পটুয়াখালীতে গৃহহীনদের ঘর দিয়ে লাখ লাখ টাকা জনপ্রতিনিধিদের পকেটে

পটুয়াখালী: পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে মুজিববর্ষ উপলক্ষে গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। নিম্নমানের উপকরণ দিয়ে ঘর নির্মাণ ও সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে নগদ অর্থ নেয়ার অভিযোগ তুলেছেন অনেকে। এই অনিয়মের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধিরা লাখ লাখ টাকা পকেটে ভরেছেন।

২০২০-২১ অর্থবছরে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প আশ্রয়ণ-২ এর আওতায় উপজেলায় ৪৯১টি ভূমিহীন পরিবারকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার তত্ত্বাবাধানে দুই শতাংশ খাস জমি বন্দোবস্ত দিয়ে একটি সেমি পাকা ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। যার মধ্যে ১৫০টি ঘরের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। বাকি ঘরের নির্মাণের কাজ চলমান। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার টাকা। ৩৯৪ বর্গফুটের ওই বাড়িতে নির্মাণ করা হচ্ছে দুটি কক্ষ, রান্নার জায়গা ও একটি টয়লেট এবং উপরে উন্নতমানের রঙিন টিন।

তবে এসব ঘর সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দেয়ার কথা থাকলেও জনপ্রতি দিতে হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা করে। অভিযোগ রয়েছে- টাকা দিয়ে ঘর পাওয়ার পরও ইট-বালুসহ অর্ধেক নির্মাণসামগ্রী কিনতে হচ্ছে সুবিধাভোগীদের। যাতে অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে আরো ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে ঘর বরাদ্ধ হয় ৫০টি। প্রতিটি ঘরের জন্য নেয়া হয়েছে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা করে।

চরমোন্তাজ ৭নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হালিম খান বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান হানিফ মিয়া আমার মাধ্যমে তিনটা ঘরের নাম দিয়েছেন, প্রতিটি ঘরের জন্য তাকে ১৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

উত্তর চরমোন্তাজ ৬নং ওয়ার্ডের জাহাঙ্গীর ফরাজী বলেন, ঘর পেতে আমাকে ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের মহিলা সদস্যের স্বামী জলিল হাওলাদারের কাছে প্রথমে ২০ হাজার ও পরে মালামাল আনার ভাড়া বাবদ ১৫ হাজার টাকা নিয়েছে। কিন্তু তারপরও আমাকে ২৪ হাজার টাকার নির্মাণসামগ্রী কিনতে হয়েছে। ইট দুই হাজার, রড ১৩ কেজি, সিমেন্ট ৩০ ব্যাগ নিজের টাকায় কিনেছি।

সুবিধাভোগী উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ১নং ওয়ার্ডের শাবু হাওলাদার জানান, ঘরের জন্য নাম দিতে ইউপি সদস্য মিন্টু হাওলাদারকে ৩৫ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। কিন্তু ঘরের জন্য সরকার যে নির্মাণসামাগ্রী দিয়েছে তাতে ঘরের কাজ সম্পন্ন হচ্ছে না এমন কথা বলে আমার কাছ থেকে আরো এক হাজার ১০০ ইট এবং ৩০ ব্যাগ সিমেন্ট নেয়া হয়েছে।

একই ওয়ার্ডের শাকিল বলেন, ইউপি সদস্য মিন্টু হাওলাদারকে ঘরের জন্য প্রথমে ৩০ হাজার ও ১৫ দিন পর মালামালের ভাড়া বাবদ পাঁচ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

৩নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ছালাম প্যাদা তিনি অধিক সম্পত্তির মালিক হয়েও সরকার দলীয় প্রভাব খাটিয়ে ব্যবসায়ী দুই ছেলে এবং এক মেয়েকে বাগিয়ে দিয়েছেন তিনটি সরকারি ঘর।

এ বিষয়ে ইউপি সদস্য ছালাম প্যাদার কাছে জানতে চাইলে দলীয় প্রভাব খাটিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য বলেন।

সরকারি ঘরে নিম্নমানের মালামাল সরবরাহকারি ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মিন্টু হাওলাদার (সাব ঠিকাদার) জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।

ছোটবাইশদিয়া ইউপি চেয়ারম্যান হাজী আব্দুল মান্নান জানান, ঘরের জন্য কোনো টাকা নেয়া হয়েছে কিনা তা তার জানা নেই। এ ব্যাপারে আমার কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করেননি।

চরমোন্তাজ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হানিফ মিয়া জানান, ইউপি সদস্যরা টাকা নিয়ে থাকলে নিয়েছে। আমাকে কোনো টাকা-পয়সা দেয়নি। কেউ আমার কাছে অভিযোগও করেনি।

এ বিষয় রাঙ্গাবালী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মাশফাকুর রহমান বলেন, ঘরের তালিকা ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে করা হয়েছে। অনিয়ম হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। আমার কাছে কেউ অভিযোগ করেনি। তবে কেউ যদি টাকা দিয়ে থাকে সেই বড় অন্যায় করেছে।

পটুয়াখালী জেলা প্রশাসক মতিউল ইসলাম চৌধুরী জানান, এ বিষয়ে আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

.