আগৈলঝাড়ায় সুন্দরবনের সুন্দর প্রাণি চিত্রা হরিণের খামার

বরিশাল

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি: সুন্দরবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রাণীটি নাম চিত্রা হরিণ। যাকে স্থানীয়ভাবে চিত্রল হরিণ, চিত্র মৃগ, চিতল নামে ডাকা হয়। এই হরিণের খামার করে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার রাজিহার গ্রামের বাসিন্দা জেমস মৃদুল হালদার।

২০১০ সালে রাজিহার গ্রামে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আলোশিখার পরিচালক জেমস মৃদুল হালদার শখের বশে ব্যক্তিপর্যায়ে দুটি চিত্রা হরিণ পালন শুরু করেছিলেন। শুরুতে তিনি একটি পুরুষ ও একটি মায়া চিত্রা হরিণ রাজশাহী থেকে কিনে আনেন। হরিণ দুটি এক সপ্তাহের মধ্যে মারা যায়। এর কিছুদিন পরেই হরিণ পোষার নেশায় তিনি বগুড়ার শিয়ালী গ্রামের এক খামারির কাছ থেকে আবার দুটি হরিণ কেনেন। পরিবহন খরচসহ ওই দুটির দাম পড়ে এক লাখ টাকা। এর কিছুদিন পর হরিণ বাচ্চা প্রসব করে এবং বছরে বছরে হরিণের সংখ্যা বাড়তে থাকে। ব্যক্তিপর্যায়ে হরিণ পালার শখ গিয়ে ঠেকে খামারিতে। সেই খামারে গত ১০বছরে হয়েছে ১৬টি ।

জেমস মৃদুল হালদার বলেন, চিত্রল হরিণ পোষা সংক্রান্ত নীতিমালা ২০০৯ অনুমোদনের পর শখের বশে তার হরিণ পালার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়। ২০১০ সালে দুটি হরিণ সংগ্রহের পর পালন শুরু করি। কয়েকমাস পরেই সে হরিণ দুটি বাচ্চা প্রসব করলে ভালোলাগা বেড়ে যায়। এরপর ধীরে ধীরে ব্যক্তিপর্যায় থেকে খামারি পর্যায়ে চলে যাই। অর্থাৎ ১০টির বেশি হয়ে যায় হরিণের সংখ্যা। বর্তমানে খামারে ১৬টি হরিণ রয়েছে। এর আগে ২০১৮ সালে ২৬টি হরিণ ছিল খামারে। আটটি দান করা হয়েছে এবং দুটি মারা গেছে।

তিনি বলেন, হরিণের তেমন কোনো রোগবালাই নেই, তাই পালনটা সহজ। শুধু হরিণের হার্টঅ্যাটাক হওয়ার আশংকা একটু বেশি থাকে। তারপরেও গত ১০ বছরে আমার খামারে মাত্র দুটি হরিণ মারা গেছে। আবার আমার কাছ থেকে হরিণ নিয়ে গাজীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জের তিনজনে হরিণ পালন শুরু করেছেন। তারমধ্যে গাজীপুরের হরিণগুলো দুটি বাচ্চাও দিয়েছে। আবার বরিশালের দুর্গাসাগরে দর্শনার্থীদের জন্য দুটি হরিণ আমার এই খামার থেকেই দান হিসেবেই দেয়া।

খাবারসহ আনুষঙ্গিক খরচের বিষয়ে তিনি বলেন, হরিণ সবকিছু খায় না। বিশুদ্ধ পানি ছাড়া চিত্রা হরিণ অন্যকোনো পানি পান করে না। এদের খাবারের তালিকায় রয়েছে গমের ও ডালের ভূষি, গুঁড়া সয়াবিন, মালঞ্চ-কলমি পাতা। এছাড়া কেওড়া ফল ও বাঁধাকপিও খেতে দিচ্ছি হরিণগুলোকে। লালন-পালনে বিশেষ নজর রাখতে হয় জানিয়ে তিনি বলেন, এজন্য আলাদা লোক রাখতে হয়েছে। ৪০ শতক জমির ওই খামারটিতে মাঠের বাইরে আলাদা বসার ঘর করতে হয়েছে হরিণের জন্য। সুন্দরবন ছাড়া এ অঞ্চলে কেওড়া গাছ পাওয়া যায় না, তাই সেই গাছও আমাকে রোপণ করতে হয়েছে।

