পাল্টে যাচ্ছে আমতলীর মানচিত্র!

বরগুনা: বরগুনার আমতলীর পায়রা (বুড়িশ্বর) নদীর অব্যাহত ভাঙনে নতুন করে পৌরসভা ও তিনটি ইউনিয়নের গুরত্বপূর্ণ স্থাপনা নিশ্চিহ্ন হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এতে প্রায় দুই সহা¯্রাধিক পরিবার হুমকির মুখে পড়েছে। ফলে এসব মানুষের চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে। পাল্টে যাচ্ছে আমতলীর মানচিত্র।

আমতলী উপজেলার পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন, আপড়পাংগাশিয়া, চাওড়া ও গুলিশাখালী ইউনিয়নের কোল ঘেষে পায়রা নদী প্রবাহিত। ১৯৯৮ সালে আমতলী পৌর শহরকে পায়রা নদীর ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় ‘শহর রক্ষা বাঁধ’ প্রকল্পের অধীনে পাউবোর অফিস থেকে ফেরিঘাট পর্যন্ত ১২০০ মিটার সিসি ব্লক স্থাপন করা হয়। ওই সময় নিম্নমানের কাজ করায় অল্প দিনের মধ্যেই ব্লকগুলো সরে যেতে থাকে। ২০১৪ সালে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ও ‘সিডর’ প্রকল্পের আওতায় বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ড ক্ষতিগ্রস্থ এই ১২০০ মিটার সিসি ব্লক মেরামতের কাজ অন্তর্ভুক্ত করেন। সে সময় ‘এমবিইএল’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিসি ব্লক সংস্কারের কার্যাদেশ পায়। এ প্রতিষ্ঠান ১১৫ মিটার সিসি ব্লক সংস্কার করে অবশিষ্ট কাজ ফেলে রেখে চলে যায়। গত ২২ বছর পরে সম্প্রতি সরে যাওয়া সিসি ব্লকের বেশ কয়েকটি স্থানে সংস্কারের কাজ করা হলেও সিসি ব্লকের অধিকাংশ স্থান পায়রার ভাঙনে নদীতে বিলীন হওয়ার পথে।

এছাড়া ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, মহাসেন, রোয়ানু, বুলবুল ও আম্ফানের প্রভাবে ও নদীর ¯্রােতের তোরে সিসি ব্লকগুলো সরে গিয়ে পৌর শহর সংলগ্ন ফেরিঘাট, স্লুইসগেট, লঞ্চঘাট, কাঠপট্টি, শ্মশানঘাট ও পানি উন্নয়ন বোর্ড এলাকার সহস্রাধিক বাড়িঘর পায়রা নদীতে বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্ধা আবু জাফর, জালাল মিয়া, আবু হানিফ পায়রা নদীর ভাঙন থেকে আমতলী পৌরশহরকে রক্ষায় দ্রুত শহর রক্ষা বাঁধের সরে যাওয়া সিসি ব্লকগুলো সংস্কারের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান।
আমতলী পৌর মেয়র মতিয়ার রহমান বলেন, পায়রা নদীর ভাঙনে প্রতিদিনই পৌরশহরের আয়তন ছোট হয়ে আসছে। ক্ষতিগ্রস্থ শহর রক্ষা বাঁধের পুরনো সিসি ব্লকের বেশ কয়েকটি স্থানে সংস্কারের কাজ করা হলেও এখনো বেশ কিছু স্থানে সংস্কার প্রয়োজন। এ শহরকে রক্ষায় পায়রা নদীর তীরে কমপক্ষে তিন কিলোমিটার সিসি ব্লক নির্মাণ করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

অপরদিকে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, একটানা বর্ষণ এবং অমাবশ্যা ও পূর্ণিমার জো’তে পায়রা নদীতে জোয়ারে পানি বৃদ্ধি পেয়ে পৌর শহরের ওয়াবদা, লোচা ও নয়াভেঙ্গলী এবং উপজেলার বৈঠাকাটা, পশ্চিম ঘটখালী, গুলিশাখালী বাজার, নাইয়াপাড়া, আঙ্গুলকাটা, পশ্চিম আমতলী, আড়পাঙ্গাশিয়া, বালিয়াতলী, পশুরবুনিয়া এলাকায় ভাঙনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে। দিন দিন অব্যাহত ভাঙনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন এ এলাকায় বসবাসরত দুই সহা¯্রাধিক পরিবার। সবচেয়ে বেশী ভাঙগের মুখে পড়েছে চাওড়া ইউনিয়নের বৈঠাকাটা এবং আড়পাংগাশিয়া ইউনিয়নের বালিয়াতলী ও পশুরবুনিয়া এলাকা।

