ব্যর্থ প্রাণের পঙক্তিমালা

জীবনের গতিপথ কখনো মসৃণ হয় না। সেখানে আরোহণ থাকে, অবরোহণ থাকে। শত প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করে কেউ অভিষ্ঠ লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন, কেউ পারেন না। লক্ষ্যে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া ব্যক্তি, পেশা ও বিত্ত ভেদে ভিন্ন ভিন্ন হলেও সাফল্য ব্যর্থতার গল্প কিন্তু সব দেশে, সব সমাজে মোটামুটি একই রকমের। সফল মানুষেরা সমাজের সকল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। ব্যর্থরা অবহেলিত হোন। সকল অন্ধকার তাঁদের গ্রাস করে। তাঁরা ভাবতে থাকেন পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তাঁদের কোন মূল্য নেই। বেঁচে-থাকাটা তাঁদের কাছে অর্থহীন হয়ে যায়। সাফল্য-ব্যর্থতার গল্পগুলো কখনো সমাজবিজ্ঞানীরা আমাদের গোচরে আনেন। আবার কখনোবা কবি-সাহিত্যিকদের লেখনীতে তা ফুটে ওঠে। কখনো কখনো আপাত ব্যর্থ সেলিব্রিটিদের জীবনাচরণ সমাজের মানস গঠনে প্রভাব বিস্তার করে থাকে। সেসব লেখা পড়ে আমরা হাসি, কাঁদি। নিজেদের জীবন সাজাতে চেষ্টা করি। আবার ব্যর্থতার কারণ নির্ণয় করে সেটা থেকে বেরিয়ে আসারও চেষ্টা করি।

রবীন্দ্রনাথ যখন লেখেন, “জীবন বৃথা গেল। যাইতে দাও। অধিকাংশ জীবন বৃথা যাইবার জন্য হইয়াছে।(পনেরো আনা)। ” তখন এটি পড়ে রাগ হয়, ক্ষোভ হয়। মনে হয়, বৃথা যাওয়া জীবনের মর্ম রবীন্দ্রনাথ কি করে বুঝবেন! তাঁর জীবন তো আর বৃথা যায়নি। যদিও প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথ বৃথা যাওয়া সমাজের পনেরো আনাদের পক্ষাবলম্বন করেছেন। তাঁর মতে এই পনেরো আনা’ রা না থাকলে সমাজের সকল সৃষ্টি অর্থহীন হয়ে যেতো। কিন্তু সমসাময়িক সাহিত্যিকদের প্রবল বিরোধিতা, শান্তিনিকেতন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে আর্থিক অনটন এবং ঠাকুর পরিবারের মৃত্যুর মিছিল সৃষ্টিশীল রবীন্দ্রনাথকে প্রচন্ড ব্যথিত করেছিল। তিনি নিজেকে ব্যর্থ ভাবতে শুরু করেছিলেন। বিশেষ করে বৌদি কাদম্বরী দেবীর মৃত্যু (১৮৮৪), স্ত্রী মৃণালিনী দেবীর মৃত্যু (১৯০২), দ্বিতীয় কন্যা রেনুকার মৃত্যু (১৯০৩) এবং কনিষ্ঠপুত্র শমীন্দ্রনাথের মৃত্যু (১৯০৭) স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের বিশ্বাসের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছিলো। এ সময় রচিত তাঁর কিছু সাহিত্যকর্মে এর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ১৯১০ সালে রচিত গীতবিতানের পূজা পর্বের একটি গানে আমরা রবীন্দ্রনাথের মানসিক অস্থিরতার প্রকাশ লক্ষ্য করি –

“যতবার আলো জ্বালাতে চাই,
নিবে যায় বারে বারে।
আমার জীবনে তোমার আসন,
গভীর অন্ধকারে।”

২৫ সেপ্টেম্বর ১৯১৪ সালে শ্রীনিকেতন থেকে জ্যেষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথকে এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, “ইউনানী ডাক্তারের ওষুধ খেয়ে তাঁর শারীরিক সমস্যা দূর হলেও কিছু মানসিক উপসর্গ দেখা দিয়েছে।”

রথীকে তিনি আরো লিখলেন, “দিনরাত্রি মরবার কথা এবং মরবার ইচ্ছা আমাকে তাড়ণা করেছে, মনে হয়েছে আমার দ্বারা কিছুই হয়নি এবং হবে না। আমার জীবনটা যেন আগাগোড়া ব্যর্থ ….।” যদিও কিছুদিন পরেই তিনি আপন মানস সৃষ্ট এই ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন।