আরো পড়ুন>>>মানসিক ভারসাম্যহীনদের সেবায় শান্তি পান মারুফ-মরিয়ম দম্পতি

খাওয়া-দাওয়া ও পরিচর্যায় গত ১০ বছরে বহু পুঁজি খেটেছে জানিয়ে তিনি বলেন, বাণিজ্যিক অনুমোদন অর্থাৎ হরিণ বিক্রির অনুমোদন না দেয়ায় এ খাতে এখনও কোনো আয় নেই। তবে হরিণ যে দান করা হয় সেখান থেকে উপহার হিসেবে অনেকেই টাকা-পয়সা দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, প্রতিমাসে লালন-পালনে হরিণগুলোর পেছনে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। আর এ খরচ শুধু শখের বশে পালন করি বলেই বহন করছি। যদিও পালন করে বড় করা একটি হরিণ জবাই করে এর মাংস খাওয়াটাও মুশকিল। কারণ এক্ষেত্রে উপযুক্ত কারণ (বয়স্ক কিংবা অসুস্থতা) দেখিয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে অবহিত করে অনুমতি আনতে হয়। এর বাইরে হরিণের বাচ্চা হলেও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে অবহিত করতে হয়। প্রতিবছর হরিণ প্রতি আগে ১০০ টাকা করে দিতে হলেও ২০১৮ সাল থেকে এক হাজার টাকা করে দিতে হচ্ছে সরকারকে। এছাড়া ১৫ শতাংশ ভ্যাট। নতুন লাইসেন্স করা, নবায়ন করা সবকিছু মিলিয়ে দিন দিন খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

হরিণ বন্যপ্রাণী হলেও গবাদিপশুর মতো পোষ মানে জানিয়ে জেমস মৃদুল হালদার বলেন, আমার খামারে সর্বোচ্চ সাত বছর বয়সের আর সর্বনিন্ম দুই মাস বয়সী হরিণ রয়েছে। যার মধ্যে অনেকগুলোই গৃহপালিত প্রাণীর মতো কাছে আসছে, তাদের শরীরে হাত দেয়া যাচ্ছে, আদর করা যাচ্ছে। তবে বেশি মানুষ দেখলে হরিণগুলো একটু ঘাবড়ে যায়। তাই বাধ্য হয়েই খামারের সীমানা প্রাচীরে দুটি স্তর করতে হয়েছে।

জেমস মৃদুল হালদারের দাবি, যেহেতু চিত্রা হরিণ পোষ মানে, সে কারণে বিলুপ্তি ঠেকাতে গবাদিপশুর মতো সরকারের এর খামারের অনুমোদন দেয়া এবং বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের সুযোগ দেয়া উচিত। তা না হলে যে হারে দেশে বনভূমি কমে আসছে, তাতে চিত্রা হরিণ একদিন সত্যি সত্যিই বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, খামারের অনুমোদনের পাশাপাশি অঞ্চলভিত্তিক চিকিৎসক নিয়োগ দেয়া উচিত। কারণ প্রাণিসম্পদ বিভাগের চিকিৎসকরা হরিণের রোগ-বালাই সম্পর্কে তেমন কিছুই জানেন না। আবার একটা হরিণ ধরার জন্য গাজীপুর নয়তো ঢাকা চিড়িয়াখানা থেকে লোক আনতে হয়। সেক্ষেত্রে এসব সমস্যার সমাধানে অঞ্চলভিত্তিক জনবল নিয়োগ দেয়া উচিত। সবকিছু মিলিয়ে হরিণ যাতে সবাই পালন করতে পারে সেজন্য নীতিমালা শিথিল করা, ট্যাক্স কমানো এবং লাইসেন্স গণহারে দেয়া উচিত বলেও তিনি মনে করছেন।

প্রাণিবিজ্ঞানী ও সরকারি ফজলুল হক কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান ড. অধ্যাপক গোকুল চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, কুকুর-গরু-ছাগল সবকিছুই সভ্যতার বিবর্তনে একটি নিয়মের মধ্যে থেকে আজ পোষ্য ও গৃহপালিত। তেমনি হরিণ যদি পোষ মানে সেটা অবশ্যই ভালো। তবে এর আগে নিয়মতান্ত্রিকভাবে সুষ্ঠু পরিকল্পনার প্রয়োজন। হুট করেই বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাওয়া যাবেনা। এজন্য বিস্তর গবেষণা, আলোচনা ও সময়ের প্রয়োজন। তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে হরিণ পালন কিংবা খামার করার বিধিবিধান এখন অনেক সহজ করা হয়েছে।

স্বাআলো/আরবিএ