পশ্চিম বাংলায় ‘লাল ফেরানোর’ লড়াইয়ের ‘ফিনিক্স পাখি’ কমরেড মীনাক্ষী মুর্খাজী

চলছে ভারতের পশ্চিম বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন। এই নির্বাচনে বিভিন্ন জরিপে মূলত এগিয়ে আছে তৃণমূল কংগ্রেস ও বিজেপি। কিন্তু এখনো যে এই রাজ্যে ‘লালে’ মানুষের ভরসা আছে তাও প্রমাণ মিলছে কোথাও কোথাও।

সেই ‘লাল’ ফেরানোর লড়াইয়ে বিমান বসুদের পায়ে পা মিলিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন একঝাক নতুন কমরেড। যাদের মধ্যে সবাইকে ছাপিয়ে রীতিমতো আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন মীনাক্ষী মুর্খাজী। তিনি লড়ছেন দুই হেভিওয়েট প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর নন্দীগ্রামে। তবে তিনি নন্দীগ্রাম ছেড়ে পুরো রাজ্যে এখন আলোচনার শীর্ষে। বিশেষ করে বাম শিবিরে।

তার আসন নন্দীগ্রামে ইতিমধ্যে ভোট গ্রহণ হয়ে গেছে। এখন তিনি পুরো রাজ্যে দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারণার নেতৃত্বে দিচ্ছেন। তাকেই অনেকে বাংলায় লাল ফেরানোর লড়াইয়ের নেত্রী মানছেন।

যে রাজনৈতিক রক্তাক্ত জমি আন্দোলনের ধাক্কায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কুর্সি চলে গিয়েছিল, সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় বাম আন্দোলনের রাজপথের নেত্রী কতটা সফল তা বলবে ইভিএম। তবে নন্দীগ্রামের সংযুক্ত মোর্চার সিপিআইএম প্রার্থী মীনাক্ষী মুখার্জি তার সংসদীয় রাজনৈতিক জীবনের প্রথম লড়াই শুরু করে দিলেন।

রাজপথের আন্দোলনের সফল নেত্রী ভোটের লড়াইয়ে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা করছেন নন্দীগ্রাম থেকে। তাৎপর্যপূর্ণ, ২০০৭ সালের সেই নন্দীগ্রাম গণহত্যার বিষয়ে এবারেই প্রথম মুখ খুলেছেন তৃণমূল কংগ্রেস প্রার্থী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তার মন্তব্যে স্বস্তি বামমহলে। কারণ, নন্দীগ্রামে পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক জীবনে লেগেছিল ‘রক্তের দাগ’। আর সেই নন্দীগ্রাম থেকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি বাপ ব্যাটার অর্থাৎ শিশির অধিকারী ও শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশে চটি পরা পুলিশ ঢুকেছিল।

বিধানসভা নির্বাচনের দ্বিতীয় পর্যায়ে মমতা উবাচে নন্দীগ্রাম ইস্যুতে বুদ্ধবাবুর ভূমিকা ‘নিষ্কলঙ্ক’প্রমাণ হওয়ায় অনেকটা স্বস্তিতে যেমন সিপিআইএম তেমনই মীনাক্ষী। ২০০৭ সাল থেকে নন্দীগ্রাম একপ্রকার হাতছাড়া বামেদের। সেখান থেকে দাঁড়িয়ে মীনাক্ষীর লড়াই যেমন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর বিরুদ্ধে, তেমনই এলাকার কর্মসংস্থানের বেহাল দশা তুলে ধরারও।

নন্দীগ্রাম থেকে মমতা ও শুভেন্দুর প্রার্থী হওয়া যখন নিশ্চিত তখন নজর ছিল সংযুক্ত মোর্চার দিকে। তবে নন্দীগ্রামে প্রার্থী করতে কিছু সময় নেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসু। প্রাথমিকভাবে স্থির হয়, এই কেন্দ্র জোট শরিক আব্বাস সিদ্দিকীর দল ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টকে দেওয়া হবে। পরে সিদ্ধান্ত বদলে সিপিআইএম প্রার্থী করে তাদের যুব সংগঠনের নেত্রী মীনাক্ষী মুখার্জি কে। এর পরেই নির্বাচনী লড়াইয়ের আলোচনায় উঠে এসেছেন পশ্চিম বর্ধমানের কুলটির বাসিন্দা মীনাক্ষী।

নিজে থেকে না সরলে আমাকে সরানো সম্ভব নয়: মমতা

তিনি কি হেভিওয়েট প্রশ্ন থাকবে। ভোট লড়াইয়ের নিরিখে মীনাক্ষী নতুন। জীবনের প্রথম নির্বাচনী রণক্ষেত্র নন্দীগ্রাম। প্রচারে বেরিয়ে ঠাণ্ডা গলায় তৃণমূলের হুমকি মোকাবিলা করেছেন। আক্রান্ত হয়েছেন, আবার নিজের দাপটেই যে সব এলাকায় বাম ভোটাররা আছেন সেখানে ঢুকে পড়েছেন।

তৃণমূল ও বিজেপির মারকাটারি লড়াইয়ের মাঝে ফল্গু ধারার মতো মীনাক্ষীর প্রচারে দুই প্রতিপক্ষ শক্তি মেনে নিয়েছে বাম প্রার্থীর অস্তিত্ব। পূর্ব মেদিনীপুর জেলা তৃণমূল ও বিজেপি নেতারা স্বীকার করেছেন মীনাক্ষী লড়াইয়ের অন্য মাত্রা তৈরি করেছে।

নন্দীগ্রাম জমি আন্দোলন ঘিরে রক্তাক্ত পরিস্থিতি যে ষড়যন্ত্র ছিল তা সেই আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মন্তব্যে স্পষ্ট। মীনাক্ষীর লড়াই এখান থেকেই বাঁক নিয়েছে। এই ভোট লড়াইয়ের ‘মিরাক্যাল ফল’ হলে তিনি ইতিহাসের অংশীদার হবেন। কিন্তু ভোট করানোর শক্তি বামেদের নেই। ফলত লড়াইটা কেন্দ্রীভূত মমতা-শুভেন্দুর দ্বৈরথে। হারিয়ে যাওয়া ভোট ফিরিয়ে আনার কঠিন কাজটি নিয়ে মীনাক্ষী নেমেছেন নন্দীগ্রামে।

কুলটির রুক্ষ খনি এলাকা পেরিয়ে কলকাতার রাজপথ ধরে রাজনৈতিক মহারণে মীনাক্ষী। সংসদীয় রাজনীতির প্রথম মাইল ফলক ছুঁয়ে দেখছেন বামেদের ‘ফিনিক্স পাখি’।

স্বাআলো/আরবিএ