অভিমানী নজরুল

অভিমানের উৎসভূমি কি মানব হৃদয়? মানব হৃদয়ে জন্ম নেয়া এই বোধকে তাড়িত করে কোন সে অনুভূতি, যার কারণে মানুষ অনায়াসে গৃহ ত্যাগ করতে পারে, প্রেম-ভালোবাসাকে দু’পায়ে দলতে পারে, আবার সেই ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ব্যাকুল প্রতীক্ষা ও করতে পারে! প্রকৃতপক্ষে অভিমান হচ্ছে ভালোবাসা জনিত সেই আবেগীয় অনুভুতি, যার সঙ্গে অধিকারের প্রশ্ন যেমন জড়িত তেমনি; অধিকার প্রয়োগ না করার বিষয়টিও জড়িত। দীর্ঘদিনের উপেক্ষা , অবহেলা , প্রাপ্য মর্যাদা ও সম্মান বোধের অভাব থেকে যার জন্ম হয়ে থাকে। সৃষ্টিশীল মানুষরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মানের বিষয়ে স্পর্শকাতর হয়ে থাকেন। কাছের মানুষদের আচরণে এটির অভাববোধ তাঁদেরকে আবেগি করে তোলে । আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় অভিমানের। ইতিহাসে এর অসংখ্য নজির রয়েছে। চিত্রশিল্পী ভিনসেন্ট ভ্যানগগের জীবনযাপন, এবং অস্ট্রিয়ান পদার্থবিজ্ঞানী বোলজম্যানের আত্মহননের কারণ ছিল গভীর আত্মাভিমান । আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ও ছিলেন চির অভিমানী । কখনো দারিদ্র, কখনো না পাওয়ার হতাশা, ধর্মীয় রক্ষণশীলদের (হিন্দু-মুসলিম উভয়) তীব্র কটাক্ষ, ভিন্নমত পোষণকারী রাজনীতিবিদদের আক্রমণ এবং সমসাময়িক সাহিত্যিকদের প্রবল বিরোধিতা তাঁকে তীব্র অভিমানী করে তোলে । অভিমানের এই তীব্রতা তাঁর জীবনযাপনে কেমন প্রভাব ফেলেছিল তার পরিমাপে না গিয়েও বলা যায় , এর ফলে আমরা তাঁর কাছে থেকে কিছু অসাধারণ সাহিত্যকর্ম উপহার পেয়েছি। তাঁর জীবনযাপন ও সাহিত্যকর্ম থেকে খুব সহজেই আমরা তাঁর অভিমানের কিছু টুকরো প্রকাশ উপস্হাপন করতে পারি।

মাত্র বার বছর বয়সে (১৯১১ সাল) নজরুলের লেটো দলে যোগদান এবং তের বছর বয়সে (১৯১২ সাল) চা-রুটির দোকানে চাকরি গ্রহণ কি শুধুই দারিদ্র্যের কারণে? অনেক গবেষক এটাকে দারিদ্র্যের ফলাফল বললেও এ সম্পর্কে যথেষ্ট দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায় না । বরং ১৯১৪ সালে সপ্তম শ্রেণির পরীক্ষা শেষে ময়মনসিংহের ত্রিশাল থেকে কাউকে কিছু না বলে চলে যাওয়া নজরুলের বোহেমিয়ান ও অভিমানী সত্তার ইঙ্গিতবহ।

পল্টন থেকে ফিরে ১৯২০ সালে নজরুল শেষবারের মতো গ্রামের বাড়ি চুরুলিয়ায় গিয়েছিলেন। জীবদ্দশায় আর কখনোই তিনি গ্রামের বাড়ি যাননি । মায়ের সঙ্গে দেখা ও করেননি। নজরুল জীবনের অন্যতম রূপকার কমরেড মুজাফ্ফর আহমদ লিখেছেন , “নজরুলের গর্ভধারিনী মা হুগলি এসেছিলেন। মা’র সঙ্গে নজরুলের কি একটা প্রচন্ড মান-অভিমানের ব্যাপার ঘটেছিল। পল্টন হতে ফিরে এসে সে একবার মাত্র চুরুলিয়ায় গিয়ে আর কখনো যায়নি। মা’র সঙ্গে নজরুল দেখাও করেনি।” এই অভিমান থেকেই বোধ হয় ১৯২৩ সালে জেলখানায় অনশন ভাঙানোর জন্য যখন তাঁর মাকে আনা হলো , তখন মায়ের অনুরোধ সত্বেও তিনি অনশন ভাঙেন নি।

