শিষ্টাচার ও ভ্যাকসিন বিলাস

বাঙালি কি অশিষ্ট জাতি? আবহমান কালের বাঙালি সংস্কৃতিতে এরকম নিদর্শন পাওয়া যায় না । কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের কিছু অভিজ্ঞতা এই সন্দেহকে উস্কে দেয় বৈকি। যুগ যুগ ধরে বাংলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল কৃষি। তাই বাঙালির সামাজিক জীবনের বিভিন্ন আচরণে সরলতার প্রকাশ ছিল। বয়োজ্যেষ্ঠ তথা সমাজের সবার সঙ্গে আচরণের বহিঃপ্রকাশ ছিল সুন্দর শোভন ও রুচিশীল। কৃষিভিত্তিক সমাজের সকল আচরণেই তাই এক ধরনের গ্রাম্যতার প্রকাশ লক্ষণীয়। ফসল খেতে লুঙ্গি পরিহিত উন্মুক্ত দেহের কৃষকের জমি কর্ষণের চিত্র এখানে খুব স্বাভাবিক। কিন্তু এই একই দৃশ্যের বহিঃপ্রকাশ অন্যত্র বিশেষ করে শহুরে জীবনে অকল্পনীয় এবং তা অশোভন ও বটে। নগরায়ন মানুষের জীবনকে যেমন জটিল করে তেমনি মানুষের আচরণিক দিকের ও অনেক পরিবর্তন আনে ক্ষেত্রবিশেষে শিষ্টতারও। ফলে গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে শহুরে জীবনের ব্যবহারিক আচরণে সুস্পষ্ট পার্থক্য বিদ্যমান। যদিও শিষ্টতার একটি বিশ্বজনীন মাত্রা অবশ্যই আছে। যে সমাজ যত সভ্য তার লোক-ব্যবহার তত মার্জিত, তত শিষ্ট। শিষ্টাচার বর্জিত সমাজের উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। লোক- আচরণে জাপানিদের বিনয় বা ফরাসিদের কেতা সর্বজনবিদিত। আমরা বাঙালিরা শিষ্টাচারের চর্চায় কি তার ধারেকাছেও আছি!

ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতবর্ষ দখল এবং ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ও হিন্দু কলেজের প্রতিষ্ঠা, ও ইয়ংবেঙ্গলদের আন্দোলন বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজের লোক-আচরণে অনেক পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। এ সময় গড়ে ওঠা কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর মাধ্যমে বাঙালির পোশাকের ব্যবহার, অফিসিয়াল আচরণ, ও টেবিল ম্যানারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছিল। যার সঙ্গে ধাতস্থ হতে বাঙ্গালীর বহু সময় লেগেছিল। আবহমান বাংলার সংস্কৃতির সঙ্গে ইউরোপীয় ধারার মিশেলে বিকশিত এইসব শিষ্টাচার বাঙালি বহুকাল অনুসরণ করে এসেছে। শিষ্টাচারের শিষ্টতা যে সবসময় অক্ষুন্ন থেকেছে, তা নয়। কখনো কখনো তুচ্ছ কারণে বাঙালির নিস্তরঙ্গ জীবনে ঝড় উঠেছে। ইয়ংবেঙ্গলদের ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন আচরণ, বিশেষ করে ইউরোপীয় ধারার পোশাক পরিধান ও পানীয় পানের সংস্কৃতি উনবিংশ শতকের বাঙালি সমাজে অনেক বিতর্কের অবতারণা করেছিল। বিধবা বিবাহের প্রচলন হিন্দু সমাজে সংস্কার আনলেও একে কেন্দ্র করে বাঙালির প্রতিশোধস্পৃহ আচরণ সামনে এসেছে। আবার মুসলিম সমাজে ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণকে কেন্দ্র করেও অনেক অশিষ্ট আচরণ আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এমনকি সাহিত্যে ভাষার ব্যবহারকে কেন্দ্র করে ও বাঙালি অনেক সময় শিষ্টতার সীমা অতিক্রম করেছে। ১৯৩২ সালে জীবনানন্দের ‘ক্যাম্পে’ কবিতায় ব্যবহৃত একটি অসমীয়া শব্দ “ঘাই” টোপ অর্থে ব্যবহার করা হলে শনিবারের চিঠি পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাস একে যৌনগন্ধী শব্দ বলে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করেছিলেন। ভূমেন্দ্র গুহের রচনা থেকে জানা যাচ্ছে এসময় তথাকথিত অশ্লীলতার কারণে কোন এক শুচিবাইগ্রস্ত অধ্যক্ষ তাঁর কলেজ থেকে জীবনানন্দকে চাকুরিচ্যুত করেছিলেন। যদিও পরবর্তীকালে কবিতাটি ক্লাসিকের মর্যাদা পায় এবং সাহিত্যে শব্দ ব্যবহারের তথাকথিত শিষ্টতার বিতর্কও স্তিমিত হয়ে যায়।

