স্মৃতির মিনার রংপুর টাউন হলের জীর্ণদশা

হারুনুর রশিদ সোহেল, রংপুর : অবিভক্ত ভারতবর্ষের খ্যাতিমান কবি সাহিত্যিকের পদচারণা এক সময় মুখরিত ছিল রংপুর টাউন হল। এখান থেকেই রংপুরের প্রথম নাট্যচর্চা শুরু হয়। পরবর্তীতে মুক্তি যুদ্ধের সময় পাকসেনাদের নারী নির্যাতন কেন্দ্র হিসেবে এই হল ব্যবহার করা হয়। বহু স্মৃতিবিজড়িত আনন্দ বেদনার সাক্ষি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রংপুর টাউন হল।

রংপুর টাউন হলের আদি নাম রঙ্গপুর নাট্যসমাজ থিয়েটার হল। এক সময় এ নামেই পরিচিত ছিল। ১৮৯১সালে এটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এর জন্য জমি দেন কাকিনার মহারাজা। তখন থেকেই নিয়মিত এ হলটি ঘিরে রংপুরে নাট্যচচার্র ডালপালা বিস্তার করে বিকশিত হতে থাকে।

রঙ্গপুর নাট্যসমাজ থিয়েটার হলটি পরে আর্টস কাউন্সিল হলে পরিণিত হয়। সে সময় ওই জায়গাটিতে একটি ঘর ছিল। ঘরটি স্থাপন করা হয় ১৯১৩ সালে। ব্যয়বহুল এই পাকা প্রেক্ষাগৃহ বানানো হয়েছিল জনসাধারণে অর্থে। সে সময়ও রংপুরের দর্শকরা ছিলেন নাট্যমনা। তখন একটি নাটক ৮-৯ বার মঞ্চায়ন হলেও দর্শকের অভাব হতো না। যখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো উন্মুক্ত সংস্কৃতি মঞ্চ হয়ে দাঁড়িয়েছে তখনও রংপুরে নাটক দেখার সেই দর্শক আজও রয়েছে। প্রখ্যাত নাট্য শিল্পী আসাদুজ্জামান নুর, আলী যাকের, সারা যাকের, আব্দুল্লাহ আল মামুন, জাহিদ হাসান, কামাল উদ্দিন হোসেন, আজিজুল হাকিম, কামরুল হাসান নীলু, ফজলুর রহমান বাবু, লীমা রহমান, তমালিকা কর্মকার, আতাউর রহমান, মামুনুর রশিদ, জাহানারা হোসেন, শমি কায়সার, তারিক আনাম, চলচিত্র অভিনেতা আনোয়ার হোসেন, চলচিত্র নির্মাতা ও অভিনেতা সুভাষ দত্ত, আনোয়ারা, সাবানা, প্রয়াত নাট্য অভিনেতা গোলাম মোস্তফাসহ প্রখ্যাত নাট্য শিল্পীরা রংপুর টাউন হল মঞ্চে নাটক করে গেছেন।

রংপুরে নাট্য আন্দোলেনের যারা অতীতে সংগঠনক ও অভিনেতা হিসেবে কাজ করেছেন তারা হলেন, অধ্যাপক এ হাদি, অ্যাডভোকেট গাজী রহমান, ডা. আশুতোষ দত্ত, ডা. জুন্নুন্, অ্যাডভোকেট মীর আলতাফ আলী, ডা. গোলাম রব্বানী, চারণ সাংবাদিক ও নাট্যকার মোনাজাত উদ্দিন। তাদের পথ ধরে আজও নাট্য আন্দোলনে কাজ করে যাচ্ছেন সামসুজ্জোহা বাবলু, অভিনেতা বিপ্লব প্রসাদ, রাজ্জাক মুরাদ, মানস সেন গুপ্ত, নিপুন রায়, জিএম নজু, আরিফুল হক রুজু প্রমুখ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রঙ্গপুর নাট্য সমাজ থিয়েটার হলের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে। ঠিক সে সময় ১৯৪৫ সালে এক সিনেমা কোম্পানিকে সিনেমা প্রদর্শনের জন্য ভাড়া দেয়া হয়। ভাড়ার শর্ত ছিল যে কোন সময় প্রয়োজন হলে ৭ দিনের নোটিশে নাট্য সমাজের ব্যবহার জন্য ছেড়ে দিতে হবে। ১৯৬৩ সালে নাট্য সমাজের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি তৎকালীন সরকারের কর্তৃত্বাধীনে চলে যায় এবং এর ব্যবস্থাপনা সমাজ কল্যাণ দফতরের দ্বারা পরিচালিত হতে থাকে। তখন থেকে টাউন হলটি সকলের জন্য উন্মুক্ত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ব্যবহৃত হতে থাকে।

১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধের সময় হলটি দারুনভাব ক্ষতিগ্রস্থ হয়। হলটি দখল করে নেয় হানাদার বাহিনী। তারা যুদ্ধের নয় মাস এটি নারী নির্যাতন কেন্দ্রে পরিণিত করে। নির্যাতন করে যাদের হত্যা করা হয়েছিল তাদের মরদেহ টাউন হলের পেছনে একটি ইদারার ভেতর ফেলে রাখা হয়। আবার অনেককে পাশেই গণ কবর দেয় হয়।

১৯৭৮ সালে হলটি সংস্কার করে নাটক, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য উপযোগী করে তোলা হয়। দীর্ঘ ১২৯ বছরের ঘটনাবহুল আনন্দ বেদনার ইতিহাস নিয়ে হলটি দাঁড়িয়ে আছে রংপুর শহরে। এই প্রচীন স্থাপনাটি এখন সংস্কার আভাবে ভগ্নদশায় পৌছেছে।

স্বাআলো/টিআই/কে