খুলনা-মোংলা রেললাইন  জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপুরণ নিয়ে দুর্নীতি

আজাদুল হক :  প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প বাগেরহাটের খুলনা-মোংলা রেল লাইন নির্মানে জমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপুরণ পেতে নানা হয়রানির শিকার হচ্ছে জমি মালিকরা। অভিযোগ উঠেছে জমি অধিগ্রহণ ও জমিতে থাকা গাছপালা ও স্থাপনা  নিরুপণে দায়িত্বে থাকা সার্ভেয়ার ও লোকাল দালালসহ সংশ্লিষ্ট দফতরের অসাধু কর্তা ব্যক্তিরা এখান থেকে সরকারি অর্থ লুটপাটে মরিয়া হয়ে উঠেছে।

২০১৫-১৬ অর্থ বছরে বাগেরহাট জেলা প্রশাসকের এলএ ১ নং কেসের মাধ্যমে রেল লাইন নির্মাণের জন্য ওই এলাকার জমি অধিগ্রহণ করা হয়। এরপর জমি মালিকদের  নিকট থেকে নানা অজুহাতে ঘুষ গ্রহণের মাধ্যমে অধিগ্রহনের বরাদ্দ বিতরণ শুরু করে সংশ্লিষ্টরা। উন্নয়ন কাজে জমি দিয়ে আবার অনৈতিক অর্থ দিয়ে  অধিগ্রহণ ও ক্ষতিপুরণে টাকা নিতে অপরগতা প্রকাশ করেন অনেক জমি মালিক। বাগেরহাট জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে এসব জমি মালিকরা  ঘুষ ছাড়া  ক্ষতিপুরণের অর্থ পেতে ২ বছর ধরে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে গত ১ সেপ্টেম্বর খুলনা বিভাগীয় কমিশনার বরাবরে আবেদন করেছেন। ক্ষতিগ্রস্থ ও ভুক্তভোগি  জমি প্রদানকারিরা হলেন, জেলার ফকিরহাট উপজেলার  জাড়িয়া মাইট কুমরার  ই¯্রাফিল সেখ, নিখিল কুমার ঘোষ, শেখ মুজিবর রহমান,  আলমগীর সেখ, বাসারাত মল্লিক ,মোশারফ হোসেন, আজাহার আলী, মজিদা বেগম, পাশর্^বর্তী মাসকাটার শাহিদা বেগম, পিলজংগর সিরাজুল ইসলাম,  রামপাল উপজেলার রনসেন ফয়লা এলাকার গোলাম রসুল, চাকশ্রীর চায়না বেগম গৌরম্ভার ইব্রাহিম ফকিরসহ রামপাল ও ফকিরহাটের অন্য এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ আরো ১৫/২০ জন।

ওই আবেদনে ক্ষতিগ্রস্থ ই¯্রাফিল বলেন, তাদের জমি ও জমিতে থাকা অবকাঠামো ও গাছপালা জরিপে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হয় ২৫ লাখ টাকা। যা বন্ড হিসেবে কালেক্টরেটে জমা রয়েছে। অথচ ১৪ লাখ টাকা দিতে চায় সংশ্লিষ্টরা। যা নিয়ে বাগেরহাট কালেক্টরেটের অসাধু কর্মকর্তাদের সাথে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে।

ইব্রাহিম ফকিরের লিজ নেয়া জায়গার ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে অবকাঠামো ভেঙে দিলেও তার ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি।

রামপাল রনসেনের শেখ গোলাম রসুল বলেন,  রনসেন মৌজায় ৩০ খতিয়ানে ২৭৯ দাগে  তার ১৩.১৩ শতক জমি রেল লাইনের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছে। জরিপে সরকারি হিসাব মতে জমির মুল্য  ৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা ও গাছপালা এবং অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ ধরা হয়েছে ২ লাখ টাকা। একই দাগ খতিয়ানে  অনুরুপ পরিমাণ জমিতে  আসাদুজ্জামান রান্টুর মোট ৫ লাখ ২৫ হাজার  টাকা,  একই মৌজায় ২৪৯ নং দাগে শেখ হাসানুর রহমানের ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা  উত্তোলনের জন্য  বন্ড জমা দেয়া হয় ২০১৭ সালে জুন –জুলাই মাসে। এরপর ৩/৪ মাস পার হলেও তাদের ক্ষতিপুরণ না দিয়ে তালবাহানা করে সার্ভেয়ার কামালসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্যরা।  এক পর্যায়ে তৎকালিন জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলে তিনি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব)  সফিকুল ইসলামের কাছে পাঠান। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক তিনি  পিয়ন দিয়ে আমাদের বলেন সার্ভেয়ার কামালের কাছে যেতে। আমরা সার্ভেযার কামালের কাছে গেলে তিনি ঘুষ ছাড়া আমাদের ক্ষতিপুরনের অর্থ দিবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেয়। দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় এবং সাংবাদিকদের তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করায় জমি মালিক ই¯্রাফিলকে গত বছর ১৭ নভেম্বর মারপিট করে সার্ভেয়ার কামালের ক্যাডাররা। ওই বছরের ২৪ নভেম্বর সকালে খুলনা সোনাডাঙ্গা থানা এলাকায় পেয়ে ফকিরহাট জাড়িয়া মাইটকুমড়া গ্রামের ফেরদৌস শেখকে (৩২) মারপিট করে সার্ভেয়ার কামালের ক্যাডাররা। একটি বেসরকারী টেলিভিশন বাগেরহাটের রেল লাইন নির্মাণে জমি অধিগ্রহণ নিয়ে মহাদুর্নীতি ও লুটপাটের অনুসন্ধ্যানি খবর দুই দফা প্রচার করে। এরপর সার্ভেয়ার কামালসহ ৩ জন সাময়িক বরখাস্থ হন।

আর এ ঘটনার তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়। এখানের এসব অনিয়ম দুর্নীতির বিষয়টি মাথায় নিয়ে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক  মামুনুর রশীদ বলেন, গত বছরের জুন মাসে বাগেরহাটে যোগদানের পর জুলাই মাস থেকে প্রকল্প এলাকার ক্ষতিগ্রস্থ জমি মালিকদের ডিসি অফিসে ডেকে সচ্ছতার মাধ্যমে চেক বিতরণ শুরু করি। আমরা চাই যারা প্রকল্পে জমি দিয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন তারা যেন বারবার অফিসে না আসে এবং আসলেও আমাদের কাউকে ভিজিট না দেয়। গত বছরের নভেম্বর মাস থেকে জমি মালিকদের আর ডিসি অফিসে ডাকছি না। সে সময় থেকে আমরা প্রকল্প এলাকায় গিয়ে  তাদের বাড়িতে  জমির কাগজপত্র যাচাই করে শুনানী করে চেক বিতরণ করছি। দুর্নীতি’র শূন্য নীতিতে আগামীতে সরকারের যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে তাতে ক্ষতিগ্রস্থ জমি মালিকদের ডিসি অফিসে বারবার ঘুরতে হবে না। তারা বাড়িতে বসেই  জানতে পারবেন কবে তারা ক্ষতিপূরণের টাকা পাবেন। আর ওই টাকা তাদের ব্যাংক একাউন্টে পৌছে যাবে।

স্বাআলো/কে