শ্রাবণীর সাথে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গল্প

স্যার আপনি কখন এলেন? এই তো একটু আগে। তা দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন? বসুন।

তুমি জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বিরবির করে কি যেন বলছিলে। তাই কোন কথা বলিনি। দাঁড়িয়ে ছিলাম। আচ্ছা, শ্রাবণী এবার বল তো, তুমি এতক্ষণ কার সাথে কথা বলছিলে?

স্যার সেটা আপনাকে অন্য একদিন বলব।

কেন? আজই বল।

স্যার প্লিজ! আজ না, অন্য একদিন আপনাকে সব বলব।

আচ্ছা, ঠিক আছে। এখন তুমি জলদি পড়ার টেবিলে এসো।

অন্য দিন শ্রাবণী পড়তে বসে একের পর এক নানা রকম প্রশ্ন করে। কিন্তু আজ তার বিপরীত। না, আজ আর ও কোন প্রশ্ন করছে না। খুব মনোযোগ সহকারে পাঠে মনোনিবেশ করেছে। এটা দেখে আমি নিজেই শ্রাবণীকে জিজ্ঞাসা করলাম কি হলো শ্রাবণী আজ যে তুমি কোন প্রশ্ন করছো না?

শ্রাবণী বলল স্যার আজ আমার পড়তে একটুও ইচ্ছে করছে না।

তাহলে এতক্ষণ যে, খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ছিলে?

স্যার দেখছিলাম আপনি আসলে কি বলেন!

ও তাই বল। তুমি তাহলে এতক্ষণ পড়ার ভান করছিলে?

না স্যার সেটা ঠিক নয়।

তাহলে?

স্যার আসুন আজ আমরা গল্প করি। আমার খুব গল্প করতে ইচ্ছে করছে।

সেটা কি ভালো হবে?

স্যার গল্প করতে আপনার বুঝি ভালো লাগে না? না তা ঠিক নয়।

আচ্ছা, বল কি গল্প শুনবে?

স্যার আমি বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনতে চায়।

শ্রাবণীর এ কথা শুনে আমি মুহূর্তের মধ্যে দুমড়ে গেলাম। ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কি গল্প…

কি হলো স্যার আপনি কোন কথা বলছেন না যে?

আমি আগের মতোই চুপ হয়ে রইলাম। শ্রাবণী এবার গো ধরল। বলল স্যার আমি বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনতে চায়। ততক্ষণে আমার মুখ লজ্জায় একেবারে কৃষ্ণচূড়ার মতো লাল হয়ে গেছে। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না ওকে কি বলব। বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কে আমি আর কতটা জানি! যেটুকু জানি তা তো কেবল ভাসা ভাসা। তিঁনি আমাদের জাতীয় নেতা। তাঁর পুরো নাম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ তাঁর জন্যেই পেয়েছি এই লাল সবুজ পতাকা, বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন দেশ। না, মাত্র এতটুকু বললে হবে না। এমন একজন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, বীর নক্ষত্র সম্পর্কে এটাই যথেষ্ঠ নয়। আমার এমন নীরব হয়ে যাওয়া দেখে শ্রাবণী আবারও বলল স্যার বঙ্গবন্ধুর গল্প বলছেন না কেন?

আমি তখন কোন উপায় না দেখে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে শ্রাবণীকে বললাম এটা অনেক বড় গল্প। একদিনে বলে শেষ করা যাবে না। তারচেয়ে কাল আমি তোমার জন্য বঙ্গবন্ধুর উপর লেখা বই নিয়ে আসব। তুমি ওটা পড়লে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবে। আমার কথা শুনে শ্রাবণীর চোখ-মুখ নিমিষে আনন্দে ঝিলমিল করে উঠল। মনে হলো ও যেন জোছনা মাখা চাঁদের বুড়ি!

আচ্ছা, শ্রাবণী আজ তাহলে আমি গেলাম। আমি কোনমতে শ্রাবণীদের বাড়ি থেকে বেরিয়ে তাড়াতাড়ি একটা সিএনজি নিয়ে সোজা আমীরুল ভাইয়ের অফিস চ্যানেল আই এ চলে এলাম। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠে গেলাম, তারপর আমীরুল ভাইয়ের রুমে প্রবেশ করলাম। যেয়ে দেখলাম আমীরুল ভাইয়ের রুমে বেশ হইচই, হট্টো-গোল। আমীরুল ভাই খুব হাসি খুশি মানুষ সব সময় আড্ডাতে মেতে থাকেন। আমি একটা চেয়ারে ঝপাত করে বসে পড়লাম। একটু আগেও আমার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমাট বেঁধেছিল। এখন সেটা আর নেই। হয়তো আমীরুল ভাইয়ের সংস্পর্শে! বরাবরই এমনটা হয়। আমি কোন সমস্যায় পড়লে আমীরুল ভাইয়ের কাছে ছুঁটে আসি। আর যথারীতি তিনি আমাকে রক্ষা করেন। আমীরুল ভাইয়ের কথায় কেমন যাদু আছে! তার কাছে এলে মন ভালো হয়ে যায়।

