লিটন ঘোষ জয়ের সাতটি কবিতা

অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াই

রাতের গভীরে নদীও ভিজে যায় জোছানায়!
আকাশ যেমন ভিজে এককার হয় মেঘবৃষ্টিতে।
রোদও কখনো কখনো ভিজে যায় গোপনে।
তোমার, আমার স্বপ্ন যেভাবে কান্না জলে ভেজে,
তার কতটুকু খোঁজ রাখে গোধূলি সময়!

স্বর্ণলতার মতো আঁষ্ঠেপিষ্ঠে জড়িয়ে থেকে লাভ কি?
এত জাড়ালে অবশেষে দুঃখ নেমে আসে
অনিচ্ছুক সম্পর্ক কতটুকুই বা পোক্ত হয়?
সবপাখি কখনোই নীড়ে ফেরে না!
যার যেখানে গন্তব্য, সেখানে সে একদিন চলে যায়।
জীবন আসলে একটা স্টেশন…
অনেক মানুষের ভীড়, অপেক্ষা তারপর চলে যাচ্ছে।
তবুও মানুষের ওপর বিশ্বাস রাখা ভালো,
তার ওপর আস্থা রাখা আরো ভালো।
কেননা, এটাই জীবন পরিবার, সংসার, সমাজ…
আমরা আসলে সবাই অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াই
কেউ বুঝে! কেউ বা না বুঝে।

 

এটা তোমার ঘ্রাণ

আমি জানি! এটা তোমার ঘ্রাণ…
সেই অতিচেনা প্রিয় রাতদিনের মাখামাখি
যা বুকের অতলে লেপ্টে আছে।
কে বলে তুমি নেই ?
তুমি সারাক্ষণ চারপাশে আছ
নীল জোছনা হয়ে, শ্রাবণ বৃষ্টি, শুভ্র কুয়াশা, নদীর জল তরঙ্গ,
সোনালু ফুল, সোনা ধানের হাসি, জলপাইয়ের সবুজ পাতা, সন্ধ্যার জোনাকি,
কাঠ গোলাপের সাদা, সরষেফুলের হলুদ;
কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম হয়ে, পাখিদের গান হয়ে।

এই যে তোমাকে এত কাছে পাওয়া
একান্ত নিজের করে।
তা তো ভালোবাসাতে সম্ভব।
আমি জানি! তোমার ভালোবাসা আছে প্রকৃতির সবখানে ছড়িয়ে, ছিটিয়ে
যা কোনদিন ফুরাবার নয়।

 

তোর সাথে মাখামাখি

আমার চাওয়া পাওয়া রাতদিন তোর সাথে একাকার
তোকে নিয়ে স্বপ্নের ক্যানভাস।
তোর হাত ধরে আবার বকুল কুঁড়ানো হলুদ বিকেল
ভোরের সোনালি রোদ হয়ে ফিরে এলো।
সংসদ ভবন চত্বরে বৃষ্টির গুড়িগুড়ি…
রাতের নিয়ন আলোয় চন্দ্রিমা উদ্যানে
আবার পা রাখা।
প্রিয় তুই জানিস না! মহাকাল পর আবার
আমি কারো হাত ধরেছি।
ভালোবেসে হারিয়ে গেছি অচিনপুর
তোর সাথে এত মাখামাখি
কেবল এই নিঃস্ব নীল বেদনার জীবনটাকে
ছুঁটি দেব বলে…

এই যে, তোর চোখে চোখ রাখা
অপলক চেয়ে থাকা, তোর কপালের নীলটিপ দেখা
বুকের ভেতর প্রজাপতির মতো এত
বর্ণিল রঙের আবেশ
জানে! ঢাকার শহরেরÑ
প্রতিটা অলি-গলি।
জানে! অরণ্য বিস্তৃত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস
পদ্ম পুকুর, পাখির দল, রঙ্গনফুল এনম কি আইসক্রিম বিক্রেতা
তোর সাথে আমার গোপন প্রেমের মাখামাখি।

 

বৃষ্টি এলে

বৃষ্টি ভেজা বিকেল হাতছানি দেয়
চোখের কোণে জল এসে ভেজায় পাতা
সিক্ত চোখে চেয়ে চেয়ে দেখিÑ তোমার চলে যাওয়া;
ধূসর মেঘে ঢেকে গেছে আমার পৃথিবী।

এত সুমধুর তোমার প্রতিশোধ!
মৃত্যুও তার কাছে হার মানে
তবু হারানো ভালোবাসা টানে।
তা না হলে কি নীল বেদনায় সারারাত পুড়ে যাই…?

 

একদিন সমুদ্র হবো

খুব কাছাকাছি তবুও দেখা হয় না, বহুদিন।
মাত্র পঞ্চাশ কিলো পথ…

ব্যবধান যতটা না মনের, তারচেয়ে বেশি নিষেধের
জোর করে বড়জোড় শরীর বাঁধা যায়, মন নয়।
মনে মনে যা হবার তা হচ্ছে
অবিরাম স্বপ্নের আঁকি-বুঁকি প্রিয় মুখ
কিংবা পুড়তে পুড়তে ছাই, চোখে দেখা যাচ্ছে না।
হয়তো বা একদিন দুরন্ত নদীর আহ্বানে
ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে হাজার হাজার মাইল ব্যবধান
পিচঢালা রাজপথ, নির্জন মেঠোপথ এবং
হৃদয়ের নীল বেদনাগুলো
গদ্য অথবা পদ্য হবে।

তোমার একটু ভালোবাসা পেয়ে, আবার ঘাসফুল ফুটবে
তারপর একদিন তোমার হাত ধরে
এক নিমিষে সমুদ্র হবেই হবে।

 

তুমি নেই

হাতে হাত রেখে পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছি রেললাইনের পথ ধরে
হঠাৎ ট্রেনের হুইসেল…
কু ঝিক ঝিক ঝিক করতে করতে ট্রেন এসে চলে গেল
উড়িয়ে দিয়ে তোমার শাড়ির আঁচল…

তোমার শাড়ির আঁচল যখন প্রজাপতির মতো উড়ছে
তখন হঠাৎ দেখি তুমি নেই!
তোমার ছায়ামুখ বাতাসে ভাসছে।

 

অবিশ্বাস

বিশ্বাস করো! আমার এতটুকু বিশ্বাস নেই।
নিঃশ্বাসও নেই!
যা গেছে তা চিরতরে গেছে…
অবিশ্বাস এখন বেঁচে থাকার শেষ আশ্রয়
বিন্দু বিন্দু করে জামানো সেই বিশ্বাসের ছেলেখেলা, ছেলেবেলা
ফিরে নাই বা আসল!

এখন আমি অবিশ্বাসের রাজকুমার হয়ে গেছি
অন্ধকারের সাথে বসবাস…