ভুষি কারখানার শ্রমিক ছিলেন মেডিকেলের শিক্ষার্থী

রংপুর ব্যুরো: দিনাজপুরের বিরামপুরের ঘাটপাড় গ্রামের নরসুন্দর লগিনী শীলের ছেলে রাজ কুমার শীল। ঢাকা বোর্ড থেকে বিজ্ঞান বিভাগে সম্মিলিত মেধা তালিকায় উচ্চ স্থান পেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ৪০তম ব্যাচে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু স্বাস্থ্যগত সমস্যার কারণে তার জীবনে নেমে আসে করুণ পরিণতি । জীবনের যাত্রা থেমে গেল তার। রাজুকুমার এখন ভুমি কারখানার ৫০ টাকার শ্রমিক।

তার করুণ পরিণতির কথা সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে তুলে ধরেছেন বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডা.বেলায়েত হোসেন ঢালী ।

তিনি জানান, বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বহির্বিভাগে কয়েকজন মেডিকেল অফিসার ডিউটি রুমে ছিলেন। রোগী আসা প্রায় শেষের দিকে। এমন সময় প্রায় ৭০ বছর বয়সী এক বৃদ্ধা আসলেন। সঙ্গে ছিলেন ৫২ আর ৪৮ বছরের দুই ছেলে। সমস্যার কথা জানতে চাইলে বৃদ্ধার হাতে থাকা কাগজগুলো এগিয়ে দেন।

ওই বৃদ্ধা বলেন, ছেলেদের জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার দরখাস্ত করবেন। অনেক কাগজের সঙ্গে পাবনা মানসিক হাসপাতালের দুটি ছাড়পত্র পেলেন চিকিৎসকরা। প্রথমে কে রোগী বুঝতেই পারেননি তারা। পরে বৃদ্ধা দুই ছেলের জন্যই দরখাস্ত করবেন বলে জানান। দুইজনেরই একই রোগ। পরে একজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের স্বাক্ষর দেখে কিছুটা আশ্চর্য হলেন ডা. বেলায়েত। পরিচয়পত্রে নাম লেখা ছিল রাজকুমার শীল। হাতের লেখার সঙ্গে চেহারার মিল পাচ্ছিলেন না তিনি। সুন্দর লেখা দেখে জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কতদূর পর্যন্ত পড়াশুনা করেছেন।

উত্তরে রাজকুমার শীল ডা. বেলায়েতকে জানান, তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র ছিলেন। তখন ডা. বেলায়েত নিজের কানকে বিশ্বাস করাতে পারছিলেন না। একে একে সব ঘটনা বললেন। রাজকুমার ঢামেকের ৪০তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন। ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়েছিলেন। দ্বিতীয় প্রফেশনাল পরীক্ষায় ফার্মাকোলজিতে অকৃতকার্য হলেও কয়েকবার পরীক্ষা দেন। তারপর মানসিক অসুস্থতার (সিজোফ্রেনিয়া) জন্য বাড়ি ছাড়া ছিলেন ১৪ থেকে ১৫ বছর। ওই সময় একটি কারখানায় কাজ করতেন। পাবনার হাসপাতালেও ভর্তি ছিলেন এক বছর।

রাজকুমার শীলের মা পার্বতী রাণী শীল জানান, প্রাথমিক ও জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিলেন রাজকুমার। তার বাবা নাপিত হলেও চার ছেলে মধ্যে তিন ছেলেকে নিজের পেশায় আনেননি। রাজ কুমার ১৯৮০ সালে বিরামপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি ও ১৯৮২ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন। ১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। তার পরেই এই সমস্যার সৃষ্টি হয়। এখন রাজকুমারকে ওষুধ খাওয়ালে মেডিকেলের পড়াশোনার কথা মনে করতে পারে।

রাজকুমারের ভাই গোবিন্দ শীলের একই রোগ। তিনি রাজধানীর তিতুমীর কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তবে অসুস্থতার কারণে স্নাতক সম্পন্ন হয়নি। রাজকুমার এখন একটি ভূষি কারখানায় কাজ করে ৫০ টাকা মজুরি পান।

এদিকে সামর্থবান না হওয়ায় তাদের  জন্য প্রতিবন্ধী ভাতার দরখাস্ত করেছেন তাদের ৭০ বছর বয়সী মা পার্বতী রাণী শীল। তিনি বলেন, অসুস্থ হওয়ায় তারা বড় কোনো কাজ করতে পারে না।

স্বাআলো/আরবিএ