গেলে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। ওমর ফারুকের দাদি সখিনা খাতুন (৬৫) জানান, লাকি আক্তার বিষ পান করে আত্নহত্যা করেছেন। ঘটনার পর থেকে তারা পলাতক রয়েছেন।

মোহাম্মদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গোপাল দেব শর্মা জানান, লাকি আক্তার বিষ পান করে আত্নহত্যা করেছেন।

তবে কয়েকজন প্রতিবেশি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, লাকি আক্তারকে নির্যাতন করে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। চেয়ারম্যানের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না।

মেয়ের বাবা আব্দুল আজিজ জানান, আমার মেয়েকে পাঁচ লাখ টাকার জন্য নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে।

এদিকে ময়না তদন্তকারী দিনাজপুরের এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজের ফরেন্সিক বিভাগের প্রভাষক ডা. হাবিবুর রহমান জানান, তিনি বিষের কোন আলামত পাননি। অন্য কোন উপায়ে হত্যা করা হতে পারে। তিনি আরো জানান, নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা মহাখালিতে ভিসেরা রিপোর্টের জন্য পাঠানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে বীরগঞ্জ থানার ওসি সাকিলা পারভিন বলেন, আমরা হত্যা মামলা গ্রহণ করেছি। আসামিরা ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছে। কিভাবে হত্যা করা হয়েছে তা জানতে তদন্ত চলছে।

স্বাআলো/ডিএম