ইতিমধ্যে নদী ভাঙনে বৈঠাকাটা গ্রামের বৈঠাকাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, কুয়েত সরকারের অর্থায়নে নির্মিত জামে মসজিদ, শতাধিক বতসবাড়ি, কয়েকশত একর ফসলী জমি ও গাছপালা পায়রা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। তেমনি বালিয়াতলী ও পশুরবুনিয়া এলাকায় কয়েক হাজার ফসলী জমি, শতাধিক পরিবারের বাড়ীঘর, গাছপালা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। নদীতে ভেঙ্গে বিলীন হয়ে গেছে পশুরবুনিয়া লঞ্চঘাট সংলগ্ন বাজারটিও।

বর্তমানে এ দুটি এলাকার ভেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ায় প্রায় ৪০/৪৫টি পরিবার প্রতিদিন দুই বার জোয়ারের পানিতে ভেসে মানবেতর জীবন যাপন করছে। এসকল পরিবার গুলোর ফসলী জমি পায়রা নদীতে বিলীন হয়ে যাওয়ায় নতুন করে কোথাও গিয়ে যে বাড়িঘর তৈরি করবে সে রকম কোন অবস্থা নেই। বর্তমানে এ সকল পবিরারগুলো মানবেতর জীবনযাপন করছে।

বর্তমানে ঝুঁকিতে রয়েছে আড়পাংগাশিয়া ইউনিয়নের বালিয়াতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাদের মেম্বার বাড়ীর জামে মসজিদসহ ৪০টি হতদরিদ্র পরিবার ও চাওড়া ইউনিয়নের পশ্চিম ঘটখালী আবাসনসহ দুই শতাধিক বসতবাড়ী এবং গুলিশাখালী ইউনিয়নের গুলিশাখালী বাজার, আঙ্গুগুলকাটা ও নাইয়াপাড়ার প্রায় আড়াইশত পরিবার।

ভাঙনকবলিত বৈঠাকাটা গ্রামের বাসিন্দা নজরুল আকন বলেন, আমার বসতবাড়ী ছাড়া আমার পরিবারের অন্য সকলের বসতবাড়ী জমিজমা পায়রা নদীর ভাঙ্গনে বিলীন হয়ে গেছে। আমি বর্তমানে ঝুঁকি নিয়ে এখানে পরিবার পরিজন নিয়ে এখানে বসবাস করছি।

বালিয়াতলী ভাঙনকবলিত এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা এ এলাকার ৪০টি পরিবার অরক্ষিত অবস্থায় আছি। প্রতিদিন দুইবার পায়রা নদীর জোয়ারের পানিতে ভাসছি। আমাদের পৈতৃকসূত্রে পাওয়া সকল জমিজমা এই রাক্ষুসে পায়রা নদী কেড়ে নিয়ে গেছে। কোথাও গিয়ে যে নতুন করে বাড়ীঘর নির্মাণ করে পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করবো সে রকম অবস্থা এখন আর আমাদের নেই।

ভাঙনকবলিত এলাকার অপর বাসিন্দা শানু তালুকদারের স্ত্রী খাদিজা বেগম বলেন, পায়রা নদী থেকে ২০ ফুট দূরে আমার বসতবাড়ীর অবস্থান। প্রতিদিন দুইবার জোয়ারের পানিতে আমাদের বাড়ীঘরে পানি উঠে তলিয়ে যায়। তাই বাধ্যহয়ে উচু স্থানে ও স্কুলের দোতলায় পরিবার পরিজন নিয়ে অবস্থান করে মানবেতর জীবনযাপন করছি। জোয়ারের পানি নেমে গেলে আবার বাড়ীতে ফিরে আসি।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিরা পারভীন বলেন, পায়রা নদীর ভাঙন সর্ম্পকে ইতোমধ্যে আমি পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানিয়েছি। তাদের ভাঙ্গনরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলেছি।

বরগুনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী কায়সার আলম মুঠোফোনে বলেন, পায়রা (বুড়িশ্বর) নদীর ভাঙ্গনকবলিত এলাকা সম্পর্কে ডিজাইন করে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করে একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পেলে ভাঙ্গনরোধে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হবে।

স্বাআলো/ডিএম