করোনায় থমকে গেছে জাকিরের হাঁস খামার, বেকার কয়েকশ’ শ্রমিক

মফিজ জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা : বিন্দু থেকে গড়ে তুলেছেন বৃত্ত। বাস্তব জীবনে এর প্রমান দেখিয়েছেন চুয়াডাঙ্গার কুলপালা গ্রামের জাকির হোসেন। ১২৬ টি হাঁস দিয়ে ব্যবসার যাত্রা শুরু। এখন তিনি মিক্সড এগ্রো হ্যাচারী নামে বিশাল প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তার খামারের ৩০ হাজার হাঁস দৈনিক ১৮-২০ হাজার ডিম দেয়। আর হ্যাচারি থেকে মাসে ৫ লাখ হাঁসের বাচ্চা ফুটানো হয়। বৈশিক মহামারি করোনার প্রভাব পড়েছে খামারটিতে। উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করতে না পারায় খামারের কয়েকশ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছে। তবে লকডাউন কিছুটা শিথীল হওয়ায় স্থানীয় প্রাণীসম্পদ অধিদফতরের সহযোগিতায় আবার তারা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

২০০২ সালে জাকির যখন চুয়াডাঙ্গা সরকারি কলেজে একাদশ শ্রেনীতে পড়ত তখন লেখাপড়ার খরচ যোগাতে বাবার উপর চাপ কমাতে তিনি কিছু একটা করার কথা ভাবতে থাকেন। সেই ভাবনা থেকে পাশ্ববর্তী রুইতনপুর গ্রামে হাঁসের খামার দেখতে যান। সেখান থেকে হাঁস পালনে তার আগ্রহ জন্মে। দেখা করেন প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তার সাথে। তার পরামর্শে জাকির খুলনা আঞ্চলিক হাঁস উৎপাদন খামারে যান। তার নিজের গচ্ছিত ১ হাজার ৬শ টাকা দিয়ে ১২৬টি হাঁস কিনে ব্যবসার যাত্রা। এরপর তার পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার কুলপালা গ্রামের কৃষক দম্পতি আব্দুর রশিদ মোল্লা ও আজিমুন্নেছার ছেলে জাকির হোসেনের। ৪৮ বিঘা জমির উপর গড়ে তুলেছেন মিক্সড এগ্রো ফার্ম এন্ড হ্যাচারি।

বেইজিং হাঁস ৫ হাজার ও খাঁকি ক্যাম্বেল জাতের হাঁস রয়েছে প্রায় ২৫ হাজার। খামারে হাঁস রাখার জন্য ১৬টি শেড ও হ্যাচারিতে বাচ্চা উৎপাদনের জন্য কয়েক ধরনের মেশিন রয়েছে। এছাড়াও তিনি পুকুরে মাছ চাষ, গরু মোটা তাজাকরণ, মুরগীসহ কয়েক ধরনের পাখি পালন করছেন। তার দেখাদেখি অনেকে হাঁস পালন করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। তার খামারে প্রায় শ্রমিক কাজ করছেন। ৩০ হাজার হাঁস থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৮-২০ হাজার ডিম পাওয়া যায়। এই ডিম থেকে মাসে ৫ লাখ বাচ্চা ফুটানো হয়। যা দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হয়। করোনার কারণে ডিম ও বাচ্চা বিক্রি একদম থেমে যায়। নামমাত্র মূল্যে ডিম বিক্রি হলেও উৎপাদিত হাঁসের বাচ্চা বিক্রি করতে পারেনি। তাই অনেক বাচ্চা মাটিতে পুতে ফেলতে হয়েছে অথবা পুকুরে মাছের খাবারের জন্য ফেলে দেয়া হয়েছে। এতে ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছে খামারটি। তবে লকডাউন শিথীল হওয়ায় একাংশ করে চালু করা হচ্ছে খামারটি।

জাকির এন্ড ব্রাদার্স মিক্সড এগ্রো ফার্ম এন্ড হ্যাচারির ম্যানেজার ইয়াছিন আলি বলেন, হাঁসের খামারে ডিম ও বাচ্চা উৎপাদনের উপযুক্ত সময় মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত। এ সময় দেশে ডিম ও বাচ্চার চাহিদা থাকে অনেক বেশি। আমাদের এখানে গড়ে প্রতি মাসে গড়ে ৫ লাখ বাচ্চা ফুটানো হয়। যা দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হয়। করোনার কারণে ডিম ও বাচ্চা বিক্রি শূণ্য পর্যায়ে নেমে আসে। ২ মাসের বেশি সময় দেশে লকডাউন থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা বিছিন্ন হয়ে পড়ে। পরিবহন সংকটের কারণে চাহিদা মত সরবরাহ করা সম্ভব হয়নি।

খামার মালিক জাকির হোসেন বলেন, ১৮ বছর আমার এ ব্যবসা। প্রতিবছর এখান থেকে লাভ করেছি। ১৬শ টাকা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে এখানে ৪০/৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ রয়েছে। আসলে বিন্দু বিন্দু করে এ সঞ্চয় হয়েছে। করোনার প্রভাবে আমাদের এ মিশ্র খাামার ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

বিশেষ করে হাঁসের বাচ্চা সারা বাংলাদেশে পাঠানো হতো। লকডাউনের কারণে বাচ্চা পাঠানো সম্ভব হয়নি। সেই কারণে ৩০ টাকার বাচ্চা আমাদেরকে ১০ টাকা দামে বিক্রি করতে হয়েছে। অনেক সময় বাচ্চা বিক্রি করতে না পারায় মাছের খাবারের জন্য পুকুরে ফেলে দিতে হয়েছে। প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তাদের সহযোগীতায় কয়েকদিন আগে আমরা আবার খামারটি চালু করেছি।

জেলা প্রাণী সম্পদ কর্মকতা মোস্তফা কামাল বলেন, জাকিরের খামারে মাসে ৪ লাখের উপরে হাঁসের বাচ্চা তৈরী হয়। তার প্রায় ৪শ সাইকেল পাটি আছে। তারা শুধু চুয়াডাঙ্গায় নই মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, যশোর, মাগুরাসহ বিভিন্ন জেলায় এই হাঁসের বাচ্চা সরবরাহ করে। তবে বৈশিক মহামারির কারণে তার খামারটি লোকসাসের মুখে পড়েছে। সে যাতে ঘুরে দাড়াতে পারে সেইজন্য তাকে সাড়ে ৪ পার্সেন্ট সুদে লোন দেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।

স্বাআলো/এসএ