একজন ছাত্রবান্ধব বিপ্লবীর ইতিকথা

সংগঠনের সবার কাছেই তিনি প্রিয় ব্যক্তিত্ব। ক্লিনশেভড, মার্জিত পোশাক, অল্পভাষী আর গুরুগম্ভীর কণ্ঠস্বর , সর্বদা শার্ট ইন করেপরা। পার্টি অফিসে আসতেন বেশির ভাগ সময় সন্ধ্যা বেলায়। ডান হাতের মাঝের আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেট আর বাম হাতে দুধ চা। মাঝে মাঝে তাৎপর্যপূর্ণ বাক্য। চেহারা, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আর মোটা গোফে কিছুটা জোসেফ স্টালিনের প্রতিচ্ছবি। পার্টির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এবং লেখালেখির ব্যাপারে তার উপস্থিতি অবশ্যই কাম্য। মার্কসবাদ, লেলিনবাদের তিনি যেন একজীবন্ত পাঠশালা। পার্টির প্রগ্রাম চলাকালীন রেডিমেট প্রেস বার্তা লিখনে তার জুড়ি মেলাভার। পেশাদার সাংবাদিক না হয়েও সংবাদ এবং সাংবাদিকতার প্রতি তার ছিল দূর্বার আকর্ষণ। অর্থনীতির ছাত্র হয়েও কবিতা লেখায় নিপুন হাত ছিলো তার। অফিসে ছাত্র মৈত্রীর ছেলেদের পেলে তার লেখা কবিতা পড়তে বলতেন। কিন্তু আজ সব অতীত। কারণ এতোক্ষণ যার কথা বলছি তিনি এখন আর আমাদের মাঝে নেই। ২০২০ সালের ৩১মে ফুসফুস ক্যান্সারের কাছে পরাজিত হয়ে আমাদেরকে শেষবিদায় জানিয়ে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। ৩১ মে তারিখটা ছাত্র মৈত্রীর ইতিহাসের একটা স্মরণীয় দিন। কারণ এই দিনে ঘাতকের আঘাতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছিলেন ছাত্র মৈত্রীর বীরসেনা শহীদ ডা. জামিল আক্তার রতন। আর একই তারিখে এ দেশের বাম ধারার রাজনীতি থেকে হারিয়ে যাওয়া এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম কমরেড মোস্তাফিজুর রহমান কাবুল। গঠনমূলক বক্তৃতা করার কারণে সবাই তার প্রশংসা করতো। কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের মেধবী শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগি জাহান তনু হত্যাকান্ডের বিচারের দাবিতে দড়াটানায় ছাত্র মৈত্রী ও যুব মৈত্রীর যৌথ প্রোগ্রাম করে। প্রোগ্রাম পরিচালনায় ছিলাম আমি। প্রোগ্রাম শুরু হতেই দেখি ধীর গতিতে মোটরসাইকেল চেপে এক ভদ্রলোক আসলেন। মঞ্চ সভাপতির নির্দেশে আমি তাকে মঞ্চে আমন্ত্রণ জানালাম। সেই দিন তার বক্তব্য আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছিলাম। প্রোগ্রাম শেষে আমাকে বলে গেলেন ছবি পঠিয়ে দিও শর্মা। নামের টাইটেল ধরে ডাকায় আমার বেশ ভাল লেগেছিল। তারপর মাঝে মাঝে রাশেদ ভাই এর সাথে তার কর্মস্থলে যাওয়া হতো। অনেক ভাল উপদেশ দিতেন। সব মিলিয়ে ভাল লাগতো। ছাত্র মৈত্রীর ১২তম জেলা সম্মেলনের মাধ্যমে আমি সভাপতি হলাম। আমার প্রথম প্রগ্রাম সামনে আসলো একুশে ফেব্রুয়ারি। আমি কমরেড কাবুলকে ফোন করলাম নিজের পরিচয় দিয়ে বিস্তারিত বললাম। ওপাশ থেকে খুব সংক্ষেপে শুনলাম ‘কাল দেখা করো’ সংগঠনের জন্য আমার তোলা চাঁদার মধ্যে প্রথম শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন কম: কাবুল। সভাপতি নির্বাচিত হওয়াতে আমাকে শুভেচ্ছা স্বরূপ একটা ডায়েরি দিয়ে বলেছিলেন এতে সাংগঠনিক রিপোর্ট লিখবা। এরপর থেকে তার ব্যাপারে ছাত্র মৈত্রীর সাবেক নেতাদের কাছ থেকে অনেক গল্প শুনেছি। আগে বড় কোন প্রোগামে বক্তৃতা করার আগে আমি বেশির ভাগ কমরেড জাকির হোসেন হবি অথবা কম: কাবুলের কাছেই বেশি যেতাম। খুব অল্প কথায়ভাল কিছু পয়েন্ট কম: কাবুল দিতেন যা আমার খুব ভাল লাগত। এভাবে মাঝে মাঝে যেতাম তার কাছে নানা আবদার নিয়ে কিন্তু কখনো তার মুখে মলিনতা দেখিনি বরং মনে হতো আমার উপস্থিতে তিনি খুশিই হতেন। মণিরামপুরের রাজগঞ্জের পার্টির প্রায়ত কমরেড দুলু ভাইয়ের স্মরণসভা করা হবে। রাজগঞ্জ বাজারেই হবে স্মরণসভা। দেখলাম এই নিয়ে কম: কাবুল একটু ব্যস্ত। ঠিক তখনি আবার আমাকে ঢাকায় যেতে হবে সংগঠনের কাজে যে কারনে আমিও ব্যস্ত। হঠাৎ! আমার ফোনে কম: কাবুলের ফোন। খুব ছোট করে বললেন, স্মরণসভায় ছাত্ররা কতজন যাবে? আর তুমি শুভেচ্ছা বক্তব্য দিবে প্রস্তুতি নিয়ে রেখ। কি বলবো বুঝতে পারলামনা। যাই হোক পরে দেখা করলাম, কথা বললাম এবং প্রোগ্রাম শেষ হলো। ঠিক এমনি কিছু ছোট ছোটকাজের মাধ্যমে তার সংস্পর্শে যাবার সুযোগ হয়েছিল আমার। একটা ব্যাপার ভাল লাগতো যেকোন জটিল সমস্যা কেন জানি তিনি খুব সহজেই সামলে নিতে পারতেন। নেতৃত্ব দেবার জন্য যে গুণাবলি থাকা দরকার তা যেন তার মধ্যে স্বাভাবিক ভাবেই ছিল।

