উত্তাল তিস্তা এখন ধু-ধু বালুচর

পানি না থাকায় তিস্তা নদীর প্রায় ১৩০ কিলোমিটার জুড়ে এখন ধু ধু বালু চর। ভারতের একতরফা নীতির কবলে পড়ে বসন্তেই যৌবন হারিয়ে মরতে বসেছে এক কালের প্রমত্তা তিস্তা। নদী পাড়ে নেই মাঝি-মাল্লা আর জেলেদের হাঁক-ডাক।প্রায় অকেজো দেশের বৃহত্তম সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ।নদীর মূল গতিপথ এখন বালুর স্তুপ।

বর্ষা মৌসুমে তিস্তা সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ রক্ষায় খুলে দেয়া হয় ৫২টি জল কপাট। এতে ব্যারেজের আশপাশের বাসিন্দাসহ ভাটিতে থাকা লাখ লাখ মানুষ হয়ে পড়ে পানিবন্দি। নদী ভাঙনে বসতভিটাসহ সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয় তিস্তা পাড়ের মানুষ। আশ্রয় নেয় বাঁধের ধারে কেউ বা অন্যের জমিতে। পক্ষান্তরে প্রতি বছরেই বন্যার পর কয়েক মাসের ব্যবধানে সেই প্রমত্তা তিস্তা নদী পরিনত হয় ধু-ধু বালুচরে।

ভারত সরকার গজলডোবায় বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে একতরফা তিস্তার পানি নিয়ন্ত্রণ করায় প্রতি বছর বর্ষা শেষ হতে না হতেই বাংলাদেশ অংশ পরিণত হয় মরা খালে। ৩১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ তিস্তা নদীর বাংলাদেশ অংশের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার এখন মরুভুমি। দিন দিন প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে দেশের বৃহত্তম তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প।

পানি না থাকায় তিস্তা নদীর বুকে মাছ শিকার করতে ছুটে চলা ডাহুক, পানকৌড়িসহ অসংখ্য পাখ-পাখালির উড়ে যাওয়ার চিরচেনা দৃশ্য আর চোখে পড়ে না। তারাও যেন মুখ ফিরিয়ে বিদায় নিয়েছে যৌবনা তিস্তা নদী থেকে। তিস্তার বুকে জেগে ওঠা চরাঞ্চলের বালু জমিতে কঠোর পরিশ্রম করে চাষাবাদ করা চাষিদের বিভিন্ন জাতে শস্য মরে যেতে বসেছে। তিস্তার বালুচরে গর্ত করে পানির অস্থায়ী উৎস সৃষ্টির মাধ্যমে শস্যক্ষেতে সেচ দেন এসব কৃষক। কিন্তু পানি স্তর নিচে চলে যাওয়ায় প্রতিদিন সেচ দিয়েও রক্ষা হচ্ছে না ফসল। এছাড়াও শত কষ্টে চাষাবাদ পণ্য মূলভূখন্ডে নিতে গুণতে হচ্ছে অতিরিক্ত পরিবহন খরচ। পানি থাকলে নৌকায় সহজে ও কম খরচে শস্য পরিবহন করা যেত। ফলে বেশি খরচ ও পরিশ্রম করে উৎপাদিত শস্যের ন্যায্যমূল্য বঞ্চিত হচ্ছেন এসব চাষি।

আরো পড়ুন>>> ওমর ফারুকের যান্ত্রিক ঢেঁকি সাড়া ফেলেছে

তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত তিস্তা সড়ক সেতু ও কাকিনা-মহিপুর তিস্তা সড়ক সেতু যেন বালু চরে প্রহসনে দাঁড়িয়ে আছে। পানিশূন্য তিস্তা নদীর বালুচর এখন হেঁটেই পাড়ি দিচ্ছে মানুষজন।ঢেউহীন তিস্তায় রয়েছে শুধু বালু কণা। নেই মাছ বা নৌকার ছুটে চলার চিরচেনা দৃশ্য। সব মিলে পানিশূন্য তিস্তাপাড়ের জীববৈচিত্র আজ হুমকির মুখে। জীববৈচিত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বেকার হয়ে খাদ্যকষ্টে পড়েছেন তিস্তার বুকে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহকারী হাজারো জেলে ও মাঝি-মাল্লাদের পরিবার।

সরেজমিন দেখা গেছে, তিস্তার মূল নদীতে বড় বড় বালুর স্তুপ। নদীতে পানি নেই। শুধুই বালুচর। ব্যারেজের ৫২ গেটের মধ্যে ৪৫টি বন্ধ করে উজানে পানি আটকানোর চেষ্টা করছে ভারত। এতে করে যেটুকু পানি উজানে জমছে তাতেই ব্যারেজটির বাকি ৭ গেটের মাধ্যমে ইরি ধানের জন্য সেচ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

এসময় তিস্তা পাড়ের বাসিন্দারা বলেন, এই তিস্তা নদী আমাদের কোনো উপকারে আসে না। শুধু প্রতিবছর ভাঙনে আর পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় দুই পাড়ের মানুষ।’এদিকে আগামী ২৬ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকা সফরের সূচি চূড়ান্ত হওয়ায় খুশি তিস্তাপারের কোটি মানুষ। পানিচুক্তি নিয়ে আশার আলো দেখছেন তিস্তা পাড়ের মানুষ।

তিস্তা ব্যারাজ ডালিয়া পয়েন্টের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম বলেন, তিস্তা নদীর উজানে বর্তমানে দুই হাজার ৫০০ কিউসেক পানি আছে। তা দিয়ে সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকবে। তিস্তা নদীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজন কমপক্ষে চার হাজার কিউসেক পানি। কিন্তু ডিসেম্বর মাসের পর থেকে তিস্তায় পানি প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে যায়।

ভারতের সিকিম রাজ্য থেকে উৎপত্তি ঐতিহাসিক তিস্তা নদী ভারতের পশ্চিমবঙ্গের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে নীলফামারী ও লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ সীমান্ত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। যা লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর ও গাইবান্ধা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কুড়িগ্রাম জেলার চিলমারী বন্দর হয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিশে গেছে।

স্বাআলো/আরবিএ