আমীরুল ভাই বললেন, কি রে কেমন আছিস? অনেক দিন তোর কোন খোঁজ খবর নাই। থাকিস কই?

আমি তার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে উল্টো বললাম, ভাই আমি একটা সমস্যায় পড়েছি আমাকে বাঁচান।

কেন কি হয়েছে?

আর বলেন না, শ্রাবণী নামের আমার এক ছাত্রী। আজকে সে আমাকে ধরেছে বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনার জন্য। তা এতে আবার সমস্যা কোথায়?

ভাই কি যে বলেন? বঙ্গবন্ধু সেতো অনেক বড় ব্যাপার। তাঁর সম্পর্কে আমি কি বা জানি! তাছাড়া শ্রাবণী ছোট মানুষ। অমন একটা কঁচি-কোমল শিশুকে আমি কোন ভুল তথ্য দিতে চাই নি। কি জানি! যদি শ্রাবণী আমার কথার উপর ভিত্তি করে ভুল ইতিহাস নিয়ে বড় হয়। আমীরুল ভাই আমি চাই না, শ্রাবণীও অন্য দশজনের মতো বিকৃত ইতিহাস জানুক। আমার কথা শেষ না হতেই আমীরুল ভাই, আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিলেন। কাগজে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশ কয়েকটা বইয়ের নাম লেখা। তাছাড়া আমীরুল ভাই তার লেখা কয়েকটা বই আমাকে দিলেন। আর বললেন, বইগুলো পড়লে তুই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারবি। আমীরুল ভাই এদেশের একজন খ্যাতনামা শিশুসাহিত্যিক। পেয়েছেন শিশু একাডেমী, বাংলা একাডেমীসহ অসংখ্য পদক। তার নিজের লেখা বইয়ের সংখ্যা প্রায় তিন শতাধিক।

পরের দিন আমি সাত-সকালে বঙ্গবন্ধুর উপর লেখা তিনটা বই নিয়ে শ্রাবণীদের বাসায় গেলাম। শ্রাবণী আমার হাত থেকে বইগুলো নিল। তারপর বলল স্যার আপনি বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনবেন?

আমি যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়লাম। বলে কি মেয়েটা! যে কাল আমার কাছে বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনার জন্য গো ধরেছিল। আর আজ সে কি না আমাকেই বঙ্গবন্ধুর গল্প শোনাতে চাই?

আমি হ্যাঁ অথবা না কোনটাই বলিনি। কিন্তু শ্রাবণী বলতে লাগল ‘গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া সবুজ শ্যামল একটি গ্রাম। যেখানে গাছের কোটরে, ডালে ডালে দোয়েল-শ্যামা, ময়না টিয়া, শালিক, চড়ুইসহ ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি সকাল থেকে রাত পর্যন্ত গান গাই। ভোরে যখন ক-ক-ক-, ক-ক-ক- করে মোরগ ডাকে তখন তার সাথে পাল্লা দিয়ে কাগজিলেবু গাছে বসে টুনটুনি পাখিটাও ফুরুৎ ফুরুৎ করে ওড়ে। ঘাসফুলগুলো দল বেঁধে বিকেলের হিমেল হাওয়ায় তিরতির করে নাচে। শহরের পশ্চিম পাশ দিয়ে বয়ে গেছে মধুমতি নদী। তার সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে টুঙ্গিপাড়ার বাইগার নদী। যার বালু কণাগুলো একটু রোদ পেলেই চিকমিক করে হাসে। টলমল ঢেউগুলো কলকল করে ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটা বহমান গেয়ে যায়। বাইগার নদীর দু’কূলে সারি সারি তমাল, শিরিষ, হিজল আর নারকেল গাছের পাতারা শন্ শন্ শব্দে একটা ছন্দ তোলে। সেখানেই জন্মগ্রহণ করেন হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর পিতার নাম- ‘শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়রা খাতুন।’ বাবা মা তাকে খোকা বলে ডাকতেন। এই খোকায় হলো হাজার বছরের বাঙ্গালি জাতির স্বপ্নপূরণের স্থপতি। তিঁনি ছিলেন দরদি মনের অধিকারী। তাঁর মহানুভতার কথা বলে শেষ করা যাবে না। জানেন স্যার! বঙ্গবন্ধু আমাকে দেখে তাঁর রাসেলের কথা বারবার বলছিলেন।

আমি শ্রাবণীর কথা শুনে অবাক হয়ে বললাম বঙ্গবন্ধু রাসেলের কথা কী বললেন?

