জাল ব্যান্ডরোল: প্রতিমাসে কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি

জাল ব্যান্ডরোল

জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহার করে রংপুর বিভাগের ৮ জেলায় বিড়ি বাজারজাত করা হচ্ছে। এতে প্রতিমাসে সরকার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এই দুর্নীতির সাথে কাস্টমস বিভাগের এক শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। এ জন্য তারা প্রতিমাসে বিপুল পরিমাণ মাসোহরা পেয়ে থাকেন এমন অভিযোগ রয়েছে।

সম্প্রতি এই রকম অর্ধকোটি টাকা মূল্যমানের জাল ব্যান্ডরোলের একটি চালান রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ উদ্ধার করলে এ সংক্রান্ত অনেক তথ্য বেরিয়ে আসে। রংপুরের বিভিন্ন অফসেট প্রেসে এ সব ব্যান্ডরোল ছাপানোর কাজ করে থাকে অসাধু বিড়ি ব্যবসায়ীরা।

গত ১৯ নভেম্বর নকল ব্যান্ডরোল তৈরির ছাপাখানা এসকে প্রেস অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ের সন্ধান পায় পুলিশ। সেখানে ছাপানো সোয়া ৫৮ লাখ টাকার নকল ব্যান্ডরোলও উদ্ধার করা হয়। পুলিশ গ্রেফতার করে তৌফিক হাসান তপুসহ ৩ জনকে।

বিড়ি বাজারজাতকরণে আইনের তোয়াক্কা করছেন না বিড়ি কারখানার মালিকরা। জাল ব্যান্ডরোলযুক্ত বিড়ি বিক্রিতে উৎসাহিত করার জন্য দোকানদেরকে দেয়া হচ্ছে নানা উপহার। একারণে দোকানদাররা ভালো মন্দ বিচার না করে ওই বিড়ি বিক্রি করছেন। অভিযোগ রয়েছে মাসোহারা পেয়ে মাঠপর্যায়ের কিছু অসাধু রাজস্ব কর্মকর্তা নকল ব্যান্ডরোল কারবারকে উৎসাহিত করেন।

রাজস্ব বোর্ডের আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ২৫ শলাকার বিড়ির প্যাকেটের ব্যান্ডরোলে মূল্য, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর, সারচার্জ ও স্বাস্থ্যখাত মিলে এক প্যাকেট বিড়ি বাজারজাতকরণে রাজস্ব খাতে ব্যয় হয় ৯ টাকা ৯ পয়সা। আর ২৫ শলাকা বিড়ি তৈরিতে মালিকদের ব্যয় হয় কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ টাকা। সে হিসাব অনুযায়ী ১ প্যাকেট বিড়ি বাজারজাতে খরচ হয় ১৫ থেকে ১৬ টাকা। সরকারিভাবে প্রতি ২৫ শলাকার ১ প্যাকেট বিড়ির দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ টাকা।

রংপুর বিভাগে প্রতিদিন বৈধ অবৈধ মিলে প্রায় ১ কোটি শলাকা বিড়ি বাজারজাত হয়। এর মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ বিড়ি সরকারি রাজস্ব মেনে বাজারজাত করা হয়। বাকি ৭০ ভাগ বিড়িই জাল ও ব্যান্ডরোল ব্যাবহার করে বাজারজাত হয়ে আসছে।

রংপুর বিভাগে স্টার, আকিজ, মাছুম, ভাই ভাই, যমুনা, ফ্রেশ, লাটিম, সেলিম, মোহন ও আসাদ বিড়ি পাওয়া যায়। এ সব বিড়ির প্রায় সবটাতে জাল ব্যান্ডরোল দেখা গেছে।

গংগাচড়া উপজেলার বেতগাড়ী বাজারের ব্যবসায়ী আনছার আলী বলেন, আমি তো নকল, জাল ও ব্যান্ডরোলবিহীন বিড়ি বুঝি না। কম দামে বিড়ি ক্রয় করে ২ থেকে ৩টাকা লাভ করে বিক্রি করি। বিভিন্ন বিড়ির মালিকরা নিয়মিত আমাদের দোকানে তা সরবরাহ করে।

গংগাচড়া বাজারের ব্যবসায়ী ফারুক মিয়া বলেন, প্রতিদিন বিভিন্ন কোম্পানির লোকজন আমার দোকানে আসে, তাদের বিড়ি বিক্রির কথা বলে। আমি যে বিড়ি কমদামে পাই তা বিক্রি করি। আমি তো আর আইন কানুন বুঝিনে। কাউনিয়ার সিংহেরকুড়া বাজারের শরিফুল ইসলামও একই কথা জানান।

বাংলাদেশ বিড়ি মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ও রংপুর জেলা সভাপতি মজিবর রহমান জানান, জাল ব্যান্ডরোল বিড়ি তৈরি বন্ধে আমাদের করনীয় কিছু নেই। আমরা কাস্টমস কর্তৃপক্ষকে বরাবরই এবিষয়ে তাগিদ দিয়ে আসছি, তারা যেন অভিযান চালিয়ে এসব বিড়ি বন্ধ করে দেন।

রংপুর কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট বিভাগীয় কমিশনার ড. শওকত আলী সাদী জানান, গত ৯ মাসে বছরে জাল ব্যান্ডরোল ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে ২ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আয় করা হয়েছে। বর্তমানে যারা আইন অমান্য করছে ও রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

রংপুরের জেলা প্রশাসক আসিফ আহসান জানান, জাল ব্যান্ডোলের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। এ জন্য টাস্কফোর্স টিম গঠন করা হয়েছে। যদি কোন তথ্য পাই সেক্ষেত্রে আমরা সাথে সাথে অভিযান পরিচালনা করি।

স্বাআলো/আরবিএ