মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে যা বললেন রায়হান

মালয়েশিয়ায় পুলিশের রিমান্ডে ২৭ দিন একই জামাকাপড়ে কেটেছে রায়হান কবিরের। হাতকড়া পরিয়েই পুলিশ তাঁকে মালয়েশিয়ার বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন অতিক্রম করায়। এ সময় এক বাঙালি রায়হানকে একটা শার্ট এনে দিলে গায়ের ময়লা জামাটি পরিবর্তন করে নেন তিনি। মালয়েশিয়ায় পুলিশ তাঁর সঙ্গে ভালো আচরণ করলেও দিনগুলো কেটেছে মানসিক চাপের মধ্যে। তবে তাঁকে যে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে, বিমানবন্দরে আসার আগ পর্যন্ত জানতেন না রায়হান।

প্রবাসী শ্রমিকদের নিয়ে আলজাজিরাকে সাক্ষাৎকার দেয়া রায়হান মালয়েশিয়া থেকে দেশে পরিবারের কাছে ফিরে গণমাধ্যমে এ কথাগুলো জানান। এর আগে শনিবার ভোরে নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার শাহি মসজিদ এলাকায় নিজ বাসায় ফেরেন তিনি।

রায়হান জানিয়েছেন, আলজাজিরার সাক্ষাৎকারে মালয়েশিয়া সরকারের বিরুদ্ধে তিনি কিছুই বলেননি। শুধু প্রবাসীদের দুঃখ, কষ্ট ও সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন।

রায়হান বলেন, ‘আপনারা সবাই দেখেছেন, আমি আলজাজিরায় কী বলেছি। বলার মতো তেমন কিছুই বলিনি। শুধু প্রবাসীদের ওপর, আমার দেশের মানুষের ওপর, যেকোনো দেশের মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কারদের প্রতি যে অন্যায় হয়েছে, শুধু সে বিষয়ে বলেছি। হিউম্যান রাইটস বলতে যে ব্যাপারটি আছে, মানুষের সঙ্গে যেভাবে আচরণ করা উচিত, সে ব্যাপারে একজন শিক্ষিত মানুষ হিসেবে আমি আমার মতামত দিয়েছি।’

এ ব্যাপারে রায়হান আরো বলেন, ‘আমি তোমার দেশে (মালয়েশিয়া) কাজ করতে যাই, এর মানে এই নয়, আমি তোমার দেশের গোলাম। তুমি আমার দেশে আসতে পারো, আমি তোমার দেশে যেতে পারি। এটা গিভ অ্যান্ড টেক পলিসি। একুশ শতকে এসে কেউ বলবে না, আমি ওই দেশে কাজ করতে যাই। তার আমাকে প্রয়োজন। সে আমার মেধা, আমার শ্রম কিনে নিচ্ছে এবং এর বিনিময়ে আমি তার কাছ থেকে অর্থ পাচ্ছি। তাই মানুষ হিসেবে সবার প্রতি শ্রদ্ধা থাকা উচিত। যে বিষয়গুলো আমার কাছে খারাপ লেগেছে, আমি অতটুকই তুলে ধরেছি।’

মালয়েশিয়ার পুলিশ ভালো আচরণ করেছে উল্লেখ করে রায়হান কবির বলেন, ‘পুলিশ আমার প্রতি সদয় ছিল। পুলিশ জানত আমি নির্দোষ। জানত যে, এটা কোনো ক্রিমিনাল অফেন্স নয়। তাই পুলিশও আমার প্রতি সদয় ছিল। তারা আমার সঙ্গে খুব সুন্দর ব্যবহার করেছে।’

রায়হান আরো বলেন, ‘আমার ভিডিওবার্তা দেয়ার পেছনে কোনো স্বার্থ লুকায়িত আছে কিনা, পলিটিকাল ইনফ্লুয়েন্স আছে কিনা, তারা এটাই তদন্ত করার চেষ্টা করেছে। যেহেতু তারা কিছু খুঁজে পায়নি, তাই আমার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করতে পারেনি। শুধু তদন্ত করার জন্য তারা আমাকে গ্রেফতার করে।’

বাংলাদেশের জনগণসহ যারা পাশে ছিল, সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন রায়হান। তিনি বলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। সেইসঙ্গে মালয়েশিয়ান এমবাসিকেও ধন্যবাদ জানাতে চাই। বিশেষ করে ধন্যবাদ জানাতে চাই বাংলাদেশের জনগণকে, যারা আমার পাশে ছিল। এ ছাড়া পুরো বিশ্ব আমার পাশে ছিল, সব প্রবাসী পাশে ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন আইনজীবী, আন্তর্জাতিক মিডিয়া, এনজিও—এমন কোনো এনজিও নাই যে, এ ক্ষেত্রে আমার পাশে দাঁড়ায়নি। সবাই প্রচণ্ড পরিমাণে আমাকে সাপোর্ট দিয়েছে, ওই দেশের মানুষও, বাংলাদেশের মানুষও। সবার প্রতিই আমি কৃতজ্ঞ।’

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে রায়হান বলেন, ‘আপাতত মানসিক শান্তি প্রয়োজন। এখন কিছু ভাবছি না। পরে চিন্তা করব, কী করা যায়। যোগ্যতা আছে, মেধা আছে, কিছু একটা হয়ে যাবে।’

এদিকে, কয়েক দিন পর সংবাদ সম্মেলন করে মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের বাস্তব জীবন এবং নিজের রিমান্ডের বিষয়ে কথা বলার ইচ্ছে প্রকাশ করেছেন রায়হান কবির।

এর আগে গত বুধবার রায়হানের আইনজীবী সুমিথা শান্তিনি কিশনা বলেন, রায়হানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দায়ের করা হবে না বলে অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। গত ৮ জুলাই রায়হানের ওয়ার্ক পারমিট বাতিল করা হয়। পরে গত ২৪ জুলাই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়।

গত ৩ জুলাই আলজাজিরায় প্রচারিত ‘১০১ ইস্ট’ অনুষ্ঠানে ‘লকড আপ ইন মালয়েশিয়াস লকডাউন’ শিরোনামে ২৫ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের একটি প্রতিবেদন প্রচারিত হয়। এতে করোনাভাইরাস মহামারিতে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের সঙ্গে সরকারের আচরণ নিয়ে কথা বলেছিলেন রায়হান কবির।

আলজাজিরার ওই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, মহামারির সময়ে মালয়েশিয়া সরকার মুভমেন্ট কন্ট্রোল অর্ডারের (এমসিও) মাধ্যমে অভিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। অভিবাসীদের প্রতি মালয়েশিয়ার নিপীড়নের ছবিটা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও গভীর উদ্বেগের।

সংবাদমাধ্যমটির ইউটিউব চ্যানেলে প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর থেকে সমালোচনা শুরু হয়। দেশটির সরকার এমন অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে। গত ২৪ জুলাই সন্ধ্যায় রায়হানকে গ্রেফতার করা হয়। গত ২৫ জুলাই তাঁকে ১৪ দিনের এবং পরে আবার নতুন করে ১৩ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়।

স্বাআলো/এসএ