ছাত্র মৈত্রীর ৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পার্টি অফিসের সামনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করলেন একসাথে কেকে কাটলেন। একদিন আমাকে আর সহযোদ্ধা অরুপ মিত্রকে বললেন তোমরা দুজন একদিন আমার বাসায় যাবে কিছু বই সংগ্রহ করতে হবে আর দুপুরে আমার বাসায় খাবে। দূরভাগ্যবশত পরে তার বাসায় আমরা গিয়েছিলাম কিন্তু সেদিন আর তিনি আমাদের মাঝে ছিলেন না। একটা মানুষ কতটা ছাত্রবান্ধব হতে পারে তার সাথে মিশলেইবোঝা যেত। যশোর আর, এন রোডস্থ নান্নু চৌধুরী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট থেকে অসচ্ছল ও মেধাবী শিক্ষাথীদের মাঝে বাৎসরিক বৃত্তি দেয়া হয়। সময় এলেই তিনি আমাকে বলতেন তোমাদের কেউ থাকলে জানিও। এই কথাটা আর হয়তো কেউ বলবে না! যশোর ইন্সটিটিউট নির্বাচনে ‘পরিবর্তন ও উন্নয়ন সমিতি প্যানেলের’ পক্ষের একজন অফিস সহকারি (বেতন ভুক্ত) লাগবে কম: কাবুল ফোনে বললেন তোমাদের ভেতর থেকে একজন বিশ্বস্ত ছেলে দাও। জানি এই কথাটাও আর কেউ বলবে না। তার মতো একজন মানুষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে কতটা ভাবতো তা অকল্পনীয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার দেয়া বিভিন্ন স্টাটাস দেখলে বোঝা যেত। ওয়ার্কার্স পার্টি বিভক্ত হবে গুঞ্জন শুনতে পাচ্ছি। যার প্রধান হটস্পট যশোর জেলা। বন্ধু সংগঠন ছাত্র মৈত্রী কোন দিকে টার্ন নিবে একটা প্রশ্ন। অনেক কমরেডের মনে মুখে অনেক রকম কথা। শুনতে পেলাম কম: কাবুল মূল পার্টির সাথে থাকবেন। আর জেলার অধিকাংশ হেভিওয়েট নেতারা বেরিয়ে আসবেন। শুরু হলো টানাপোড়ন অনেক নেতার ফোন রিসিভ করতে হলো ছাত্র মৈত্রীর কর্মীদের। আমাকেও অনেকে ফোন করতেন জেলা কিংবা জেলার বাইরে থেকে। কিন্তু আমার কাছে কোন দিন কম: কাবুল এই বাপারে কিছু জানতে চাননি। বরং আমি নিজে থেকে কয়েকবার তাকে বলেছিলাম। তার উত্তর ছিল তোমার নিজস্ব বিবেচনা আছে তোমাকে বোঝানো বোকামি। আর এখানেই জন্ম নিত শ্রদ্ধাবোধ, ভাললাগা, ভালবাসা। নতুন পার্টি অফিস হলো আমাকে বলতেন, নিয়মিত একটু পার্টি অফিসে বসো। যে কইদিন আছ একটু গুছিয়ে দাও। ভাই, আমি তো এখনো আছি। ফাঁকি দিয়ে তো আপনিই চলে গেলেন। কথা দিয়েছিলেন এক সাথে পোস্টারিং করবেন। কিভাবে ভুলতে পারলেন আপনি। আপনার উপর বড্ড অভিমান হয়।