সাহিত্যে জীবনের বাস্তবতাই প্রতিফলিত হয়। কবি-সাহিত্যিকরা বাস্তব জীবন থেকেই লেখালেখির উপকরণ সংগ্রহ করেন। তারপরেও সাহিত্য ও জীবনের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। জীবনের সব সত্য যেমন সবসময় সাহিত্যে উপস্থাপন করা যায় না; তেমনি সাহিত্যের সব সত্য ও বাস্তব নয়। সেখানে মিথ্ থাকে, কল্পনা থাকে এবং পাঠকের মনোরঞ্জনের অনেক উপকরণ থাকে। কিন্তু ট্রাজেডিটা ঘটে তখনই, যখন জীবন ও সাহিত্য একাকার হয়ে যায়। আর এই কথাগুলো বোধহয় খুব সত্যি হয়ে ধরা দেয় বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পুরোধা জীবনানন্দের ক্ষেত্রে। জীবনানন্দের প্রায় সবগুলো উপন্যাসের নায়ক মধ্যবিত্ত জীবনের প্রতিনিধি এবং প্রায় সবাই ব্যর্থ। চাকরি না পাওয়ার যন্ত্রনা, দাম্পত্য জীবনের ব্যর্থতা ও আর্থিক অনটন তাদের নিত্যসঙ্গী। “মাল্যবান” উপন্যাসের মাল্যবান , “নিরুপম যাত্রার” প্রভাত, “আমরা চারজনে” এর অনাথ এবং “কারুবাসনা ” উপন্যাসের নায়ক হেম এবং তার স্ত্রী কল্যাণীর অন্তরালে জীবনানন্দ যেন নিজের দাম্পত্য জীবনের ব্যর্থতার ছবি তুলে ধরেছেন। আর তাঁর কিছু কবিতা যেন একপাক্ষিক ও ব্যর্থ প্রেমের এক একটি অনুপম নিদর্শন । বাংলা কবিতার সর্বাধিক পঠিত , তুমুল জনপ্রিয় ও বোধকরি সর্বশ্রেষ্ঠ রোমান্টিক কবিতা “বনলতা সেন” তো আসলে একটি ব্যর্থ প্রেমের কবিতা। লক্ষ্য করুন পাঠক , এখানে হাজার বছরের ভ্রমণক্লান্ত কবি দুদণ্ড শান্তি পেয়েছিলেন নাটোরের বনলতা সেনের কাছে।

“আমারে দু-দন্ড শান্তি দিয়েছিল
নাটোরের বনলতা সেন”
(বনলতা সেন -মহাপৃথিবী)

যা উল্লেখ করতে গিয়ে কবি ‘Past tense’ এর ব্যবহার করেছেন “শান্তি দিয়েছিল।” প্রশ্ন করা যেতেই পারে, এখন কি সে আর কবির জীবনে নেই? আবার দিনশেষে বোধহয় এরকমই একটি পরিবেশ আবারো প্রত্যাশা করছেন কবি।

জীবনানন্দের কবিতার আরো কিছু ব্যর্থ প্রেমের উজ্জ্বল প়ংক্তি -পাঠক লক্ষ্য করুনঃ

“তুমি তো জানো না কিছু – না জানিলে
আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে।”
(নির্জন স্বাক্ষর – ধূসর পান্ডুলিপি)

“নিশীথের বাতাসের মতো
একদিন এসেছিলে,
দিয়েছিলে একরাত্রি দিতে পারো যত।”
(সহজ- ধূসর পান্ডুলিপি)

“তোমার শরীর
তাই নিয়ে এসেছিলে একবার,
তারপর মানুষের ভিড়
রাত্রি আর দিন
তোমারে নিয়েছে ডেকে কোন দিকে
জানিনি তা।”
(১৩৩৩- ধূসর পান্ডুলিপি)

“আমাকে খোঁজো না তুমি বহুদিন
কতদিন আমিও তোমাকে খুঁজি নাকো
এক নক্ষত্রের নিচে তবু একই আলোকপৃথিবীর পারে
আমরা দুজনে আছি, পৃথিবীর পুরনো পথের রেখা
হয়ে যায় ক্ষয়, প্রেম ধীরে মুছে যায় ,
নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়।”

(দুজন -বনলতা সেন)

একইভাবে বিয়ের আসর থেকে পালিয়ে আসা হরিপদ কেরানির জীবনের গল্প (বাঁশি -রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ) , অথবা বধু- শিশুসহ আপাত সুখী গৃহকোণ থাকা সত্ত্বেও পঞ্চমীর চাঁদ ডুবে গেলে আত্মহনন কৃত যুবকের গল্প (আট বছর আগের একদিন- জীবনানন্দ ), অথবা শনিবার সন্ধ্যায় বদ্দিরাজ গাছের মগডালে নিরঞ্জনের ফাঁসি নেওয়ার যে গল্প নির্মলেন্দু গুণ আমাদের শোনান (নিরঞ্জনের পৃথিবী – নির্মলেন্দু গুণ) তা সবই যাপিত জীবনের কোনো না কোনো ব্যর্থতার গল্প। যা আমাদের পীড়িত করে , ব্যথিত করে , আর্দ্র করে।