১৯২১ সালে কুমিল্লায় নার্গিসের সঙ্গে নজরুলের বিয়ে এবং অজ্ঞাত শর্তের কারণে বিয়ের রাতেই কুমিল্লা থেকে নজরুলের প্রত্যাগমন বাংলা সাহিত্যে অনেক স্মরণীয় অভিমান গাঁথার জন্ম দিয়েছে। আইনগতভাবে এই বিয়ে পরবর্তী ১৬ বছর পর্যন্ত টিকে থাকলেও নজরুল আর কখনোই নার্গিসের কাছে ফেরেননি। কিন্তু এই ঘটনার অভিঘাতে নজরুল তাঁর পরবর্তী কাব্যগ্রন্থ গুলোতে অনবরত নার্গিসকে অভিমানভরে স্মরণ করেছেন । কবি তাঁর ছায়ানট (১৯২৫), পুবের হাওয়া (১৯২৬) , ও চক্রবাক (১৯২৯) কাব্যগ্রন্থের অনেক কবিতা নার্গিসকে কেন্দ্র করে রচনা করেছেন। ছায়ানট কাব্যগ্রন্থের পঞ্চাশটি কবিতার মধ্যে নয়টি কবিতা নার্গিস কে কেন্দ্র করে লেখা। উক্ত কাব্যগ্রন্থের “বেদনা অভিমান” কবিতার অভিমানী উচ্চারণ পাঠক লক্ষ্য করুনঃ

ওরে আমার বুকের বেদনা
ঝঞ্জা কাতর নিশীথ রাতের কপোত সম রে,
আকুল এমন কাদন কেঁদো না।
(বেদনা অভিমান, ছায়ানট)

চক্রবাক কাব্য গ্রন্থের ১৯ টি কবিতা বড় বেশি ব্যথাতুর। যেন বেদনার রোমান্টিক নিবেদন। কাব্যগ্রন্থের ‘তোমারে পড়িছে মনে’, ‘বর্ষা-বিদায়’, ‘হার -মানা -হার ‘ শীর্ষক কবিতাগুলো সরাসরি নার্গিস কে উদ্দেশ্য করে লিখিত। এ পর্যায়ে নিম্নোক্ত কবিতাটি উল্লেখের বিশেষ দাবি রাখে,

নাইবা পেলাম কন্ঠে আমার
তোমার কন্ঠহার
তোমায় আমি করবো সৃজন
এ মোর অহংকার।
(এ মোর অহংকার, চক্রবাক)

অহংকার ভরে কবি এই উচ্চারণ করলেও না পাওয়ার অভিমান থেকেই কি তা প্রতিধ্বনিত নয়? আনুষ্ঠানিক বিচ্ছেদের আগে ১৯৩৭ সালে নার্গিস কর্তৃক নজরুলকে লিখিত চিঠির প্রত্যুত্তরে নজরুল যে গানটি লেখেন তাতেও তীব্র অভিমানের প্রকাশ রয়েছেঃ

যারে হাত দিয়ে মালা দিতে পারো নাই
কেন মনে রাখো তারে
ভুলে যাও তারে ভুলে যাও একেবারে।
আমি গান গাহি আপনার দুখে
তুমি কেন আসি দাঁড়াও সমুখে
আলেয়ার মত ডাকিও না আর
নিশীথ অন্ধকারে।
দয়া কর, মোরে দয়া কর। আর
আমারে লইয়া খেলোনা নিঠুর খেলা
শত কাঁদিলেও ফিরিবেনা সেই
শুভ লগনের বেলা।
(ক্রমিক-১৭১০, নজরুল সঙ্গীত সংগ্রহ)

নজরুল জীবনে বেদনা -অভিমানের আর একটি উৎসমুখ হচ্ছে ফজিলতুন্নেসা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম স্নাতকোত্তর মুসলিম ছাত্রী ফজিলতুন্নেসা। ১৯২৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় অধিবেশনে যোগ দিতে এসে তাঁর সঙ্গে কবির পরিচয় এবং প্রণয় প্রার্থনা । প্রেমিক কবির উদ্দাম ব্যক্তিত্ব এতকাল সবাইকে আকৃষ্ট করেছে । কিন্তু এই প্রথম বিপরীত ঘটনা ঘটেছে। ফজিলতুন্নেসার অনমনীয় ব্যক্তিত্বের কাছে কবির প্রেমিক সত্তা পরাস্ত হয়েছে। কবি প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন । এই ঘটনা দীর্ঘদিন কবিকে রক্তাক্ত করেছে। রবীন্দ্রনাথ যেমন বাঁশি কবিতায় হরিপদ কেরানির জবানিতে বলেছিলেন, “ঘরেতে এল না সে তো, মনে তার নিত্য আসা যাওয়া” ঠিক তেমনি ফজিলতুন্নেসার প্রত্যাখ্যান জনিত ঘটনাও কবির মনে নিত্য আসা-যাওয়া করতে থাকলো। উল্লেখ্য এ প্রসঙ্গে কবি তাঁর বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনকে সাতটি এবং ফজিলতুন্নেসাকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। যা পত্র সাহিত্য হিসেবে বাঙালি দীর্ঘকাল মনে রাখবে। ফজিলতুন্নেসার প্রতি কবির গভীর অনুরাগ -অভিমানের বহিঃপ্রকাশ লক্ষ্য করা যায় নিম্নোক্ত গানটিতে। যেটি কবি রচনা করেছিলেন ফজিলতুন্নেসার বিয়ের খবরে।