প্রয়াত কমরেড পার্টির ১০ম কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় সদস্য পদ লাভ করেন। ছাত্র মৈত্রীর যশোর জেলার ইনচার্জের দায়িত্ব ভারটাও নেন নিজের কাঁধে। তাকে সাথে নিয়ে অনেক দূর যাওয়ার ইচ্ছা ছিল আমাদের কিন্তু তা আর হলো না। কিন্তু বিপ্লবীদের হতাশ হতে নেই, তিনিই শিখিয়ে গেছেন। তার দেখানো পথে আমাদের হেঁটে চলা চলমান থাকবে সময়ের শেষ পর্যন্ত।

উল্লেখ্য, কম: কাবুল তার জীবন দশায় সমাজের কল্যাণার্থে যা স্বাক্ষর রেখেছেন তার সবটাই রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে থেকে। সরকারি চাকুরি করার কারণে তিনি প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সাইনবোর্ড ব্যাবহার করতে পারতেন না। ইচ্ছা শক্তি টাই যে বড় তা তিনি অকালে মৃত্যুবরণ করে শিখিয়ে গেছেন। দেশের খেটে খাওয়া মানুষের প্রতি, সমাজের প্রতি, সংগঠনের কর্মীদের প্রতি তার যে দায়বদ্ধতা তা তিনি পালন করেছেন আমৃত্যু। কমরেড কাবুল অমর রহে! বিপ্লব ও বিপ্লবীদের মৃত্যু নাই, আপনি চিরজীবন অমর হয়ে থাকবেন আপনার শ্রমিক শ্রেণির রাজনীতির মাধ্যমে। আজ কমরেড মোস্তাফিজুর রহমান কাবুলে প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধাসহ লাল সালাম।

 

লেখক: সহ-সাধারণ সম্পাদক কেন্দ্রীয় কমিটি ও সভাপতি যশোর জেলা শাখা, বাংলাদেশ ছাত্র মৈত্রী।