যশোরে ঘের থেকে মাছ লুট, অভিযোগ মন্ত্রীপুত্রের পোষ্যদের বিরুদ্ধে

যশোর: যশোরের মণিরামপুরের বিলবোকড়ে মাসুদের ঘের নামে পরিচিত ঘেরটির আয়তন প্রায় এক হাজার ২০০ বিঘা। এই ঘেরে খাস জমি রয়েছে প্রায় ৩০০ বিঘা। বাকি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির বিঘা প্রতি ১৬ হাজার ও ১৮ হাজার চুক্তিতে মাছ চাষ করেন মালিকপক্ষ। তবে ঘেরটির মালিকানা নিয়ে তিনটি পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব চলছে।

এই দ্বন্দ্বের জের ধরে বৃহস্পতিবার অস্ত্রের মুখে ঘেরটি থেকে পাঁচটি নৌকাসহ পাঁচ লক্ষাধিক টাকার মাছ লুট করেছে সন্ত্রাসীরা। এসময় বাঁধা দিলে দুইজনকে মারপিট করে ফেলে রাখা হয় ঘের পাড়ে। বৃহস্পতিবার বিকালে এই ঘটনা ঘটে। পরে রাতে কয়েক দফা গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটে বিলবোকড় পাড়ে।

যশোরে রেলওয়ের জায়গা থেকে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ

অভিযোগ রয়েছে, লুটকারীরা স্থানীয় সরকার ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য্যরে পুত্র সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্য শুভর পোষ্য। এই ঘের ইস্যুতে মাস দুয়েক আগে তাদের পক্ষ নিয়ে এক শালিস বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তিনি।

এদিকে, হামলা ও মাছ লুটের ঘটনায় মণিরামপুর থানায় শুক্রবার একটি মামলা করা হয়েছে। মামলায় আসামি হিসেবে উপজেলার পোড়াডাঙ্গা গ্রামের বৈদ্যনাথ দত্ত, কুচলিয়া গ্রামের গোবিন্দ মল্লিক, বালিদাহ গ্রামের আনিছুর রহমান ও অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী গ্রামের ছেলে অশোক বিশ্বসের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরো কয়েকজনকে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বিপদ ভঞ্জন পাঁড়ে বলেন, আমি ঘেরের জমি মালিকদের লীজের টাকার জামিন্দার। ইতোমধ্যে বকেয়া পাওনা তার মাধ্যমে পরিশোধ করা হয়েছে। চলতি বছরের টাকা দেবার আগেই প্রভাবশালী মহলেল ইন্দনে চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা ঘেরে হামলা চালিয়ে মাছ লুট করেছে। আমি ঘটনার সুষ্ঠ বিচার দাবি করছি।

জানা যায়, বৃহস্পতিবার বিকালে মাছ লুটের সময় আহত হোন ঘের মালিক বলরাম রায় ও কর্মচারী সঞ্জিত কুমার। তাদের মারপিট করে ঘের পাড়ে ফেলে রাখা হয়। খবর পেয়ে ঘেরের জমি মালিকসহ স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়। পরে শুক্রবার ঘটনার বর্ণনা দিতে স্থানীয় হাজিরহাট বাজারে সংবাদ সম্মেলন করেন বলরাম রায়।

