সাইকেলে চেপে সুমনের ফুটবল একাডেমিতে যশোরের রায়হান

1

নাজমুস সাকিব আকাশ, বাঘারপাড়া (যশোর) : ছোট থেকেই ফুটবল খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন রায়হানের। কখনও দিনমজুর আবার কখনও শ্রমিকের কাজ করে চলতে থাকে তার সংগ্রামী জীবন। আর্থিক টানাপোড়ার কারণে বিভিন্ন জেলায় সাইকেল চালিয়েই খেলা করতে যায়। তবে এবার সে অবিশ্বাস্য একটি কাজ করেছে। কাউকে কিছু না জানিয়ে ফুটবলের নেশায় চারদিন প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ব্যারিস্টার সুমনের ফুটবল একাডেমিতে গিয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি। এ বিষয়ে ব্যারিস্টার সুমন তার নিজস্ব ফেসবুক পেজে লাইভে এসে সুমনের পরিচয় প্রকাশ করেছেন।

যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার ভদ্রডাঙ্গা গ্রামের আব্দুর সাত্তারের ছেলে রায়হান। তার বয়স ১৫ বছর। সে সিলুমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জেএসসি পাশ করে বাঘারপাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ৯ম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। রায়হানের পিতা একজন শ্রমিক। বর্তমানে বাঘারপাড়া-কালীগঞ্জ মহাসড়ক সংস্কারে শ্রমিকের কাজ করছেন।

ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের সাবেক প্রসিকিউটর। দেশের সবার কাছে তিনি ‘ব্যারিস্টার সুমন’ নামে পরিচিত। তিনি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার পীরবাজার এলাকার বাসিন্দা।

এলাকাবাসী জানান, এর আগেও রায়হান যশোর, নড়াইল, মাগুরা ও সাতক্ষীরাসহ বেশ কয়েকটি জেলায় সাইকেল চালিয়ে খেলা করতে গিয়েছিল। সে পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায় বেশী মনযোগী। তবে ফুটবল তার সবচেয়ে পছন্দের খেলা। প্রতিদিন স্কুল শেষে বাড়ি ফিরে সাইকেল চালিয়ে যশোর শহর সংলগ্ন হামিদপুরে শামসুল হুদা ফুটবল একাডেমিতে প্রশিক্ষণ করতে যায়। উপজেলা ভিত্তিক স্কুলের ফুটবল খেলায় অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করে দলকে বেশ ক’বার বিভাগীয় পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। টাকার দরকার হলেই রায়হান শ্রমিকের কাজ করে। কিছুদিন আগে বাঘারপাড়া-কালীগঞ্জ মহাসড়ক সংস্কার কাজে পানির ট্রাকে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছে। হবিগঞ্জ যাওয়ার দু’দিন আগে স্থানীয় এক সব্জি ক্ষেতে শ্রমিকের কাজ করেছে। এই টাকা নিয়েই সে ব্যারিস্টার সুমনের ক্লাবের উদ্দেশ্যে বের হয়েছিল।

রায়হানের মামা ফয়সাল আহমেদ জানান, গত ২০ জুন থেকে রায়হানের মা ও বাবা তার বোনকে নিয়ে হাসপাতালে ছিল। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কাউকে না বলে ২৩ জুন বাড়ি থেকে চলে যায়। খোঁজাখুজির পর তাকে না পেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সে (রায়হান) জানায়, ‘আমাকে খোঁজার দরকার নেই মামা, আমি ভালো আছি’ বলে ফোনের লাইন কেটে দেয়। পরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ব্যারিস্টার সুমনের পেজে তার সাইকেল চালিয়ে যাওয়ার ঘটনা প্রকাশ করা হয়। সেখান থেকে নিশ্চিত হয়েছি রায়হান হবিগঞ্জে ব্যারিস্টার সুমনের ফুটবল একাডেমিতে খেলতে গিয়েছে। বর্তমান সে ওই একাডেমিতে খেলছে।

রায়হানের পিতা আব্দুর সাত্তার বলেন, রায়হান ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলতে খুব ভালোবাসে। তাকে ভালো ফুটবল খেলোয়াড় ইচ্ছে থাকলেও আমার সে সামর্থ্য নেই। এখন সে নিজের প্রতিভা ও যোগ্যতায় এগিয়ে যেতে পারে এই দোয়া করি। রায়হানের মামার মাধ্যমে জানতে পেরেছি সে ব্যারিস্টার সুমনের ফুটবল ক্লাবে খেলছে এবং বর্তমানে সেখানেই আছে।

এ বিষয়ে মুঠোফোনে রায়হান বলেন, ফেসবুকে ব্যারিস্টার সুমনের ফুটবল একাডেমি খোলার একটি পোষ্ট দেখতে পাই। সেখান থেকে স্বপ্ন জাগে তার একাডেমিতে খেলার। বাড়িতে বললে হবিগঞ্জে আসতে দেবে না। তাই কাউকে না বলেই চলে এসেছি। স্বপ্ন আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আমি একজন সৎ দক্ষ ফুটবল খেলোয়াড় হতে চাই।

সাইকেলে চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে রায়হান বলেন, আর্থিক সমস্যার জন্য সাইকেল চালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি। হবিগঞ্জ আসতে চার দিন সময় লেগেছে। রাত-দিন সমান করে সাইকেল চালিয়েছি। বাড়িতে থাকাকালীন শ্রমিকের কাজ করে জমানো ৬০০ টাকা, একটি টর্চ লাইট, পাওয়ার ব্যাংক, এ্যানড্রোয়েড ফোনসহ একটি ব্যাগ নিয়ে এসেছি। সুমন স্যার খুবই ভালো একজন মানুষ। তার জন্য সবাই দোয়া করবেন। আমার মত অনেক ফুটবল খেলোয়াড় এখানে খেলতে এসেছে। তদের সকল দ্বায়িত্ব নিয়েছেন তিনি।

বাঘারপাড়ার সিলুমপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল ইসলাম জানান, পড়াশোনার পাশাপাশি ফুটবল খেলায় বেশী মনযোগী রায়হান। অত্যন্ত ভালো ছেলে। স্কুলের খেলায় বিভাগীয় পর্যায় পর্যন্ত নিয়ে গেছে। শুনেছি রায়হান বর্তমান ব্যারিস্টার সুমনের ক্লাবে খেলছেন। এখন রায়হান পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে দেশের ফুটবল অঙ্গনে সম্পদ হয়ে উঠতে পারে এই দোয়া করি।

জানতে চাইলে মুঠোফোনে ব্যারিস্টার সুমন ফুটবল একাডেমি’র পরিচালক সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন বলেন, রায়হান যশোর থেকে সাইকেল চালিয়ে আমার একাডেমিতে খেলতে আসায় আমি অনেক কৃতজ্ঞ। বিষয়টি নিয়ে হতবাক হয়েছি। শুনেছি রায়হান দরিদ্র ঘরের সন্তান।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হবিগঞ্জের লোকজন সর্বদা অতিথি পরায়ণ। আমি রায়হানের খাওয়া ও আবাসনের ব্যবস্থা করেছি। যে স্বপ্ন নিয়ে রায়হান এখানে এসেছে তা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। আমাদের এখন প্রশিক্ষণ চলছে। সে অনেকের তুলনায় ভালো খেলছে। এখন যদি সে ভালো পারফর্ম করতে পারে তাহলে সে অনেক দূর এগিয়ে যাবে।

স্বাআলো/এসএ