বাগেরহাটে সামাজিক দূরত্ব ভেঙে পড়েছে

জেলা প্রতিনিধি, বাগেরহাট : করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে বাগেরহাট জেলাবাসিকে রক্ষা করতে প্রশাসনের নেয়া সব ধরনের উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে। স্বাস্থ্য বিভাগের দেয়া বিধি মতে ঘরবন্দি থাকা তো দূরের কথা স্বাস্থ্যবিধির অন্যতম শর্ত সামাজিক দূরত্বও মানছেন না কেউ।
ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে গত ২৬ মার্চ থেকে ৪৪ দিন ধরে স্থানীয় প্রশাসন এই জেলার মানুষকে ঘরবন্দি রাখতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু মানুষে মানুষে একাকার হয়ে গেলে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ার আশংকা করছে স্বাস্থ্যবিভাগ। তবে স্থানীয়রা বলছেন করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা বুঝলেও আমরা অর্থের কাছে নিরুপায় হয়ে পড়েছি। তাই বাধ্য হয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঘরের বাইরে আসছি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিন্ম ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ বলছে, দেড় মাসেরও বেশি সময় ধরে কর্মহীন হয়ে পড়ায় আয় রোজগার বন্ধ। প্রতিদিনের আয় দিয়ে চলে আমাদের সংসার। আয় রোজগার না থাকলে সংসার চালাব কি করে। সরকারের দেয়া সহায়তা নিয়ে চলতে আমাদের কষ্ট হচ্ছে। ডাল আর আলুসিদ্ধ দিয়ে কয়দিন খাওয়া যায়। পরিবারের ছেলেমেয়েরা প্রতিদিন একই খাবার খেতে পারছে না। তাদের ভালমন্দ খেতে দিতে না পারায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণে মৃত্যু হতে পারে জেনেও বাধ্য হয়ে রোজগার করতে পথে নামছি।
বাগেরহাট স্বাস্থ্য স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর বাগেরহাট জেলায় তা প্রতিরোধে জেলা প্রশাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগ নানা পদক্ষেপ নেয়। জনসমাগম রোধ, সচেতনতামূলক প্রচারণা, বহিরাগতদের ঠেকাতে চেক পোস্ট করেছে প্রশাসন। যার কারণে এই জেলায় ভাইরাসের সংক্রমণ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। এই জেলায় প্রথম করোনাভাইরাসের উপসর্গের নমুনা সংগ্রহ করা হয় ৫ এপ্রিল। গত ১৫ এপ্রিল ফরিদপুর থেকে বাগেরহাটে ফেরা মসজিদের ইমামের শরীরে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ধরা পড়ে। এটিই ছিল এই জেলার প্রথম করোনা রোগী। এই জেলায় এখন পর্যন্ত শিশুসহ তিনজনের শরীরে সংক্রমণের উপস্থিতি মিলেছে। তারা কেউই বাগেরহাটে বসে করোনায় আক্রান্ত হননি। সবাই জেলার বাইরে থেকে বাড়িতে ফেরেন। আক্রান্তরা সবাই কিন্তু এখন করোনামুক্ত। গত ৫ এপ্রিল থেকে ৬ মে পর্যন্ত এই জেলা থেকে ২৬৯ জনের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ল্যাবে পাঠানো হয়। এরমধ্যে ২৩০টি প্রতিবেদন আমরা হাতে পেয়েছি। তারমধ্যে ৩ জনের পজেটিভ হয়। সম্প্রতি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। প্রতিদিন হুহু করে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। ভাইরাসটি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। যেহেতু এইরোগের প্রতিষেধক নেই তাই এটার রোধে একটাই পথ তাহলো ঘরবন্ধি থাকা। তাই চলতি মে মাসটা স্বাস্থ্যবিধি মেনে বাগেরহাটবাসীকে চলাফেরার অনুরোধ করেন এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।
সচেতন নাগরিক কমিটির সভাপতি অধ্যাপক চৌধুরী আব্দুর রব বলেন, সকাল হলেই রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। শুরুতেই মানুষ ঘরবন্ধি থাকলেও এখন আর কেউ থাকছেনা। হাট বাজার, ব্যাংঙ্কে মানুষের ঘেসাঁঘেসি দেখলে ভয় লাগে মনে হয়, সব স্বাভাবিক হয়ে গেছে। কারও মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাই নেই। সব শ্রেণিপেশার মানুষ ঘরে বেরোতে শুরু করেছেন ফলে জেলায় ভাইরাসের সংক্রমণ ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হচ্ছে। বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শাহীনুজ্জামান বলেন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ রোধে এলাকার মানুষদের ঘরবন্দি রাখতে আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করে যাচ্ছি। কোন ভাবেই এদের ঘরে রাখা যাচ্ছে না। তাদের বারবার সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাফেরা করতে বলা হচ্ছে। গত ৪০ দিনে জেলার বিভিন্ন এলাকায় টহলের সময়ে সামাজিক দূরত্ব মেনে চলাফেরা না করায় অন্তত সহ¯্রাধিক মানুষকে অর্থদন্ড করা হয়েছে।
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মামুনুর রশীদ বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ রোধে জেলাকে করোনামুক্ত রাখতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করি। শুরুতেই ভাইরাস রোধে করণীয় সম্পর্কে নানা সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানো হয়। জেলার আগমণ, বহিরাগমণ বন্ধ করতে সীমান্তে চেক পোস্ট বসানো হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় ছাড়া শহর, উপজেলা ও গ্রাাম গঞ্জের হাটবাজারের দোকানপাট বন্ধ রাখার উদ্যোগ নেয়া হয়। জেলার বড় বড় হাটগুলোতে সামাজিক দুরত্ব মেনে যাতে সবাই কেনাকাটা করতে পারে সেজন্য খোলা স্কুল ও খেলার মাঠে সরিয়ে নেয়া হয়। জেলার মানুষ যাতে ঘরবন্দি থাকে সে জন্য নিন্ম আয়ের মানুষদের নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়। এই পর্যন্ত জেলার এক লাখ ৫ হাজার ৬০০ পরিবারকে খাদ্য সহায়তা এবং নগদ ৬৫ লাখ ৭৩ হাজার দেয়া হয়েছে। ৫ হাজার ২৮ জন শিশুকে শিশু খাদ্যের জন্য ১২ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। জেলাবাসীকে মরণব্যাধি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে রক্ষা করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। সম্প্রতি যেহারে সারাদেশে করোনার রোগী বাড়ছে তাতে আমাদের আরও সতর্ক হওয়া জরুরী। তাই আসুন সবাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে অতিপ্রয়োজন ছাড়া ঘরে থাকি।
স্বাআলো/কে