যশোরের সেই ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে চাপা দিতে তোড়জোড়

করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ফাঁকে যশোরের মণিরামপুরের পাড়িয়ালি আদর্শ বালিকা দাখিল মাদরাসার ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের খবর প্রকাশে তোলপাড় শুরু হয়েছে। উদ্বেগজনক বিষয়টি তদন্তে মাঠে নেমেছে প্রশাসন।

গত বুধবার সন্ধ্যা ও আজ বৃহস্পতিবার সকালে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা বিষয়টি তদন্তে সরেজমিন যান। তদন্তে ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের খবর মিললেও বিষয়টি ভিন্নখাতে নিতে প্রশাসনিক তোড়জোড় শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

একাধিক সূত্রে অভিযোগ মিলছে, করোনায় মাদরাসাটির ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ২০ ছাত্রীর বাল্য বিয়ের বিষয়টি সঠিক হলেও প্রশাসনিক চাপে মাদরাসার সুপার আব্দুল হালিম বিষয়টি চাপা দেয়ার চেষ্টা করছেন। তিনি প্রকৃত তালিকা না দিয়ে গত কয়েকবছরে বাল্য বিয়ের শিকার ছাত্রীদের তালিকা দিয়েছেন। আর সেটা ধরে তদন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে এই বিষয়ে সুপার সাংবাদিকদের কাছে মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেননা। বিষয়টি নিয়ে অগ্রসর না হতে তিনি সাংবাদিকদের অনুরোধ করেন।

মঙ্গলবার অনলাইন পোর্টালে এবং বুধবার একাধিক পত্রিকায় ‘করোনার বন্ধে এক মাদরাসার ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ে!’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে বুধবার বিকেলে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে আলোচনায় উঠে আসে। এক পর্যায়ে ঘটনাটি তদন্তের জন্য উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশ দেন জেলা প্রশাসক। সে মোতাবেক ইউএনও সৈয়দ জাকির হাসানের নির্দেশে বৃহস্পতিবার জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুল খালেক, উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র সরকার ও উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা মৌসুমি আক্তার বিষয়টি সরেজমিন তদন্তে যান।

জানা গেছে, তদন্তে ২০ ছাত্রীর বাল্য বিয়ের বিষয়টির তথ্য মিলেছে। তবে সেখানে ২০১৭-২০২০ সালের মধ্যে তাদের বিয়ে হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে। আর করোনাকালীন বিয়ে দেখানো হয়েছে সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির চার ছাত্রীর। বিয়ে পড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন কাজী আব্দুর রাজ্জাক ও কাজী রুহুল আমিন। তবে এই বিষয়ে তদন্ত টিম কোন তথ্য জানাতে রাজি হননি।

এদিকে নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, বাল্যবিয়ের সকল দায় মাদরাসার সুপারের ওপর চাপিয়ে কর্তৃপক্ষ তাকে সাময়িক বরখাস্তের সিদ্ধান্তে যাচ্ছেন।

সূত্র বলছে, বাল্যবিয়ে নিরোধে উপজেলা প্রশাসনের বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেটা না হওয়ায় প্রশাসনিক দুর্বলতা বেরিয়ে পড়েছে। আর সেই দুর্বলতা ঢাকতে অবশেষে মাদরাসার সুপারের ওপর দায় চাপানো হচ্ছে।

অভিযোগ উঠছে, সকল দায় সংশ্লিষ্ট মাদরাসার সুপার আব্দুল হালিমের ওপর ফেলে তাকে বিষয়টি অস্বীকার করতে চাপ দেয়া হচ্ছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রমতে, ২০ ছাত্রীর বাল্যবিয়ের খবর প্রকাশের পর বিভ্রান্তিতে পড়েন প্রশাসন। তারা বিষয়টি চেপে যেতে সুপারকে চাপ দিচ্ছেন। ফলে সুপার নিজে বাঁচতে বিয়ে হওয়া ছাত্রীদের বাড়িবাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের বিষয়টি চেপে যেতে পরামর্শ দিয়েছেন। আর সুপার সাংবাদিকদের কাছে দেয়া করোনাকালীন বাল্যবিয়ের শিকার ছাত্রীদের তালিকা চেপে গিয়ে বিগত কয়েক বছরে বিয়ে হওয়া ছাত্রীদের তালিকা প্রশাসনকে দিয়েছেন। সেই তালিকা ধরে প্রশাসন প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করেছেন। যদিও সুপারের অডিও বক্তব্য এই প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সুপার সাংবাদিকদের কাছে সত্য ঘটনা আড়ালের চেষ্টা করেন। তিনি কোন তথ্য না দিয়ে এই বিষয়ে রিপোর্ট না করার জন্য অনুরোধ করেন।

এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের বাল্য বিয়ে নিরোধ কমিটির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান শেখর চন্দ্র বলেন, ছাত্রীদের বাল্য বিয়ের ব্যাপারে আমার কিছু জানা নেই।

তদন্ত কমিটির সদস্য উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বিকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, আমরা তদন্ত করে যা পেয়েছি তা লিখিত আকারে ইউএনও’র দপ্তরে জমা দিয়েছি।

মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ জাকির হাসান বলেন, মাদরাসার ছাত্রীদের বাল্য বিয়ের ব্যাপারে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি আইনে মামলা করা হবে।

স্বাআলো/এসএ