টোকাই থেকে কোটিপতি বনে যাওয়া শাহিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর: যশোরের বহুল আলোচিত-সমালোচিত চোর সিন্ডিকেটের হুতা শাহিন কবিরকে যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠনের নাম ও পদ ব্যবহার করে নানাবিধ অপকর্মের সঙ্গে লিপ্ত থাকার অভিযোগে তাকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সংগঠনের যুগ্ম সম্পাদকসহ যশোর-খুলনা সড়কের সড়ক সম্পাদক পদ ও সাধারণ সদস্যপদ থেকে চুড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সাথে যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অসীম কুণ্ডু তার বিরুদ্ধে যশোর কোতয়ালি থানায় একটি জিডি করেছেন।

তার বহিষ্কারের পর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে শাহিন কবিরের নানা অপকর্ম। শুধু যশোর মিনিবাস মালিক সমিতি নয়, বাংলাদেশ অটোমোবাইল মালিক সমিতি যশোর জেলা শাখা জিম্মি করে নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছে শাহিন কবির। শুধু তাই নয়, শাহিন কবিরের অতীত ইতিহাস বের হতে শুরু করেছে।

আরো পড়ুন>>>  ধর্ষণের পর পানিতে ধুয়ে ড্রামে ভরে রাখে তারা

যশোর মিনিবাস ও বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অসীম কুন্ডু সাক্ষরিত একটি চিঠিতে বলা হয়েছে, সমিতির যুগ্ম-সম্পাদক, যশোর-খুলনা সড়কের সড়ক সম্পাদক এবং সাধারণ সদস্য শাহিন কবির অত্র সমিতির নাম ব্যবহার করে সংবিধান বর্হিভূতভাবে যশোরের মুড়লী মোড়ে নিজ নামে কাউন্টার বানিয়ে বিভিন্ন গাড়ি থেকে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করে সমিতির সুনাম ক্ষুন্ন করায় এবং সমিতির সভাপতির সাথে অসাদাচরণ ও সন্মানহানী করার কারণে গত ২৪ অক্টোবর (যমিনি/বামাস/৪২/২০১৯) নং পত্র দ্বারা তাকে সমিতির সদস্যপদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে একটি নোটিশ প্রদান করা হয় এবং কেন তার সদস্যপদ চুড়ান্তভাবে বাতিল করা হবে না তার একটি লিখিত জবাব ৩১ অক্টোবরের মধ্যে চাওয়া হয় সমিতির পক্ষ থেকে। লিখিত জবাবে শাহিন কবির তার বিরুদ্ধে আনীত সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। এরপর সমিতির সংবিধান এর ৪৪ ধারা মোতাবেক ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম রিয়াদকে। আরিফুল ইসলাম রিয়াদের তদন্ত কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে শাহিন কবিরের বিরুদ্ধে আনিত সকল অভিযোগ প্রমাণ পায়। এরপর গঠনতন্ত্রের ৭ এর খ এবং ৪৪ ধারা মোতাবেক সমিতির সকল পদ থেকে চুড়ান্তভাবে বহিষ্কার করা হয়।

এদিকে, শাহিনের বহিষ্কারের খবরে শহরের মণিহার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় মিষ্টি বিতরণ হয়েছে। টোকাই থেকে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়ার ইতিহাস বের হতে শুরু হয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে শাহিন কবির বলেন, আমাকে জোর পূর্বক বহিষ্কার করা হয়েছে। যে অভিযোগে আমাকে বহিষ্কার করা হয়েছে তার কোন ভিত্তি নেই।

কে এই শাহিন কবির

আশির দশকে দেশে যখন দুর্ভিক্ষ তখন তার বাবা কুটি মিয়ার সাথে ফরিদপুর থেকে যশোর শহরে আশ্রয় নেয়। প্রথমে মণিহার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় টোকাই গিরি করতে শুরু করে। তার এই টোকাই গিরিতে সংসার না চলায় তার বাবা গ্যারেজে দেয় কাজ শেখার জন্য। শাহিন কবির প্রথমে আব্দুল মান্নানের গ্যারেজে কিছু কাল কাজ করার পর নিজেই ভালো মিস্ত্রিতে পরিণত হন। ৯০’র দশকে বকচর এলাকায় নিজেই গড়ে তোলেন গ্যারেজ। তার বাবা কুটি মিয়া ছিলেন সবজির আড়তের কর্মচারী। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তার বাবা সবজির আড়ৎ চালিয়েছেন।

শাহিন কবির তার বাবার পেশা সম্পর্কে বলেন, আমার বাবা আড়তে কাজ করতো না। আমার বাবার তরকারির আড়ৎ ছিল। আমার বাবা নামকরা ব্যবসায়ী। আমি কোন দিন টোকাই ছিলাম না। তবে আমি গ্যারেজের মিস্ত্রি ছিলাম।

চোর সিন্ডিকেট

৯০’র দশকে বকচর এলাকায় গ্যারেজ করলেও খুব বেশি অর্থ না হওয়ায় রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখে শাহিন। ৯৫ সালের দিকে গাড়ি চুরির দিকে নজর পড়ে। গাড়ি চুরির জন্য সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এরপর দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে গাড়ি চুরি করে এনে তার গ্যারেজে ভাংতে শুরু করে। চুরি করা গাড়ির যন্ত্রাংশ বিক্রি করতে থাকে পেয়ে যায় আলাউদ্দিনের চেরাগ। গাড়ি চুরির অপরাধে পুলিশের হাতে আটকও হয়েছে। থানায় হয়েছে মামলা। কিন্তু টাকার জোরে সব সময় পার পেয়ে গেছে এই চোর সিন্ডিকেটের প্রধান শাহিন কবির। চুরি জায়েজ করতে গড়ে তোলেন যশোর অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতি।

