ভেঙে পড়েছে রংপুর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি

হারুন উর রশিদ, রংপুর : করোনা ভাইরাসের প্রভাবে সৃষ্ট সংকটে রংপুর অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিবহন ও বিপণন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় মাঠভরা সবজি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। ক্ষেতেই সবজি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ক্রেতা মিলছে না। যদিও বাজারে কিছু বিক্রি হচ্ছে পানির দামে।
একইভাবে বোরো ধান, পাট, আলুসহ চলতি মৌসুমের কৃষি ফসল উৎপাদন ও বিপণন নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষি নির্ভর গৃহস্থপরিবার ও কৃষি শ্রমিকরা। কৃষকদের জীবনযাপনে মারাত্মক বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরবর্তী কৃষি উৎপাদন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। ফলে ভেঙ্গে পড়েছে রংপুর অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতি।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও কৃষকরা জানান, প্রতি মৌসুমে প্রায় ১০ লাখ টন সবজি হয় রংপুর কৃষি অঞ্চলে। এসব সবজি রংপুর অঞ্চলের চাহিদা মিটিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়। বেশিরভাগ সবজিচাষীর বৃহৎ বাজার ছিল ঢাকা।
কিন্তু এবার করোনার কারণে পরিবহন সংকট ও বাজারে পাইকারি ক্রেতা না থাকায় সবজিচাষীরা পড়েছেন বিপাকে। ক্রেতার অভাবে পানির দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন সবজিচাষীরা।
রংপুর অঞ্চলের মিঠাপুকুর, জায়গীর, রানীপুকুর, পীরগঞ্জ, খালাশপীর, বদরগঞ্জ, পালিচড়া,  ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, লালমনিরহাট, আদিতমারি, নীলফামারী ও পঞ্চগড় থেকে সবচেয়ে বেশি পরিমাণ বেগুন, করলা, বরবটি, তরমুজ, আনারস, টমেটোসহ নানা ফল ও শাকসবজি নিয়ে অসংখ্য ট্রাক যেত ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। পরিবহন সংকটের কারণে শাকসবজি ও উৎপাদিত ফল রংপুর অঞ্চল থেকে বাইরে পাঠানো যাচ্ছে না। স্থানীয় হাটবাজারেও নেই পাইকারি বেচাকেনা।
নিজেরাই দোকান সাজিয়ে বসছেন অনেক কৃষক। সেখানেও ক্রেতা নেই। এমন পরিস্থিতিতে চরম ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন তারা। করোনা আতঙ্কে এখন ক্রেতা-বিক্রেতার পাশাপাশি পাইকারি ব্যবসাও এখন প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ব্যাংকিং ব্যবস্থার কারণেও ব্যবসায়ীরা টাকার অভাবে এসব ব্যবসায় অর্থলগ্নি করতে পারছেন না।
ফলে বাজারে টাকার প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ক্রেতার অভাব পড়েছে। আগামী দিনগুলো কেমন যাবে- এ আশঙ্কায় অনেক ব্যবসায়ী কোথাও টাকা লগ্নি করছেন না। আলুচাষীরাও বিপাকে পড়েছেন। বিভিন্ন হিমাগারে আলু পরিবহন ও সংরক্ষণ নিয়ে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কৃষিমজুর মিলছে না।
এবিষয়ে কথা হয় রংপুর সবচেয়ে বেশি হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করেন মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবুর সাথে। তিনি বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি ও মোতাহার গ্রুপের চেয়ারম্যান। তার ১৪টি হিমাগার রয়েছে। তিনি জানান, এবার করোনা পরিস্থিতির কারণে তাদের হিমাগারগুলোর প্রায় ৪০ ভাগ জায়গা ফাঁকা রয়েছে। পরিবহন ও মজুর সংকটের কারণে তাদের হিমাগারে কাক্ষিত আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব হয়নি। হিমাগার মালিকরাও লোকসানের আশঙ্কায় রয়েছেন। আলুর বাম্পার ফলন হলেও আলুচাষীরা মারাত্মক বিপাকে পড়েছেন।
এদিকে কৃষিপণ্যের বাজারদর নিুমুখী, পরিবহন সংকট ও ক্রেতা না থাকায় গ্রামের অবস্থাপন্ন গৃহস্থ কৃষকরাও জমিতে নতুন করে ফসল উৎপাদনে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। ফলে আগামীতে কৃষি উৎপাদনে অশনিসংকেত বলে মনে করছেন মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকরা।
কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার বর্গাচাষী যতীশ চন্দ্র রায় জানান, কৃষি শ্রমিক ও দোকানপাট বন্ধ থাকায় সার ও বালাইনাশক পাওয়া যাচ্ছে না।এ জন্য তিনি বোরো ধান উৎপাদন নিয়ে সংকটে পড়েছেন। এ পরিস্থিতি বিরাজ করলে আগামী আমন ধান উৎপাদনেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
মিঠাপুকুরের কাফ্রিখাল বালুয়া মাঠের পারের কৃষক আবদুল কাদের ও সামসুজ্জামান জানান, তিনি এবার ৪ বিঘা জমিতে টমেটো চাষ করেছেন। শুক্রবার ৫০ মন টমেটো বিক্রি করেছেন ৩ টাকা কেজি দরে। অথচ তার উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রতি কেজিতে সাড়ে ৮ টাকা।
তিনি জানান, বর্তমানে করলা প্রতি কেজি ৬ টাকা, ঝিঙ্গা ১৫ টাকা, পটোল ১২ টাকা, ঢেঁড়স ১০ টাকা, বরবটি ১৫ টাকা, মিষ্টি কুমড়া প্রতিটি ১০-১২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকরা উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মিঠাপুকুর উপজেলার লতিবপুর বউ বাজার গ্রামের চাষী আবদুর রহিম জানান, তিনি ৪ বিঘা জমিতে বরবটি চাষ করেছেন। কম দামে তা বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, গাইবান্ধা, লালমনিরহাট জেলায় ৩৮ হাজার ৭৩৬ হেক্টর জমিতে সবজির আবাদ হয়েছে। যা এই মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১ হাজার ২৯ হেক্টর বেশি। এ বছর সবচেয়ে বেশি সবজির আবাদ হয়েছে রংপুরে। কম আবাদ হয়েছে নীলফামারী জেলায়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী বলেন, করোনার কারণে ক্রেতাসহ পরিবহন সংকটে দাম কিছুটা কম। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষকরা। দুর্যোগ কেটে গেলে কৃষকরা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে তিনি আশা করছেন।

স্বাআলো/কে