সাধারণ মানুষকে নির্যাতন নাজিম উদ্দিনের জন্য নতুন নয় (ভিডিওসহ)

ডেস্ক রিপোর্ট: কক্সবাজারে ভূমি কমিশনার থাকাকালে এক বৃদ্ধকে কানে ধরে টেনে-হিঁচড়ে নির্যাতন করেন কুড়িগ্রামের বর্তমান সিনিয়র সহকারী কমিশনার নাজিম উদ্দিন।

কুড়িগ্রামে বাংলা ট্রিবিউনের সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম রিগানকে মাদক দ্রব্য দিয়ে ফাঁসানোর চেষ্টা ও নির্যাতনের ঘটনার অন্যতম নায়ক জেলার সিনিয়র সহকারী কমিশনার (রাজস্ব) নাজিম উদ্দিন। ঘটনার দিন রাতে সাংবাদিক আরিফুল ইসলামকে বাড়ি থেকে তুলে নেয়া ও নির্যাতনে তিনিই নেতৃত্ব দেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটি ইতোমধ্যে বিষয়টির সত্যতা পেয়েছে।

তবে সাংবাদিকদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনিয়ম-দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার নাজিম উদ্দিনের জন্য নতুন নয়। ২০১৮ সালে নাজিম উদ্দিন কক্সবাজারের ভূমি কমিশনার (এসিল্যাল্ড) ছিলেন। সে সময় নানা অনিয়ম-দুর্নীতি, মানুষের সাথে দুর্ব্যবহার, ক্ষমতার অপব্যবহার ইত্যাদি ছিল নৈমত্তিক ঘটনা। এমনই একদিন নফু মাঝি নামে এক বৃদ্ধকে নির্যাতনের অভিযোগে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছিল।

আরো পড়ুন>>>  জেলা প্রশাসনের নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন সাংবাদিক আরিফ

কক্সবাজার জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছেন, সাংবাদিক নির্যাতনকারী নাজিম উদ্দিন গত ২০১৭ সালে কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভুমি) হিসাবে যোগদান করেন। যোগদানের পর থেকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। সে কারণে-অকারণে সাধারণ মানুষকে লাঞ্চিত করে তিনি আনন্দ পেতেন। নিজেকে এত বেশি ক্ষমতাবান মনে করতেন যে, জনস্বার্থ বিষয়ে কোনো খোঁজ-খবর নিতে গেলে সাংবাদিকদেরও তার কার্যালয়ে ঢুকতে দিতেন না। এমনই এক সময়, স্থানীয় এক বৃদ্ধকে নির্যাতনের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে তাকে ২০১৮ সালের ১১ নভেম্বর রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আশরাফুল আফছার নাজিম উদ্দিনকে বদলির কথা নিশ্চিত করেছেন। তবে তিনি ছুটিতে ঢাকায় থাকার কারণে নাজিম উদ্দিনকে কেন এবং কি কারণে বদলি করা হয়েছিল সেটি নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন নাজিম উদ্দিনের নানা দুর্নীতির ফিরিস্তি। ওই কর্মকর্তার ভাষ্যমতে, নাজিম উদ্দিন সদর উপজেলা সহকারি (ভূমি) হিসাবে যোগদান করার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। ২০১৮ সালের মে মাসে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার মোহাম্মদ আলী ওরফে নফু মাঝিকে (৬২) কানে ধরে টেনে-হিঁচড়ে নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এতে শুধু কক্সবাজার জেলা প্রশাসন নয়, চট্টগ্রামসহ সারাদেশের সরকারি কর্মকর্তারা বিব্রতবোধ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিয়ে তাকে রাঙ্গামাটির লংগদুর মতো উপজেলায় বদলি করা হয়েছিল। এটি ছিল শাস্তিমূলক বদলি। প্রশাসনের সর্বোচ্চ মহলেও তার বিষয়ে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। সেই বর্তমানে নাজিম উদ্দিন কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সিনিয়র সহকারি কমিশনার (রাজস্ব শাখা, এলএ শাখা, ব্যবসা ও বানিজ্য শাখা এবং আরএম শাখা) কর্মরত।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের পরিবেশবাদী স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘এনভায়রনমেন্ট পিপল’ এর প্রধান নির্বাহী ও সাংবাদিক রাশেদুল মজিদ জানান, কক্সবাজার সদর উপজেলার সাবেক সহকারি কমিশনার (ভূমি) নাজিম উদ্দিন অসম্ভব একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা। তার বিরুদ্ধে আমি কক্সবাজার জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছিলাম। সেই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আমাকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে হাজির হতে বলা হয়। সে সময়ে আমি হাজির হলেও দুর্নীতিবাজ নাজিম উদ্দিন হাজির হয়নি। এরইমধ্যে এক বয়স্ক বৃদ্ধকে কানে ধরে টেনে-হিঁচড়ে আনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। সেটি জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি গোচর করা হলে জেলা প্রশাসক কামাল হোসেন আমাকে বলেছিলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি ভীষণ বিব্রত’।

রাশেদুল মজিদ আরো বলেন, সাবেক এই এসিল্যান্ড নাজিম উদ্দিন দায়িত্বপালন করার সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে নানাভাবে অপকর্ম করে গেছেন। খাসজমি বন্দোবস্তির দেয়ার আশ্বাসে ঘুষ-দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন। সাধারণ মানুষদের নানাভাবে নাজেহাল করতেন।

শুক্রবার নিজ বাড়ি থেকে আরিফুল ইসলামকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে গভীর রাতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে এক বছরের জেল ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযোগ আনা হয়, আরিফুলের বাড়ি থেকে আধা বোতল মদ ও ১৫০ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে। যদিও আরিফুলের স্ত্রী ও স্থানীয়দের দাবি, আরিফুল মদ-গাঁজা তো দূরের থাক পানসেবী বা ধূমপায়ীও নয়।

প্রসঙ্গত, কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে নিজ নামে পুকুর খননের অভিযোগ ওঠায় সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন লেখেন আরিফুল। সম্প্রতি জেলা প্রশাসনের নিয়োগ অনিয়ম নিয়েও প্রতিবেদন করছিলেন তিনি।

 

স্বাআলো/এসএ