এ ব্যাপারে শহিন কবির বলেন, আমি কোন চোর সিন্ডিকেটের সাথে নেই। আমি যদি চোর সিন্ডিকেট চালাতাম তাহলে পুলিশ-র‌্যাব আমাকে ধরতে না। আমি একজন ভালো মানুষ।

অটোমোবাইল মালিক সমিতি

চোর সিন্ডিকেটটি পাকাপোক্ত করার জন্য গড়ে তোলা হয় যশোর অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতি। সমিতির সাধারণ সম্পাদক বনে যান শাহিন কবির। এই সমিতিকে ব্যবহার করে শাহিন কবির নানা অপকর্ম চালিয়ে আসছে দিনের পর দিন। তার অত্যাচারে সমিতির সদস্যরা আজ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। জোরপূর্বক সমিতির পদটি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছে শাহিন কবির। সমিতির রয়েছে একটি গাড়ি। যার আয়-ব্যায়ের হিসাব পর্যন্ত দেয় না শাহিন কবির। গাড়ির সকল আয় যায় তার পকেটে। সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদাবাজিরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গাড়ি চুরি করে সেই গাড়ি নতুন করে তৈরি করে ছেড়েছেন বিভিন্ন রুটে। এতে হয়েছেন পরিবহন মালিক। অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির পদ তার খায়েশ পূরণ না হওয়ায় স্বপ্ন দেখতে শুরু করে যশোর বাস মালিক সমিতির সদস্য হওয়ার। মালিক সমিতির নেতাদের ম্যানেজ করে পেয়ে যান সদস্য পদ। সমিতির সদস্য পদ পেয়েই খ্যান্ত হননি শাহিন কবির। নেতাও হয়েছেন। নেতা হয়েই পরিবহন শ্রমিকদের ওপর শুরু করেছেন জুলুম নির্যাতন। তার কারণে অনেক শ্রমিকের রুটি-রুজি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শাহিন কবিরের সকল অপকর্মের সহায়তা করে আসছেন সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুজ্জামান শেখ। জনশ্রুতি রয়েছে সমিতির সভাপতি বাবুকে মদ্যপ পান করিয়ে হত্যা করার অভিযোগ সমিতির সদস্যদের। এরপর সহ-সভাপতি বাবুল হোসেন বাবুকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি করা হয়। কিন্তু বাবুও শাহিন কবিরের অত্যাচারে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। অটোমোবাইল মালিক সমিতির কয়েকজন সদস্য নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহিন কবির জীবনে এমন কোন অপরাধ নেই যা সেই করিনি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ সব অপকর্ম রয়েছে তার জীবনের সাথে।

আটোমোবাল সম্পর্কে শাহিন কবির বলেন, অটোমোবাইল ওয়ার্কার্স মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটি নেই। আমাদের যশোরের এর কোন অস্তিত্ব নেই। আমি কাউকে দিয়ে কোন চাঁদাবাজি করায় না। আমি একজন ভালো ব্যবসায়ী। ব্যবসার কারণে আমি চীন থেকে ঘুরে এসেছি। আমি কোন দিন কাউকে মাদক সেবন করায়নি।

সম্পদ

টোকাই থেকে চোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে কোটিপতি হওয়া শাহিন কবিরের রয়েছে অঢেল সম্পদ। বর্তমানে তার রয়েছে ৫টি পরিবহনসহ বিভিন্ন রকমের কয়েকটি গাড়ি। যশোর-খুলনা রুটে তার দুটি পরিবহন চলে। যশোর-রাজশাহী রুটে চলে একটি, বেনাপোল-শরীয়পুর রুটে একটি, খুলনা-কালনা রুটে একটি পরিবহন চলে। যশোর শহরের মুড়লি মোড়ে রয়েছে তার বিশাল আলিশান বাড়ি। শহরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে কয়েক বিঘা জমি। মুড়লি মোড়ে রেলক্রসিংয়ের পাশে রয়েছে বিশাল জমি। এছাড়া কয়েকটি ফ্লাটও রয়েছে তার নামে ও বেনামে।

শাহিন কবির তার সম্পদ সম্পর্কে বলেন, আমি ব্যবসা করে সম্পদ করেছি। এটাও কি আমার অপরাধ ?

চরিত্র

দেখতে সুন্দর ও কথা সুমধুর হওয়ায় শাহিন কবির যে কোন মানুষকে কনভেন্স করতে পারে খুব সহজেই। মানুষ কনভেন্স করার ক্ষমতা রয়েছে তার মধ্যে। তার কথাবার্তা শুনলেই যে কোন মানুষ তার প্রেমে পড়ে যাবে। জীবনে প্রথম পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয়। তার কথার কারণে প্রেমে পড়ে যায় তারই এক ড্রাইভারের বউ। শেষ পর্যন্ত সেই ড্রাইভারের বউকে বিয়ে করেন শাহীন কবীর। শাহীন কবিরের হাত থেকে রক্ষা পায়নি তার শ্যালকের স্ত্রী। শ্যালকের স্ত্রীকেও বিয়ে করেছেন তিনি।

শাহিন কবিরের বক্তব্য

শাহিনর কবির বলেন, আমার সব কিছু বৈধতা থাকার পরও মালিক সমিতি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে আমি তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেব। যশোর মিনিবাস-বাস মালিক সমিতির নেতারা যে কর্মকাণ্ড করছে তার কোন বৈধতা নেই।

স্বাআলো/এসএ