বার কাউন্সিলের বর্তমান রুপ যেন বেকার তৈরির কারখানা

কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গ সবসময় গুরুত্ববহ, বিশেষায়িত কর্মক্ষেত্র আরো সর্বদিক থেকে সর্বাধিক গুরুত্বের দাবি রাখে। কারণ বিশ্বে বেকারত্বপূর্ণ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে রয়েছে। লক্ষাধিক শিক্ষানবিশের কর্মসংস্থানের প্রশ্নে মীমাংসা যেখানে, সেখানে বিশেষায়িত আইন পেশায় অন্তর্ভুক্তিকরণে অনিয়ম চলতে দেয়া যায় না। আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি প্রসঙ্গে ভুক্তর্ভোগীদের যুক্তি আমলে না নেয়াটা নানান প্রশ্নের উদ্রেক করছে। সঠিক সিদ্ধান্ত আমাদের মেনে নিতেই হবে।

অনৈতিকতার বিরুদ্ধে গণঅসন্তোষ-গণআন্দোলনের দাবিসমূহ অগ্রাহ্য করলে রাষ্ট্রের জন্য বুমেরাং হতে পারে। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটলে তার দায় সাধারণের কাঁধে বর্তাবে না। প্রচলিত আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি সর্বাত্মকভাবে ব্যর্থতাকে নির্দেশ করছে। নিয়মিত পরীক্ষা না হওয়া, পরীক্ষা ওএমআর শীটবিহীন, পরীক্ষার খাতা রিভিউ না করা ও নিয়মিত ফলপ্রকাশের অনীহায় দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেছে।

জনগণের পকেট কাটা অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা বাতিল করে আইন পেশায় শিক্ষানবিশ কাল শেষ হলে আইনজীবী সনদ প্রদান করা উচিত। বার কাউন্সিল কোন একাডেমিক বা চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠান নয়। দৃশ্যত বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সিন্ডিকেটে বেকারত্ব বেড়ে চলেছে।

বিশেষায়িত আইন বিষয়ে ডিগ্রীলাভের পরেও অযৌক্তিক বার কাউন্সিল পরীক্ষা আয়োজন ছাঁটাই প্রক্রিয়া-সংকোচন নীতিকে চিহ্নিত করে। বার কাউন্সিল পরীক্ষা তো চাকুরির পরীক্ষা না, তাহলে নেগেটিভ মার্কিং কেন? বিশেষায়িত আইন পেশায় ছাঁটাইকরণ জনগণের জন্য মোটেও শুভ নয়। এ রকম সেবামূলক পেশায় সংকোচন কি জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট? পরীক্ষা দক্ষতা বৃদ্ধির পরিচায়ক হতে পারেনা। আইন বিষয়ে কাম্য ছাত্রসংখ্যা, শিক্ষানবিশ কাল এক বছর, শিক্ষানবিশ সম্মানী ফি, নির্দিষ্টতা স্তর পর্যন্ত মামলায় অংশগ্রহণ ও শিক্ষানবিশকালে নির্দিষ্ট সংখ্যক সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ সাপেক্ষে আইনজীবী সনদের দাবিগুলো শতভাগ ন্যায়সঙ্গত ও যৌক্তিকতার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা জরুরি। “বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ‘ The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972″ এর Article 40(1) এবং 40(2)(m) অনুযায়ী গেজেট বা প্রজ্ঞাপন জারি করে পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনজীবী সনদ দিতে পারে।

এই বিষয়ে ” The Bangladesh Legal Practitioners and Bar Council Order, 1972 ” এর Article (40)(1) এ বলা হয়েছে ” The Bar Council may, with the prior approval of the Government by notification in the official Gazette, make rules to carry out the purposes of this order, ” অর্থাৎ অনুচ্ছেদ ৪০(১) অনুযায়ী বার কাউন্সিল গেজেটের মাধ্যমে বিধি প্রণয়ন করতে পারবে।

কয়টি বিষয়ের উপরে বিধি প্রণয়ন করতে পারবে তার তালিকা দেয়া হয়েছে ঠিক এর পরের অনুচ্ছেদ ৪০(২) এ, এই তালিকার Article 40(2)(m) বলা হয়েছে, ” the examination to pass for admission as an advocate. ” এডভোকেট হিসাবে এনরোলমেন্টের জন্য যে পরীক্ষায় পাশ করতে হবে সেই বিষয়ে বার কাউন্সিল গেজেটের মাধ্যমে বিধি প্রণয়ন করতে পারবে। এনরোলমেন্ট পরীক্ষার পূর্বশর্ত এলএলবি উত্তীর্ণ হতে হবে। অর্থাৎ বার কাউন্সিল যদি ইচ্ছে করে রেজিষ্ট্রশনভুক্ত শিক্ষানবিশ আইনজীবীদের গেজেটের মাধ্যমে সনদ প্রদান করতে পারেন।

আরো পড়ুন>>>বিজয়ের মাসে পদ্মা সেতুর বিজয়

বিশ্বে বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের তালিকায় ১২ তম স্থানে আমাদের দেশের নাম। সরকারের ঘোষণা ও পরিকল্পনা অনুযায়ী স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে এদেশকে আগামী ২০২১ সাল নাগাদ মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে জনগনের সর্বাত্মক সহযোগীতা কামনা করেছেন। বর্তমানে দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারের বড় একটা অংশ দখল করে আছে শিক্ষানবিশ আইনজীবীরা। শিক্ষিত বেকারেরা সমাজে সবচেয়ে বেশি সামাজিক অবহেলিত। রাষ্ট্রের আইন ও শাসন ব্যবস্থাকে সুচারুভাবে পরিচালনায় সর্বাত্মক সহযোগীতা করে বিজ্ঞ আইনজীবীরা। আর এই আইন পেশাকে আরো শক্তিশালী গ্রহণযোগ্য গড়ে তুলতে যেমন যোগ্য আইনজীবী দরকার তেমনি এ পেশাতে আসতে সঠিক নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপও দরকার। দরকার এ পেশার তালিকাভূক্তির আধুনিকায়ন। সার্কভূক্ত দেশগুলোতেও আমাদের দেশের মত আইনজীবী তালিকাভূক্তির জন্য কঠিন তিন ধাপে পরীক্ষা পদ্ধতি নেই। তাই ভূক্তভোগীদের চলমান আন্দোলনকে মানবিক বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনে আইনের সংযোজন কিংবা সংশোধন করে, সংস্কার করে তাদের রিটেন, ভাইভা পরীক্ষা বাতিল করে নির্দিষ্ট সংখ্যক কর্মশালা, প্রশিক্ষণ ও সেমিনারে অংশ সাপেক্ষে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভূক্তের দাবি যেন হাজার-হাজার আইন শিক্ষার্থী ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী পরিবারের এখন সময়ের দাবি। অবিলম্বে আইনজীবী অন্তর্ভুক্তিকরণ পদ্ধতি সংস্কার করা খুব জরুরি।

লেখক: আহবায়ক, আইনজীবী সনদ অধিকার আন্দোলন, কেন্দ্রীয় কমিটি।

স্বাআলো/আরবিএ