করোনা ছড়িয়েছেন ধনীরা মরছে গরিবরা!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মেক্সিকোর শিল্পোন্নত শহর, নাইজেরিয়ার উত্তরে এবং ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে গেলে করোনা ভাইরাস থেকে সৃষ্ট কোভিড-১৯ রোগের একটা নতুন নাম খুঁজে পাওয়া যায়। এখানকার বাসিন্দারা কোভিড-১৯-এর নাম দিয়েছেন ‘ধনীদের রোগ’। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরিবরাই। সম্প্রতি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক জানিয়েছেন, ব্রিটেনে ধনী এলাকার চেয়ে দরিদ্র এলাকার মানুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।

কেন ‘ধনীদের রোগ’?

মহামারি সাধারণত সুবিধাবঞ্চিত মানুষকেই আঘাত করে বেশি। কিন্তু অনেক উন্নয়নশীল দেশে করোনা ভাইরাস যারা বহন করে নিয়ে গেছেন তারা উচ্চশ্রেণির নাগরিক। তারা কেউ চীন ভ্রমণ করেছেন, কেউ ইউরোপে পড়ালেখা করেছেন বা কেউ ছুটি কাটাতে ধনী দেশে গিয়েছিলেন। প্রথম দিকে এই ভাইরাস প্রতিবেশীকেই কেবল আক্রান্ত করেছিল। অনেক শ্রমিক শ্রেণি বা গরিব মানুষ মনে করেছিলেন, এই ভাইরাস কেবল ধনীদেরই শরীরে প্রবেশ করে। তাদের স্পর্শ করবে না। আবার এই ভুল ধারণা কিন্তু ধনীদের কাছ থেকেই এসেছে। গত মার্চে মেক্সিকোর পুয়েবলা স্টেটের গভর্নর লুইস মিগুয়েল বারবোসা বলেছিলেন, ‘আপনি ধনী হলে করোনায় আপনার ঝুঁকি আছে আর গরিব হলে নেই। গরিবরা সুরক্ষিত’। কিন্তু এখন স্পষ্ট যে করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়ে দরিদ্র মানুষরা স্বাস্থ্যসেবাও ঠিকমতো পাচ্ছেন না।

ইতিহাসবিদরা বলছেন, সম্ভবত এটাই প্রথম মহামারি, যা ধনী থেকে গরিব সবাইকেই আক্রান্ত করছে। এরই মধ্যে ৩ লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে করোনায় আক্রান্ত হয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের ইস্ট স্ট্রাউডসবার্গ ইউনিভার্সিটির জীববিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক এবং ‘মহামারির ইতিহাস’ বইয়ের লেখক জোশুয়া লুমিস বলেন, একেবারে শুরুতে করোনাকে ধনীদের রোগ হিসেবে মনে করা হতো। কিন্তু সেটা গরিবদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে খুব বেশি সময় নেয়নি।

ভয়ংকর হয় দরিদ্রদের জন্যই

ধনীদের আক্রান্ত না হওয়ার অনেক কারণ। যেমন ভারতে করোনার হানা থেকে বাঁচতে বস্তির পাশে দেওয়াল তৈরি করেছেন তাদের চেয়ে বিত্তশালীরা। যুক্তরাষ্ট্রে ধনীদের জন্য প্রাইভেট জেটে চলার অনুমতি আছে। আবার ধনীরা সারা বছরই সামাজিক দূরত্ব মেনে চলেন। কারণ তাদের কাছে কেউ তেমন একটা যান না। গরিবদের ক্ষেত্রে এর কোনোটাই দেখা যায় না।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে মহামারি কলেরার সময় রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে নিম্নশ্রেণির মানুষদের ঘর থেকে বের হতে দেওয়া হতো না। ১৯৩০-এর দশকে নািসরা টাইফয়েড থেকে বাঁচতে ইহুদিদের এক জায়গায় আটকে রাখা হয়েছিল। কারণ তখন অনেক ইহুদিই মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু করোনা ভাইরাস ধনীদের থেকে আসায় গরিবদের কোথাও লুকিয়ে থাকতে হয়নি। লুমিস বলেন, ধনীরা সবসময়ই রোগ থেকে রক্ষা পেতে গরিবদের ওপর দেওয়াল তুলে দিয়েছেন। গরিবদের হাতে মহামারির সময় ক্ষমতা ছিল এমন ইতিহাস নেই বলে জানান লুমিস। ১৯১৮ সালে ইনফ্লুয়েঞ্জাও এসেছিল ধনীদের থেকে। এজন্য মার্কিন সৈন্যদের দায়ী করা হয়েছিল। বলা হতো, ভ্রমণকারীরা নয়, আমেরিকান সৈন্যরা এই ভাইরাস ইউরোপে ছড়িয়েছে। যক্ষ্মাকেও ধনীদের রোগ মনে করা হতো। কারণ ঐ সময় অনেক রোমান লেখক ও শিল্পী এতে মারা যান। পরে দেখা যায়, এটা গরিবদের তথা শ্রমিক শ্রেণির জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠেছে।

এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। সম্প্রতি জাতিসংঘ জানিয়েছে, বিশ্বে ৩ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধনীরা হয়তো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। কিন্তু দরিদ্র মানুষগুলোর আয় একেবারে বন্ধ হওয়ায় আরো দরিদ্র হবেন। ধনীরা বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পেলেও গরিবদের ঘরেই আটকা থাকতে হয়।

গরিবদের মধ্যে প্রথম কবে আসে করোনা

চীনের উহানে প্রথম ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হয়। বিমানের বাণিজ্যিক ফ্লাইটের মাধ্যমে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, থাইল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে আসে। এরপর তা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ভারতে জানুয়ারির শেষ দিকে মধ্যবিত্ত পরিবারের এক শিক্ষার্থীর শরীরে প্রথম করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়, যিনি উহানে পড়তে গিয়েছিলেন। আবার ভারতেই প্রথম কোনো গরিবের শরীরে করোনার সংক্রমণ ঘটে। মধ্য মার্চে মুম্বাইয়ে ৬৮ বছর বয়সি এক পরিচারিকার পরীক্ষায় করোনা পজিটিভ আসে। চিকিত্সকরা জানিয়েছেন, গৃহকর্তার মাধ্যমেই ঐ পরিচারিকা আক্রান্ত হন। কারণ ঐ গৃহকর্তা যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরেন ঐ সময়।

তথ্যসূত্র : লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস

স্বাআলো/এসএ