নিঃসঙ্গতা

সায়রা খাতুন, বয়স প্রায় ৮০। ২০ বছর হলো তার স্বামী মারা গিয়েছেন। সারাদিন একা একা শুয়ে বসে দিন কাটান তিনি। এর মধ্যে অবশ্য নামাজ কোরআন পড়েন নিয়মিত। বয়স হয়েছে বলে আগের মতো কোন কাজে তিনি আগ্রহ পান না। আগের মতো আর কথাও বলেন না। চুপচাপ সব দেখেন। বাসায় যে তিনি একা থাকেন তা নয়। ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতনি সহ অনেক মানুষের বসবাস বাসায়। কিন্তু তিনি নিঃসঙ্গ দিন কাটান।

নিঃসঙ্গতা বিষয়টি খুব কষ্টের। কোন মানুষ একা বাস করতে পারে না। একটা বয়সের পর একা বাস করতে করতে মানুষ ক্লান্ত হয়ে যায়। সায়রা খাতুনও ক্লান্ত। এতো মানুষের মাঝে থেকেও তিনি একা। ব্যস্ত এই নগরীতে তাকে দেবার মত সময় কারো নেই। এটাই চরম বাস্তবতা। এরকম হাজার হাজার সায়রা খাতুন পরে আছে প্রায় প্রত্যেক ঘরে, যাদের জীবনের একটি অংশ কেটে যায় নিঃসঙ্গতায়।

কত অদ্ভুত ব্যাপার! একসময়ে সংসারের হাল ধরে রাখা মানুষগুলো কেমন করে যেন নেতিয়ে পরে। পুরো সংসারের দায় দায়িত্ব যারা পালন করতো তারা একসময় গণ্যই হয় না তার নিজের গড়ে তোলা সংসারে।

মানুষের জীবনধারাটা চক্রের মতো। একসময় শিশু থেকে সে দায়ত্বশীল বড় মানুষে পরিণত হয়, তারপর বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে সে আবার শৈশবের ঐ পর্যায়ে ফিরে আসে যেখানে তার চলাফেরায় বাবা মা সহ অন্যদের সাহায্যের প্রয়োজন হতো। বয়স হয়ে গেল প্রত্যেক মানুষের মধ্যে শিশু সুলভ আচরণ দেখা যায়। তার বোধশক্তি ধীরে ধীরে কমতে থাকে। রাগ, অভিমান, বাচ্চামি এই ধরণের বিষয়গুলো বেশি পরিলক্ষিত হয়। বড় থেকে একসময় তারা হয়ে যায় শিশু। এই সময় তার বাবা-মায়ের দায়িত্ব পালন করতে হয় তার সন্তানদের। কিন্তু অধিকাংশ সন্তানই এই দায়িত্ব পালনে পিছিয়ে থাকে। তারা এতো ব্যস্ত হয়ে যায় যে ২৪ ঘন্টায় একটি ঘন্টা বৃদ্ধ পিতা-মাতার সাথে অতিবাহিত করবার মত পায় না। সায়রা খাতুনের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। এই সমাজ সংসার আর তার ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে তিনি ভাবেন কত রঙিন ছিল একসময় তার দিনকাল। ফজরের নামাজ পরেই শুরু হতো সংসারের কাজ। সেই কাজ শেষ হতে হতে আছরের আজান দিতো। প্রায় সময় দেখা যেত শেষ বিকেলে তিনি দুপুরের খাবার খেতে বসতেন, কিন্তু স্বামী, সন্তান সহ অন্যদের সেই দুপুরেই খাইয়ে দিতেন। সংসার সামলানোর ভার তিনি অনেক আগেই ছেড়ে দিয়েছেন কিন্তু এখনো তার খেতে খেতে সেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। সময় মতো তার আর এই জীবনে খাওয়া হলো না।

একসময় গল্প করার কত মানুষ ছিল চারদিকে। কিন্তু তখন তিনি সংসার সামলিয়ে গল্প করার সময় তেমন পেতেন না। এখন অঢেল সময় অথচ গল্প করার মানুষগুলো আর নেই!

সায়রা খাতুন দোয়া করেন, এরকম একাকীত্ব সময় যেন কারো জীবনে না আসে। শেষ বয়সে একটু গল্প করার, গল্প শোনার মানুষ যেন সবাই পায়। তিনি এখন ওপারের অপেক্ষায়। এই নিঃসঙ্গতা তিনি আর সহ্য করতে পারেন না। বৃদ্ধ এই জীবনে তার দম আটকে আসে। এক সময় যে সন্তানদের চোখের আড়াল তিনি করতেন না কখনো এখন সেই সন্তানেরা তার আড়ালেই জীবন অতিবাহিত করছে। সায়রা খাতুনের চোখ বেয়ে জল আসে, সেই চোখের জল মুছে দেবার মত একটি প্রাণীও তার পাশে নেই! আহা নিঃসঙ্গতা! কত কঠিন এক যন্ত্রণার নাম….

আনিকা তাবাসসুম রিশা, মাস্টার্স, বাংলাদেশ গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ।