দারিদ্র আর দায়িত্বশীলদের অসহযোগিতাকে জয় করা এশার গল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর:  প্রতিভা থাকলে দাবিয়ে রাখা যায় না চলামান বাস্তবতায় যেন এই চিরায়ত বাণীটি মৃয়মান হতে চলেছে। তবে দমে যাওয়া যাদের চরিত্রে নেই, তাদের আটকায় কে? তাই নানা বাঁধা আর দায়িত্বশীলদের অসহযোগিতাকে জয় করে যশোরের মেয়ে সুরাইয়া শিকদার এশা পৌঁছে গেছে তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। মেয়েকে এই সাফল্য এনে দিতে ছায়ার মতো তার পাশে ছিলেন বাবা খবির শিকদার।

হ্যা, আমরা বলছিলাম এশার বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তির সুযোগ পাওয়ার ‘যুদ্ধের’ গল্প। এই সুযোগ পেতে তাকে তিন তিনটি পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে। আর এর প্রস্তুতি নিতে বার বার পড়তে হয়েছে বাঁধার মুখে।

এশার বাবা খবির শিকাদার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সামান্য একজন কর্মচারী। থাকেন শহরের রেলরোডের ফুড গোডাউন এলাকায়। স্ত্রী ও দুই  মেয়ে নিয়ে তার সংসার।

বাবা খবির শিকদার বলেন, এশার বড় বোন সুমাইয়া শিকদার ইলা ক্রিকেট, ফুটবল, জুডো খেলে। গত বছর মার্চে বিকেএসপির প্রতিভা অন্বেষণের জন্য সারাদেশ বাছাই পরীক্ষা হয়। সেই পরীক্ষায় আমি আমার বড় মেয়েকে নিয়ে যায়। সাথে ওর মা ও আমার ছোট মেয়ে এশাও ছিলো। এশা বাদাম খাওয়ার কথা বলে মায়ের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফরম সংগ্রহ করতে লাইনে দাঁড়িয়ে যায়। এদেখে আমি তার জন্যও একটি ফরম সংগ্রহ করি। সেই পরীক্ষায় ওরা দুই বোনই টিকে যায়।

খবির শিকদার বলে চলেন, বড় মেয়েটার পচ্ছন্দ জুডো আর ছোটটার জিমন্যাস্টিকস্। পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হয়ে এশা মোবাইলে শরীর কসরত দেখে আর নিজে নিজে প্রাকটিস করে। পরে এশা ঢাকা বিকেএসপিতে এক মাসের প্রশিক্ষণের সুযোগ পায়। ওই প্রশিক্ষণ শেষে যশোরে এসে বাঁধে বিপত্তি। প্রাকটিসের জায়গা নেই। যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থার জিমন্যাসিয়াম আছে। কিন্তু সেখানে প্রাকটিসের পরিবেশ নেই। এজন্য আমি জেলা প্রশাসকের সাথে দেখা করেছি। কিন্তু কোন কাজ হয়নি। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন পার্কে, রাস্তার পাশে, স্কুল মাঠে যেখানে জায়গা পেয়েছি সেখানে প্রাকটিস করিয়েছে। গত বছর জুলাই মাসে ফের এশাকে ঢাকায় ডাকা হয়। সেখানে দুই মাসের প্রশিক্ষণ পায়। এই প্রাকটিস আর প্রশিক্ষণের মধ্যেও সে যশোর ইনস্টিটিউট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে লেখাপড়া চালিয়ে যায়। এরই মধ্যে গত নভেম্বরে বিকেএসপিতে ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। সেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় খুলনা আঞ্চলিক শাখায়। এই পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতেও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। এক্ষত্রে কোচ সানোয়ার আলম সানু তাকে বেশ সহযোগিতা করেছেন। তার মাও তাকে অনুপ্রাণিত করেছেন। গত ১৮ ও ১৯ নভেম্বরের সেই পরীক্ষায় আমরা সপরিবারে খুলনায় যাই। মেয়ে পরীক্ষা শেষেই আমাকে জানাই, একজন পাস করলে আমি করবো।

এশার মা ফিরোজা খাতুন সুমি বলেন, আমাদের নিম্নবিত্ত পরিবার। স্বভাবিকভাবে সংসার চালাতেই হিমসিম খেতে হয়। এর মধ্যে দুই মেয়ের লেখাপাড়া ও খেলার প্রাকটিসের সরঞ্জাম, পরীক্ষার জন্য বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া-খুবই ব্যয়বহুল। মেয়েদের বাবা এসব কথা ভাবে না। শুধু ছোটে আর ছোটে। ধার দেনা করে। এশার স্বপ্ন বিশ্ব অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া। সে মেয়ের ইচ্ছা পূরণ করবেই।

সানোয়ার আলম সানু বলেন, এশার প্রতিভা আছে। আমি তাকে প্রথম দেখেই তা বুঝেছি। এজন্য আমার সব জ্ঞান দিয়ে তাকে প্রাকটিস করিয়েছি। উপযুক্ত সহযোগিতা পেলে সে ভবিষ্যতে বিশ্বে বাংলাদেশের হয়ে নেতৃত্ব দিতে পারবে। এশার বড় বোন ইলাও বেশি প্রতিভাশীল খেলোয়ার। সে আগামীতে বাংলাদেশ গেমসে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

স্বাআলো/এএম