স্থানীয় সূত্র বলছে, বিল বোকড়ে মাসুদের ঘের নামে পরিচিত ঘেরটির আয়তন প্রায় এক হাজার ২০০ বিঘা। এই ঘেরে রয়েছে প্রায় ৩০০ বিঘা খাস জমি। বাকি ব্যক্তি মালিকানাধীন জমির বিঘা প্রতি ১৬ হাজার ও ১৮ হাজার চুক্তিতে মাছ চাষ করেন মালিকপক্ষ। তবে ঘেরটির মালিকানা নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব। বছর সাতেক আগে কেশবপুরের আব্দুস সামাদ ও বলরাম রায় যৌথ মালিকানায় মাছ চাষ শুরু করেন। কিন্তু মুনাফা না পেয়ে আব্দুস সামাদকে ঘের থেকে হটিয়ে দেন বলরাম। এরই মধ্যে বৈদ্যনাথ দত্ত দাবি করেন ওই ঘেরের ২০০ বিঘা জমি তার নামে ডিড করা রয়েছে। ফলে ঘেরের মালিকানা নিয়ে তিন পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। এই সংকট সমাধানে মাস দুয়েক আগে স্থানীয় কুচলিয়া বিদ্যালয় মাঠে একটি শালিসি বৈঠক ডাকা হয়। ওই বৈঠকে আব্দুস সামাদ ও বৈদ্যনাথ রায়ের পক্ষ নিয়ে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিয় ভট্টাচার্য্য শুভ। কিন্তু জমির মালিক ও স্থানীয়রা পক্ষে থাকায় শেষ পর্যন্ত বৈঠকে বলরাম রায়কে ঘেরের দায়িত্ব দেয়া হয়। বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ৫ মার্চ থেকে জমির মালিকদের টাকা দেয়ার কথা। সেই অনুযায়ী বলরাম রায় মাছ ধরা শুরু করেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার হামলা চালিয়ে মাছ লুট করার পাশাপাশি রাতে কয়েক দফা ফাঁকা গুলি চালানো হয়েছে। ফলে এলাকায় আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে, মাছ লুটের ঘটনার প্রতিবাদে শুক্রবার ঘের ও জমির মালিকদের উদ্যোগে কুচলিয়া বিদ্যালয় মাঠে প্রতিবাদ সভা ডাকা হয়। একই সময় ও স্থানে অপর পক্ষ নিজেদের নামে ঘের দাবি করে পাল্টা সভা ডাকে। ফলে সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান মণিরামপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার সৈয়দ জাকির হাসান, সহকারী পুলিশ সুপার সোয়েব হোসেন ও মণিরামপুর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম। পরে সমস্যা সমাধানে আগামী ২ মার্চ সকাল ১০ টায় ঘেরের বৈধ কাগজপত্র নিয়ে উপজেলা পরিষদ হল রুমে সব পক্ষকে ডেকে পাঠিয়েছে প্রশাসন।

সংবাদ সম্মেলনে বলরাম রায় জানান, ৪৭২ জন জমি মালিকের কাছ থেকে জমি লীজ নিয়ে ১০ বছরের চুক্তিতে কেশবপুরের আব্দুস সামাদের সাথে তিনি অংশীদার ভিত্তিতে বিলবোকড়ে মাছের ঘের করেন। কিন্তু চুক্তি মোতাবেক গত ৭ বছর ঘেরে মাছের চাষ করে কোন ভাগ তিনি পাননি। বিষয়টি জমি মালিকরা জানতে পেরে আব্দুস সামাদের উপর ক্ষুব্ধ হন। এক পর্যায় গত বছর বাকি ৩ বছরের জন্য বলরাম রায়ের নামে ঘেরের চুক্তিনামা (ডিট) করে দেয় আব্দুস সামাদ। ৫ মার্চ চলতি বছরের লীজের টাকা জমি মালিকদের দেয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু তার আগেই বৈদ্যনাথ, গোবিন্দ মল্লিক, আনিছ, মঞ্জুর হোসেন ও অশোক বিশ্বাসের নেতৃত্বে প্রায় ৪০ জন অস্ত্রধারী যুবক হামলা চালিয়ে ৫ লাখ টাকার মাছ লুট করেন।

সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার সোয়েব হোসেন জানান, উত্তেজনা বিরাজ করায় ঘটনাস্থলে গিয়ে সেটি প্রশমন করা হয়েছে। আগামী ২ মার্চ উভয় পক্ষকে কাগজপত্র নিয়ে ডাকা হয়েছে।

স্বাআলো/এসএ