বলছিলেন ‘রাসেল তোমারই মতো একটা নয়নতারা ছিল। ও ঠিক তোমার মতোই ফিকফিক করে হাসত। সারাক্ষণ ঘাসফড়িংয়ের মতো ছোটাছুটি করত। লুটপুটি করত বাড়ির সবার সাথে। ‘রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র ছিল।’ ও ছিল সবার ছোট্ট, তাই ওকে সবাই ভীষণ ভালোবাসত আদর করত।’ কিন্তু ঘাতকরা অমন একটা শিশুকেও বুলেটে বিদ্ধ…

‘শেখ কামাল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে। ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকে বি.এ (অনার্স) পাশ করেন। শৈশবে খেলাধুলায় প্রচণ্ড উৎসাহী ছিলেন। আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা। মঞ্চনাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেরও একনিষ্ঠ সংগঠক ছিলেন।’

‘শেখ জামাল ছিলেন বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় ছেলে। খুব ভালো ক্রিকেট খেলত, গিটার বাজাতেন। কিন্তু দেশদ্রোহী ঘাতকরা ওদেরকে বাঁচতে দেয় নি। ছেঁড়াপুঁতির মতো ঝরঝর করে ঝরে গেছে সব স্বপ্নমালা! সবকিছু শেষ হয়ে গেছে ১৫ আগস্ট রাতে। শত্রুর বুলেট ঝাঝরা করেছে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর ছোট ভাই শেখ আবু নাসের, শেখ কামালের স্ত্রী-সুলতানা কামাল খুকু, শেখ জামালের স্ত্রী-পারভীন জামাল রোজীসহ আবদুর বর সেরনিয়াবাত, শেখ ফজলুল হক মণি, বেগম আরজু মণি, কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ, বেবী সেরনিয়াবাত, আরিফ সেরনিয়াবাত, সুকান্ত আবদুল্লাহ বাবু, শহীদ সেরনিয়াবাত ও আবদুল নঈম খান রিন্টুকে।

শ্রাবণী এবার একটু থামল। তারপর আবার ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল জানেন স্যার! বঙ্গবন্ধু দরাজ কণ্ঠে আমাকে বলল আমি না হয় ওদের শত্রু। কিন্তু ওরা! ওদের কী অপরাধ ছিল?

স্যার আমি আর বঙ্গবন্ধুর গল্প শুনবো না। ওটা খুব কষ্টের। বুকের ভেতর কেমন ব্যথা করে।

আমি শ্রাবণীর কথা শুনে নিজেকে কোনভাবেই ধরে রাখতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল আমি যদি আরো পাথর হতে না পারি তাহলে আমার শরীরের সমস্ত রক্ত চার দেয়ালের মধ্যে এলিয়ে পড়বে! যে ভাবে ১৫ আগস্ট রাতে সিঁড়ি বেয়ে দরদর করে পড়েছিল। যা আজও মহাকালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে ৩২ নম্বর রোডের একটি প্রজ্জ্বলন বাড়ির প্রতিটি ইট। সাক্ষী হয়ে আছে ধানমণ্ডির লেক আর তার শ্যাওলাগুলো।

আমি অনেক কষ্টে আমার চোখের জল মেঘের ডানায় লুকিয়ে আমতা আমতা করে শ্রাবণীকে বললাম শ্রাবণী তুমি এত সব কথা কি ভাবে জানলে?

শ্রাবণী তখন বলল, স্যার কালরাতে আমি যখন বঙ্গবন্ধুর কথা ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তখন ঘুমের ঘোরে বঙ্গবন্ধু আমার কাছে এসেছিলেন। তিঁনিই তো এ সব ইতিহাস আমাকে জানালেন। তিঁনি আমাকে আরো বলেছেন, আমরা যেন তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলি। মানুষের কল্যাণে কাজ করি।

লিটন ঘোষ জয়, লেখক: সাহিত্যিক, গীতিকবি ও সাংবাদিক