করোনার সংক্রমণ বাড়লেও মাস্ক ব্যবহারে অনীহা, বালাই নেই সামাজিক দূরত্বের

নো মাস্ক, নো এন্ট্রি, নো মাস্ক, নো সার্ভিস’ করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার এ সিদ্ধান্ত জোরালোভাবে কার্যকর করলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারে অনীহা রয়েছে। ব্যাংক, বীমা, সরকারি- বেসরকারি দফতরগুলোতে সেবা পেতে মাস্কের ব্যবহার সাময়িকভাবে দেখা গেলেও রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, পর্যটন স্পটগুলোতে যেমন নেই মাস্কের ব্যবহার। তেমনি বালাই নেই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার। এই পরিস্থিতিতে মাস্কের ব্যবহার বাধ্য করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও সচেতনতা বাড়ানো যাচ্ছে না।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদফতরের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিউট ও রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা মাস্কের ব্যবহার নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত জরিপ পরিচালনা করে। মার্চ থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে পরিচালিত যৌথ জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৪৮ ভাগ মানুষ মাস্ক ব্যবহার করে না। দেশের ৯২ দশমিক ৯০ শতাংশ মানুষ মনে করে এবং বিশ্বাস করে মাস্ক ব্যবহার করলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি কমে। আর বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক অনলাইন জরিপে দেশের ৬৭ শতাংশ মানুষ মাস্ক ব্যবহার না করার চিত্র উঠে এসেছে। সেখানে গরম ও অস্বস্তির কারণ তুলে ধরা হয়েছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার সংক্রমণ এড়াতে মাস্ক ব্যবহার করা জরুরি।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা মাস্ক ব্যবহারের গুরুত্ব উল্লেখ করে বলেছেন, করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।

এদিকে টানা আট মাস পর সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করলেও সম্প্রতি হঠাৎ করেই করোনাভাইরাস আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে গেছে। গত চব্বিশ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়ে ২৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮৪৭ জন।

গত আট মাসে দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মার্চে সংক্রমণ শুরু হয়ে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত টানা প্রায় একই রকম মৃত ও আক্রান্তের হার দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর থেকে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ কিছুটা কমতে শুরু করে। পাশাপাশি মৃত্যুর হারও কমে আসে। তবে শীত মৌসুমকে সামনে রেখে করোনাভাইরাসের আরেকদফা সংক্রমণ শুরুর আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এমন আভাসে সরকার করোনাভাইরাসের এই দ্বিতীয় পর্যায়ের সংক্রমণ ঠেকাতে আগেভাগেই ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছিল। গত অক্টোবরে মন্ত্রিসভা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। জনসাধারণের মধ্যে মাস্কের ব্যবহার বাধ্যতামুলক করার পাশাপাশি সচেতনতা তৈরি করার তাগিদ দেন তিনি। সে অনুযায়ী মন্ত্রিপরিষদের দিক নির্দেশনা অনুযায়ী সরকারের মন্ত্রণালয়, দপ্তরগুলোর পাশপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও সে উদ্যোগ নেয়। মাস্কের ব্যবহার নিশ্চিতের পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ওপরে জোরালো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিচালনা করা হয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। সে আদালত মাস্ক ব্যবহার না করা কিছু ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিক শাস্তি জরিমানাও করে। কিন্তু তারপরেও মানুষের মধ্যে মাস্কের ব্যবহার, স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার নজির নেই।

রাজধানীর শান্তিনগর, হাতিরপুল এবং কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ ক্রেতা- বিক্রেতার মুখে মাস্ক নেই। নেই দূরত্ব বজায় রেখে কেনাকাটা। বিশেষ করে বিক্রেতাদের মুখে মাস্ক ব্যবহার কম দেখা গেছে।

শান্তিনগর বাজারের এক মাছ বিক্রেতার মাস্ক না পরার কারণ জানতে চাইলে বলেন, বাসা থেকে বাজারে যাওয়া আসার সময় ব্যবহার করেন। মুখে মাস্ক নিয়ে কাজ করতে অসুবিধা হয়, সে কারণে মাঝে মধ্যে খুলে রাখেন।

সম্প্রতি কক্সবাজার ট্যুরে গিয়ে দেখা গেছে, সমুদ্র তীরে হাজারো মানুষের ঢল। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সমুদ্র দর্শনে যাওয়া ছোট, বড়, শিশু পর্যটকদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক নেই। গায়ে গায়ে লেপ্টে দাঁড়িয়ে সমুদ্র দর্শন করছেন, সমুদ্রে স্নান করছেন।

একই পরিস্থিতি দেখা গেছে সব ধরনের গণপরিবহনে। রাজধানীতে চলাচল করা বাসগুলোর পাশাপাশি দূরপাল্লার বাসগুলোতেই যাত্রীদের বেশিরভাগের মুখে মাস্ক দেখা যায়নি।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ বলেন, ‘এটি সত্যি যে মাস্কের ব্যবহার এখন অনেকটাই কমে গেছে। তবে বাসগুলোতে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মতো বিআরটিএ, ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ সমন্বিতভাবে তদারক করলে হয়তো কিছুটা সচেতনতা আসত।’

এদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণের বর্তমান পরিস্থিতিতে নমুন পরীক্ষা বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, যত বেশি পরীক্ষা করা হবে ততবেশী সংক্রমণ পরিস্থিতি জানা যাবে। আর তখন ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হবে। আর সময়মত পদক্ষেপ নেয়া গেলে সংক্রমণের হার টেনে ধরা যাবে। যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী চলতি মাসে গড়ে প্রতিদিন ১৫ হাজারের কাছাকাছি নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকারের সব ধরনের প্রস্তুতি সরকারের রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি জানিয়েছেন, আসন্ন শীত মৌসুমে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যাতে না বাড়তে পারে সে জন্য নো মাস্ক, নো সার্ভিস নীতি বাস্তবায়নের নীতি বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। দেশের পয়েন্ট অব এন্ট্রিগুলোতে স্কানিং ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে। বিদেশ ফেরতদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টাইন বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে নেয়া পরিকল্পনা অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। ভ্যাকসিন আমদানির লক্ষ্যে চুক্তি করা হয়েছে।

স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আব্দুল মান্নান বলেন, সারাদেশে ১১৭ টি আরটিপিসিআর মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। আরো বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে। একইসঙ্গে অ্যান্টিজেন টেস্টও দ্রুত শুরু হবে। কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রয়েছে। ভেন্টিলেটরের পাশাপাশি অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। আইসিইউ’র শয্যা বৃদ্ধি করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় দফা সংক্রমণ মোকাবিলায় সরকার প্রস্তুত বলে জানান তিনি।

স্বাআলো/এসএ