চিকিৎসায় ব্যর্থ হয়ে শিশুটিকে বেঁধেই রাখতে হয়

27

গাইবান্ধা : মানুষের যেন ক্ষতি করতে না পারে এজন্য সবসময় নিরবকে (১০) বেঁধে রাখা হয়। কয়েক বছর ধরে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার পূর্ব কাতলামারী গ্রামের শরিফুল ইসলাম ও নাছরিন বেগম দম্পতির শিশুসন্তান নীরবের (১০) এমনই বন্দি জীবন কাটছে।

বেশি মানুষ দেখলেই নীরবের চোখে-মুখে হিংস্রতা দেখা দেয়। কখনও কামড় দিতে আসে আবার কখনও মাথা দিয়ে আঘাত করতে আসে। সুযোগ পেলেই প্রতিবেশীর ক্ষতি করে। পরিবারের পক্ষ থেকে নীরবের চিকিৎসায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করা হলেও মেলেনি সুস্থতা। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে এখন ছেলের মৃত্যু কামনা করছেন মা নাছরিন বেগম।

২০১০ সালের ১ জানুয়ারি নীরবের জন্ম হয়। জন্মের দুদিন পরই অসুস্থ হয়ে পড়ে নীরব। পায়খানার সঙ্গে রক্ত দেখা যায়। প্রথমে তাকে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালে ও পরে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। এ অবস্থায় নীরবের বাবা ছেলে ও স্ত্রীকে আর নিজ বাড়িতে নিয়ে যাননি। সেই থেকে নীরব নানার বাড়িতেই থাকে।

পরে এক বছর বয়সেও সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না নীরব। এক বছর পর মাটি খুঁড়ে গর্ত করে নীরবকে সারাদিন গর্তে রাখতে শুরু করে পরিবার। যাতে সে হেলে না পড়ে। এভাবে বছর খানেক রাখার পর হাঁটতে শুরু করলেও কথা বলতে পারে না নীরব। ধীরে ধীরে কথা বলতে পারলেও ভালোমন্দ বুঝতে পারে না। যখন যা মন চায় তাই করতে থাকে। শক্ত বস্তুতে নিজের মাথা ঠুকতে থাকে। এভাবে বছর দুই যেতে না যেতেই মানুষের ক্ষতি করা শুরু করে। তখন তাকে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখতে শুরু করে পরিবারের লোকজন। কিন্তু গাছের সঙ্গে এক হাত বা এক পা বেঁধে রাখলে নিজের মাথা গাছের সঙ্গে ঠুকতে থাকে সে। তাই দুই হাত টানা দিয়ে বেঁধে রাখতে হয়।

ঘুমের ওষুধ ছাড়া কখনও রাতে ঘুমায় না নীরব। প্রতিদিন বিকেলে ঘুমের ওষুধ খাওয়ানোর পর রাতে বিছানায় দুই হাত ও দুই পা বেঁধে রাখা হয়। কারণ ঘুম থেকে উঠে সে যেন কারও ওপর আঘাত করতে না পারে।

শিশু নীরবের মা নাছরিন বেগম বলেন, একজন মা কখনও সন্তানের মৃত্যু কামনা করে না। আমি মা হয়ে সন্তানের মৃত্যু কামনা করি। কারণ ছেলেকে সুস্থ করার জন্য অনেক কষ্ট করেছি। খেয়ে না খেয়ে চিকিৎসা চালিয়েছি। এখন আর চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। সংসার চলে না। অভাবের কারণে কখনও কখনও ঠিক মতো পেটে খাবার জোটে না। কীভাবে ছেলের চিকিৎসা খরচ চালাব। ১০ বছর বয়সেও সে বিছানায় পায়খানা-প্রস্রাব করে। আল্লাহর কাছে বলি, হয় আমার মরন দাও, না হয় ছেলের মরন দাও। ছেলের কষ্ট আর সহ্য হয় না।

নীরবের নানা নজরুল ইসলাম বলেন, নীরবকে প্রতিদিন সকালে দুই হাত দড়ি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে রাখতে হয়। কারণ সে যেন গাছের সঙ্গে মাথা ঠুকতে না পারে। এর আগে অনেক বার গাছের সঙ্গে মাথা আঘাত করার তার মাথা ফেটে রক্ত বের হয়েছে। বেঁধে না রাখলে তার সমবয়সী শিশুদের মাথা দিয়ে আঘাত করে সে। অনেক সময় মাথা ব্যথার কারণে সে নিজের মাথায় ইট, পাথর অথবা গাছের সঙ্গে আঘাত করে। আমরা এখন কী করবো ভেবে পাচ্ছি না।

নীরবের নানি সুফিয়া বেগম বলেন, আমাদের সহায়সম্বল যা ছিল সব বিক্রি করে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে নীরবের চিকিৎসা করেছি। এখন কীভাবে চিকিৎসা করাবো জানি না। বিনা চিকিৎসায় শিশুটি মারা যেতে পারে অথবা এই শিশুর হাতে কেউ মরতে পারে। তাকে নিয়ে আমরা সবসময় টেনশনে থাকি।

স্বাআলো/কে