বাদল-বায়ে মোর
নিভিয়া গেছে বাতি
তোমার ঘরে আজ
উৎসবের রাতি।
তোমার আছে হাসি,
আমার আঁখি জল
তোমার আছে চাঁদ,
আমার মেঘদল
(ক্রমিক-১৬০৯, নজরুল সঙ্গীত সংগ্রহ)

এই প্রত্যাখ্যান -অভিমানের তীব্র অনুরণন শোনা গেছে পরবর্তী আরো অনেক গানে-
কেন কাঁদে পরান
কি বেদনায় কারে কহি।
(ক্রমিক-৯২৭, নজরুল সঙ্গীত সংগ্রহ)

অথবা,

গভীর রাতে জাগি খুঁজি তোমারে
দূর গগনে প্রিয় তিমির- পারে।
জেগে যবে দেখি বঁধু তুমি নাই কাছে
আঙিনায় ফুটে ফুল ঝ’রে প’ড়ে আছে,
বাণ বেধা পাখি সম আহত এ প্রাণ মম
লুটায়ে লুটায়ে কাঁদে অন্ধকারে।
কত কথা কাঁটা হয়ে বুকে আছে বিঁধে
কত অভিমান, না কত জ্বালা এই হৃদে
দেখে যাও এসো প্রিয় কত সাধ ঝরে গেল
কত আশা ম’রে গেল হাহাকারে।
(ক্রমিক-১২৫১, নজরুল সঙ্গীত সংগ্রহ)

নজরুল আপাদমস্তক বিদ্রোহী ছিলেন এ কথায় কোন অতিরঞ্জন নেই। কিন্তু সারা জীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই , রাজনৈতিক বিরূদ্ধস্রোতের মোকাবেলা, রক্ষণশীল মুসলিম ও গোড়া হিন্দুদের ক্রমাগত ধর্মীয় কটাক্ষ, এবং কবি বন্ধুদের ছিদ্রান্বেষণ তাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এসবের তীব্র প্রতিবাদ করলেও একটা সময় সেই প্রতিবাদের ভাষায় অভিমানের সুর বেজে উঠেছিল। উদাহরণ হিসেবে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত “আমার কৈফিয়ত” কবিতার উল্লেখ করা যায়।

” বর্তমানের কবি আমি ভাই,
ভবিষ্যতের নই নবী’
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে
মুখ বুঁজে তাই সই সবি।
——————————-
——————————–
বড় কথা বড় ভাব আসে নাকো মাথায়।
বন্ধু বড় দুখে
অমর কাব্য তোমরা লিখিও,
বন্ধু যাহারা আছ সুখে ।
(আমার কৈফিয়ত, সর্বহারা)

কবিতাটিতে কবি তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা যাবতীয় অভিযোগের জবাব যেমন দিচ্ছেন, তেমনি শিল্প সৃজন তথা বড় কবি আখ্যা পাওয়ার আশায় বর্তমানকে অস্বীকার করতে পারবেন না সেটিও অভিমানভরে জানিয়ে দিচ্ছেন। বাকরহিত হওয়ার মাত্র এক বছর পূর্বে ১৯৪১ সালে “যদি আর বাঁশী না বাজে” শীর্ষক জীবনের শেষ অভিভাষণে কবির আবার অভিমানী উচ্চারণঃ “মনে করবেন পূর্নত্বের তৃষ্ণা নিয়ে যে একটি তরুণ এই ধরায় এসেছিল, অপূর্ণতার বেদনায় তারি বিগত আত্মা যেন স্বপ্নে আপনাদের মাঝে কেঁদে গেল। যদি আর বাঁশী না বাজে, আমি কবি বলে বলছিনে, আমি আপনাদের ভালোবাসা পেয়েছিলাম সেই অধিকারে বলছি , আমায় আপনারা ক্ষমা করবেন, আমায় ভুলে যাবেন। বিশ্বাস করুন, আমি কবি হতে আসিনি , আমি নেতা হতে আসিনি। প্রেম দিতে এসেছিলাম , প্রেম পেতে এসেছিলাম। সেই প্রেম পেলাম না বলে এই প্রেমহীন নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।”

কিন্তু এই প্রেমহীন পৃথিবী থেকে চিরতরে দূরে চলে গেলেও কবি এই দেশের পথের ধূলিতে মিশে থাকতে চান । কবির হৃদয় চূর্ণ করা সেই উচ্চারণঃ

আমি চিরতরে দূরে চলে যাব
তবু আমারে দেব না ভুলিতে।
————————
————————-
তোমার কুঞ্জ পথে যেতে হায়
চমকি থামিয়া যাব বেদনায়
দেখিবে কে যেন ম’রে মিশে আছে,
তোমার পথের ধূলিতে।
(ক্রমিক-১১৪, নজরুল সঙ্গীত সংগ্রহ)

বেদনাহত – চির অভিমানী এই কবির জন্য রয়েছে আমাদের পুরো ভূখণ্ড । জন্মদিনে তাঁর স্মরণে এই হোক সশ্রদ্ধ নিবেদন।

লেখক: অধ্যাপক আবদুল হাই