অতিসম্প্রতি কোভিড-১৯ যেন বিশ্বব্যাপী আবার শিষ্টাচারের বিতর্ক নিয়ে হাজির হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে ব্যবহারিক জীবনে খুব সাধারণ কিছু শিষ্টাচার মেনে চললে কোভিড-১৯ এর সংক্রমণ থেকে অনেকাংশে নিরাপদ থাকা যায়। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রচারণায় বার বার হাঁচি-কাশি ও সামাজিক দূরত্বের শিষ্টাচার মেনে চলার তাগিদ দেয়া হয়েছে। তবুও আমরা দেখছি আমাদের মনের কোনায় কোনায় গোপনে লালিত অশিষ্ট আচরণগুলো যেন ক্রমশ প্রকাশ হচ্ছে । এগুলো আমাদের বিব্রত করছে, লজ্জা দিচ্ছে, অস্বস্তিতে ফেলছে। হাঁচির সময় করণীয় কি, কাশিতে কিভাবে মুখ ঢাকতে হয়, ব্যবহৃত টিস্যু কোথায় ফেলতে হয়, কিভাবে করমর্দন করতে হয়, কথা বলার সময় সর্তকতা কেমন হওয়া উচিত, কিভাবে সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করতে হয়, কিভাবে হাত স্যানিটাইজ করতে হয় এগুলো নতুন করে শিখতে হচ্ছে। এমনকি মাস্ক পরিধান বাধ্য করতে রাস্তায় সেনা কর্মকর্তাদের পর্যন্ত নামাতে হয়েছে।

কোভিড-১৯ এর কারণে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থবিরতা নেমে এসেছে। কর্মহীন মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।একদিকে কর্মহীনতা, অন্যদিকে দীর্ঘ ঘরবন্দীত্বের অভিঘাতে পারিবারিক শিষ্টতার সীমা ও যেন ভেঙে পড়ছে। এ কারণে হয়তো বিবাহ বিচ্ছেদের হার বেড়েছে। আবার দীর্ঘ গৃহবন্দিত্বের কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ সুযোগে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিজ্ঞাপনের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে এবং বয়স্কদের সম্মান ও শ্রদ্ধা দেখানোর চিরায়ত শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে গণমাধ্যমে “কমেন্ট পাস” জাতীয় বিজ্ঞাপনের বিরক্তিকর নির্মাণ হয়েছে। এ সময়ে ঘরবন্দি মানুষের আর্থিক চাহিদা মেটাতে মোবাইল ব্যাংকিং এর পরিধি বেড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে বোধ করি সহযাত্রী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে ইঙ্গিত করে এবং অরুচিকর ভাষার প্রয়োগে “বেকূব” জাতীয় বিজ্ঞাপন প্রচারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ভাষার শিষ্টাচার লঙ্ঘনের এই প্রবণতা কি শুধুই কোভিড-১৯ জাত!

তবে মহামারীর এই সময়ে শিষ্টাচার লঙ্ঘনের সবচেয়ে অশোভন ঘটনাটি ঘটেছে বোধহয় ভ্যাকসিন গ্রহণের সময়। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ছেয়ে গেছে ভ্যাকসিন গ্রহণের বিশেষ ধরনের আলোকচিত্রে। কেউ উদোম দেহে বসে আছেন, কারো বক্ষ সৌন্দর্য দেখা যাচ্ছে, কেউবা অন্তর্বাসের ব্র্যান্ড প্রদর্শন করছেন। কারো চতুর্দিকে সখা-সখীদের হাস্যজ্জল ভিড়, কেউবা আনত-নয়নে বসে আছেন। মনে পড়ছে “যদি কিছু মনে না করেন” খ্যাত ‘ফজলে লোহানীর’ একটি উক্তির। সাপ্তাহিক বিচিত্রার একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “মধ্যবিত্ত বাঙালি ধবধবে সাদা পাঞ্জাবির নিচে হলদেটে বিবর্ণ গেঞ্জি দেখাতে ভালোবাসে।”

মহামারীর এই আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে আমরা ভ্যাকসিন গ্রহণকে অবশ্যই স্বাগত জানাই। কোভিড-১৯ থেকে সুরক্ষার জন্য আমরা অবশ্যই বিজ্ঞান ভিত্তিক সমাধান নিজেরা গ্রহণ করব এবং তা গ্রহণে অন্যদেরকে উৎসাহিত করব। আমাদের ভ্যাকসিন গ্রহণের খবরে আপামর জনসাধারণ ভ্যাকসিন গ্রহণে আগ্রহী হবে। তবেই হার্ড ইমিউনিটি অর্জিত হবে। তবেই আমরা অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জীবন-যাপন করতে পারব। কিন্তু সেটি করতে গিয়ে যদি স্বাস্থ্য সুরক্ষার মৌলিক শিষ্টাচার লক্ষিত হয় তবে কি আমরা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব? ভ্যাকসিন গ্রহণের সময় আমরা সম্ভবত দু’ধরনের শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছি । প্রথমত সঙ্গী পরিবেষ্টিত হয়ে ভ্যাকসিন গ্রহণ করতে গিয়ে আমরা সামাজিক দূরত্বের শিষ্টাচার লঙ্ঘন করেছি, দ্বিতীয়ত ভ্যাকসিন গ্রহণের উদোম ছবি প্রদর্শন করতে গিয়ে আমরা শালীনতার সীমা লংঘন করেছি। যার কোনটিই কাম্য নয়। আমাদের যেকোন দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। পক্ষান্তরে পরিশীলিত ও সভ্য আচরণ, বিশেষ করে পরিছন্নতা ও সামাজিক সুরক্ষার শিষ্টাচার গুলো শুধু কোভিড-১৯ থেকেই নয়, ভবিষ্যতেও সম্ভাব্য যে কোনো বিপদের রক্ষাকবচ হতে পারে। এগুলো মেনে চললেই আমরা নিজেদেরকে সভ্য জাতি হিসেবে দাবি করতে পারব।

লেখক: অধ্যাপক আব্দুল হাই