ব্যর্থ প্রেমের একটি আইকনিক চরিত্র বোধহয় শরৎচন্দ্রের দেবদাস। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে কত বাঙালি যুবক যে দেবদাস হয়েছে অথবা দেবদাস এর আদলে নিজের ব্যর্থ ব্যক্তিত্বকে সাজিয়েছে তার খবর কে রাখে। তবে ব্যর্থ প্রেমিকদের একটি প্রিয় উক্তি বোধহয় শ্রীকান্ত উপন্যাসের “বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও ঠেলিয়া দেয় ।” প্রেমের ব্যর্থতা যেমন একদিকে প্রিয়জনকে দূরে ঠেলে দেয় ; তেমনি জীবনযুদ্ধের ব্যর্থতাও প্রিয়জনকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। যেমন দিয়েছিল শঙ্খনীল কারাগার-এর রাবেয়াকে। গাত্রবর্ণের কারণে বিয়ে না হওয়া বড় মেয়ে রাবেয়া সংসারের যাবতীয় গ্লানি থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় চাকরি নিয়ে পরিবার থেকে দূরে চলে যায়। সেখান থেকে ছোট ভাই খোকাকে লিখিত রাবেয়ার চিঠি এবং উপন্যাসের শেষে খোকার হৃদয় হাহাকার করা আত্মকথন ( “মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেঁয়ে কান্নার সুরের মতো সে শব্দ। আমি কান পেতে শুনি । বাতাসে জাম গাছের পাতায় সর সর শব্দ হয় । সব মিলিয়ে হৃদয় হা হা করে ওঠে। আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতায় কী বিপূল বিষণ্ণতাই না অনুভব করি। জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি।”) নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনের ব্যর্থতার গল্প । আবার নন্দিত নরকের বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী রাবেয়ার জীবনের করুণ পরিণতি ও মন্টুর ফাঁসির মধ্য দিয়ে পাঠকের যে নরক দর্শন হয় তাও এই নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনের ব্যর্থতারই গল্প।

প্রতিটি পরাজয়তাই এক একটি ব্যার্থতা। ব্যার্থতার সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ যাই হোক না কেন ; ব্যর্থতা কারো কাম্য নয় । ব্যর্থ হওয়া মানেই জীবন শেষ হয়ে যাওয়া নয়। বরং ব্যর্থতার শিক্ষাগুলো জীবনকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ব্যর্থ প্রেমকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেনঃ

“প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহংকার দেয়
আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি
দুঃখ আমার চুল থেকে পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়
আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে
এক অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাই
সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার
সহ্য হয় না।”
(ব্যর্থ প্রেম – সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়)

প্রেমে ব্যর্থ মানুষ সাময়িক হতাশা ও নিশ্চলতা থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হলেও অর্থনৈতিক ব্যর্থতা একজন মানুষকে নিঃস্ব করে দেয়। তাঁর বেঁচে থাকার সাহস টা নষ্ট হয়ে যায়। ক্রমাগতভাবে সে আত্মহননের পথে পা বাড়ায়। ২০১০ সালের ১৭’ ডিসেম্বর তিউনিসিয়ার রাজপথে প্রকাশ্যে আত্মহননের মধ্য দিয়ে যে বিপ্লবের সূচনা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে যে বিপ্লব পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ক্ষমতা কাঠামোর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল ; তা ছিল আসলে জীবন যুদ্ধে ব্যর্থ এক যুবকের প্রতিবাদের গল্প। শিক্ষিত যুবক বোয়াজিজি এক বিপ্লবের নাম। যে কিনা লেখাপড়া শেষ করে চাকরি না পেয়ে শুরু করে স্বল্প পুঁজির ক্ষুদ্র ব্যবসা। কিন্তু পুলিশের ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়ে তার ব্যবসা পন্ড হয়ে যায়। দ্বারে দ্বারে ঘুরে বিচার না পেয়ে অবশেষে গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেন তিনি। এভাবেই বোধহয় ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলতে হয়। তবেই হয়তো পথের শেষে আলোর রেখা দেখা যায় । যে আলোর আভায় অসংখ্য ব্যর্থ প্রাণ আলোকিত হয়ে ওঠে। যেমনটা বলেন রবীন্দ্রনাথ।

“ব্যর্থ প্রাণের আবর্জনা পুড়িয়ে ফেলে আগুন জ্বালো
একলা রাতের অন্ধকারে আমি চাই পথের আলো।”
(রবীন্দ্রনাথ)

লেখক: অধ্যাপক আবদুল হাই