শতবর্ষী আবদুল হকের সাথে তরুণরাও হেঁটে পারে না

 শাহাদত হোসেন কাবিল : যশোর-বেনাপোল সড়কে যারা চলাচল করেন তাদের কেউ না কেউ শতবর্ষী এক বৃদ্ধকে এই সড়কে হাঁটতে দেখেছেন। যদি কেউ এই সড়কে তাঁর পেছনে হাঁটেন তাহলে শত চেষ্টা করেও তাঁর সাথে পারবেন না। তরুণরাও তাঁর সাথে হেঁটে পারে না। তিনি হাঁটেন দ্রুত গতিতে।

বৃদ্ধের নাম আবদুল হক। বাড়ি বেনাপোল সড়কের পাশেই। যশোর শহরের দিকে যেতে যেখানে ঝিকরগাছা উপজেলার  শেষ এবং যশোর সদর উপজেলার শুরু ঠিক সেই জায়গাটিতে তার বাড়ি। গাজীর দরগাহ মাদরাসা ও দরগাহ ফিলিং স্টেশনের মাঝখান দিয়ে ডান হাতে একটি পথ  নেমে গেছে। ওই পথ ধরে ক’পা এগোলেই বাড়িটির অবস্থান। গ্রামের নাম মল্লিকপুর। তবে গাজীর দরগাহ বলে পরিচিত। ঝিকরগাছা উপজেলার অন্তর্ভুক্ত গ্রামটি। এখানে তিনি আছেন ৮০ বছর ধরে।

আবদুল হকের বয়স ১১০ বছর। তিনি জানান, ১৯১০ সালে ঝালকাটি জেলার কাউখালী উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম আবুল অভিরাল এবং মার নাম কালফোন্নেছা। তিনি পড়াশুনা করেন কওমি মাদরাসায়। পড়েন কারিয়ানা।

গাজীর দরগাহ ফয়জাবাদ ফাজিল মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মফিজুর রহমানের (পীর সাহেব) আহ্বানে তিনি ১৯৪০ সালের দিকে এখানে আসেন। মাদরাসার কাজে পীর সাহেবের সাথে ছিলেন সর্বক্ষণ।

আবদুল হককে কাছ থেকে যারা দেখেছেন তারা কেউ কোনো দিন তাকে মারাত্মক রোগে ভুগতে দেখেননি। শুধু তাই নয়, ৫০ বছর আগেও তাঁকে যেমন দেখেছেন এখনো যেন তেমনটাই আছেন।

গাজীর দরগাহ মাদরাসার ছাত্র ঝিকরগাছা উপজেলার শ্রীরামপুর সিদ্দিকীয়া আলিম মাদরাসার অধ্যক্ষ মাওলানা আবদুর রাজ্জাক বলেন, আমি ১৯৮৬ সালে কামিল পাস করি। এর আগে দাখিল ও আলিম পড়েছি ওই মাদরাসায়। সে সময় শ্রদ্ধেয় আবদুল হককে যেমন দেখেছি প্রায় ৪৫ বছর পেরিয়ে এসেও তাকে যেন তেমনই দেখছি। এমনটাই বললেন ঝিকরগাছা উপজেলার টাওরা আজিজুর রহমান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আবদুল আলিম।

আবদুল হকের হাঁটার ঘটনা কিংবদন্তীর ঘটনার মতো। তাঁর বড় ছেলে মাওলানা আবদুর রব যশোর সেনা নিবাসের একটি মসজিদে ইমামতি করেন। ছেলের সাথে দেখা করতে তিনি প্রায় ১০ কিলোমিটার পথ হেঁটেই পাড়ি দিতেন। ১১০ বছর বয়সেও তিনি দ্রুত গতিতে হাঁটেন। আগের মতো এখনো কোনো তরুণ তার সাথে হেঁটে পারেন না। তাঁর দৃষ্টিশক্তি পূর্ণমাত্রায় ভালো বলতে হবে। পড়া বাদে কোনো কাজে তার চশমা লাগে না। শ্রবণ শক্তিও ভালো ছিল। তিনি জানান, অল্প দিন হলো কানে তালা লাগছে।

আবদুল হক বিশ্বযুদ্ধ, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধসহ এই দীর্ঘ সময়ের সব ঘটনার জীবন্ত ইতিহাস। আগে সব কিছু বর্ণনা করতে পারতেন। বয়সের ভারে এখন অনেকটা স্মৃতি বিভ্রাট ঘটায় আর বলতে পারেন না।

আবদুল হক বিয়ে করেন যশোরের শার্শা উপজেলা শহরে হায়াতুন্নেছাকে। স্ত্রী মারা গেছেন ২৫-৩০ বছর আগে। তিনি চার ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। ছেলেরা হলেন, মাওলানা আবদুর রব, আবদুস সালাম, আবদুল ওহাব ও মিলন এবং মেয়েরা হলেন জাহানারা খাতুন, মনোয়ারা খাতুন ও শাহানারা খাতুন। তাদের ঘরে ২২ জন সন্তান আছে। তাদেরও সন্তানাদি হয়ে প্রজন্ম বেশ ভারী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি এখন থাকেন ছোট মেয়ে-জামাই শাহানারা খাতুন-আবদুল কুদ্দুসের সাথে।

রোগ, শোক, জ্বরা, ব্যাধির এ ধরণীতে আবদুল হকের সুস্থতা মহান আল্লাহর এক অপূর্ব নেয়ামত বলে তিনি মনে করেন। তিনি বর্তমান প্রজন্মের উদ্দেশ্যে বলেন, সব কাজে মহান আল্লাহর ওপর আস্থা ও সততা আঁকড়ে থাকতে হবে। ভালো মন্দ সব কিছু তাঁর হাতে।

স্বাআলো/কে